গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ সময়ে দেশের মোট রফতানি আয় কমেছে ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যানে এ চিত্র উঠে এসেছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক মাস ধরে টানা নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি নিয়ে আগে থেকেই উদ্বেগ ছিল। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় রফতানি খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরো বেড়েছে।

ইপিবির হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে বাংলাদেশ থেকে বিশ্ববাজারে পণ্য রফতানি হয়েছে ৩ হাজার ১৯০ কোটি ৫৭ লাখ ৯০ হাজার ডলারের। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ৩ হাজার ২৯৪ কোটি ২৬ লাখ ৬০ হাজার ডলার। ফলে মোট রফতানি আয়ে কমেছে প্রায় ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ।

মাসভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অর্থবছরের শুরুতে রফতানিতে ইতিবাচক প্রবণতা থাকলেও পরবর্তী সময় পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। জুলাইয়ে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২৪ দশমিক ৯০ শতাংশ। কিন্তু এরপর টানা সাত মাস ধরে রফতানি খাতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। সর্বশেষ ফেব্রুয়ারিতে রফতানি কমেছে ১২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। এর আগে জানুয়ারিতে কমার হার ছিল দশমিক ৫০ শতাংশ। ডিসেম্বরে প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। এছাড়া নভেম্বর, অক্টোবর, সেপ্টেম্বর ও আগস্টেও রফতানি আগের বছরের তুলনায় কমেছে।

শুধু রফতানির অর্থমূল্যই নয়, নতুন ক্রয়াদেশের সূচক হিসেবেও দুর্বলতার ইঙ্গিত মিলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সূচক পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি সময়ে রফতানি ঋণপত্রের বিপরীতে ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্র খোলা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ৬৯ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে এসব ঋণপত্র নিষ্পত্তিও কমেছে ৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ প্রবণতা ভবিষ্যৎ রফতানিপ্রবাহের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।

ইপিবির তথ্যে দেখা যায়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ থেকে বিশ্ববাজারে ৩৪৯ কোটি ৫২ লাখ ৭০ হাজার ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এ অংক ছিল ৩৯৭ কোটি ৩১ লাখ ৪০ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে গত মাসে রফতানি কমেছে প্রায় ১২ শতাংশের বেশি।

রফতানি খাতের প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্পেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে এ খাতে রফতানি হয়েছে ২ হাজার ৫৭৯ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার ডলারের পণ্য, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ কম। মোট রফতানির প্রায় ৮০ দশমিক ৮৫ শতাংশই এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। ইপিবি জানিয়েছে, নিটওয়্যার পণ্য এখনো ওভেন পোশাকের তুলনায় ভালো অবস্থানে রয়েছে।

রফতানি বাজারের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় গন্তব্য। চলতি অর্থবছরের আট মাসে দেশটিতে রফতানি হয়েছে ৫৮৭ কোটি ৪১ লাখ ৩০ হাজার ডলারের পণ্য, যা সামান্য প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। অন্যদিকে প্রধান বাজারগুলোর মধ্যে চীন সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, যার হার প্রায় ১৯ দশমিক ১২ শতাংশ।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক কয়েক বছরে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা রফতানি খাতকে চাপের মধ্যে রেখেছে। এর মধ্যে নতুন করে আন্তর্জাতিক সংঘাত পরিস্থিতি তৈরি হলে পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে এবং ক্রয়াদেশের প্রবাহেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ফলে সামনের মাসগুলোতে রফতানিপ্রবণতা কোন দিকে যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর।