কিন্তু বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূচক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে। বিশেষ করে ভারত ও ভিয়েতনামের তুলনায় বাংলাদেশের বন্দর দক্ষতা, লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনা এবং বাণিজ্য সহায়ক অবকাঠামোতে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। ফলে বৈদেশিক বাণিজ্যের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ২০২৩ সালের লজিস্টিকস পারফরম্যান্স ইনডেক্স (এলপিআই) অনুযায়ী, বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে ভারতের অবস্থান ৩৮ এবং ভিয়েতনামের ৪৩। অন্যদিকে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৮তম। এলপিআই মূলত বন্দর অবকাঠামো, কাস্টমস প্রক্রিয়া, পণ্য পরিবহনের দক্ষতা এবং লজিস্টিক সেবার মানসহ কয়েকটি সূচকের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। এ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে অনেক পিছিয়ে থাকা ইঙ্গিত দেয় যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনায় দেশের লজিস্টিক সক্ষমতায় এখনো উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
একই ধরনের চিত্র পাওয়া যায় অ্যাজিলিটি এমার্জিং মার্কেটস লজিস্টিকস ইনডেক্স ২০২৫-এ। এ সূচকে উদীয়মান বাজারগুলোর লজিস্টিক সক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়। এখানে ভারত রয়েছে দ্বিতীয় এবং ভিয়েতনাম দশম স্থানে। অথচ বাংলাদেশ রয়েছে ৩৯তম অবস্থানে। অর্থাৎ লজিস্টিক অবকাঠামো ও সেবার মানের বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক নিচে।
বন্দর দক্ষতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের দুর্বলতা স্পষ্ট। কনটেইনার পোর্ট পারফরম্যান্স ইনডেক্স (সিপিপিআই) ২০২৪ অনুযায়ী, ভারতের মুন্দ্রা বন্দর রয়েছে ২৫তম এবং জওহরলাল নেহরু বন্দর ২৩তম স্থানে। ভিয়েতনামের হাইফং বন্দর রয়েছে ৩০তম অবস্থানে। অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামের অবস্থান ৩৫৬তম। এ সূচকটি মূলত জাহাজের অপেক্ষার সময়, কনটেইনার ওঠানামার গতি এবং সামগ্রিক অপারেশন দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। ফলে এ সূচকে এত নিচে অবস্থান করা বাংলাদেশের বন্দর ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন।
বাণিজ্য উন্মুক্ততার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। ট্রেড ফ্রিডম সূচক ২০২৫ অনুযায়ী, ভিয়েতনামের অবস্থান ৫৩ হলেও বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৮। ভারতের অবস্থান ১৪৩। বাণিজ্য নীতি, শুল্ক কাঠামো এবং আমদানি-রফতানি প্রক্রিয়ার জটিলতা এ সূচকে প্রভাব ফেলে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের লজিস্টিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো বন্দর অবকাঠামোর সীমিত সক্ষমতা এবং অপারেশনাল দক্ষতার ঘাটতি। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হলেও এর নাব্যতা, জাহাজ প্রবেশের সীমাবদ্ধতা এবং অবকাঠামোগত চাপ আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ফলে বড় আকারের কনটেইনার জাহাজ সরাসরি এ বন্দরে প্রবেশ করতে পারে না। এর কারণে অনেক ক্ষেত্রে ট্রানশিপমেন্টের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা পরিবহন ব্যয় ও সময় উভয়ই বাড়িয়ে দেয়।
অন্যদিকে ভারত ও ভিয়েতনাম গত দুই দশকে তাদের বন্দর অবকাঠামো আধুনিকীকরণে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। বড় গভীর সমুদ্রবন্দর, আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল এবং দক্ষ লজিস্টিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে তারা বৈশ্বিক বাণিজ্য শৃঙ্খলে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলোও এসব বন্দরের প্রতি বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে।





