মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ যতটা সম্ভব সীমিত রাখা। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে জ্বালানি তেল, গ্যাস, সার, পরিবহন ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর। তাই আমরা কাগুজে পরিকল্পনায় নয়, বাস্তব অর্থনীতির মূল জায়গাগুলোয় নজর দিচ্ছি। জ্বালানিনিরাপত্তা, খাদ্য ও কৃষি উপকরণ সরবরাহ, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বাজার স্থিতিশীলতা আমাদের প্রধান লক্ষ্য।

আমরা পরিস্থিতিকে শুধু তাৎক্ষণিক সংকট হিসেবে দেখছি না; আমরা এটাকে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিতে দেখছি। সে কারণে সরকার এমন একটি অর্থনৈতিক কৌশল নিচ্ছে, যেখানে একদিকে থাকবে প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিতে সব বিকল্প উৎসের সন্ধান, অন্যদিকে থাকবে মূল্যস্ফীতি, আমদানি ব্যয় ও রিজার্ভের ওপর চাপ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা। আমাদের লক্ষ্য হলো অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা, উৎপাদন সচল রাখা এবং মানুষের জীবনযাত্রায় অপ্রয়োজনীয় কষ্ট বাড়তে না দেয়া।

বাংলাদেশের বাস্তবতা হচ্ছে আমরা জ্বালানি ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত। তাই বৈশ্বিক ধাক্কা পুরোপুরি এড়ানো সবসময় সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা প্রস্তুতি, সমন্বয় ও দ্রুত নীতিসিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে সেই ধাক্কাকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি। এটাই এখন সরকারের মূল কৌশল।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট সংকটের বিষয়টিকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। এ কারণেই সরকার অতি দ্রুততার সঙ্গে একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করেছে, যার কাজ হলো যুদ্ধ পরিস্থিতির সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন করা এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় একটি কার্যকর ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট প্রস্তুত করা। কমিটিতে অর্থ, জ্বালানি, বাণিজ্য, স্বরাষ্ট্র, প্রবাসী কল্যাণ, খাদ্য ও স্থানীয় সরকারের মতো সব গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়কে যুক্ত করা হয়েছে, যাতে সমন্বিত এবং বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়।

আমাদের প্রস্তুতি কয়েকটি স্তরে এগোচ্ছে। প্রথমত, জ্বালানি তেল, এলএনজি ও সারের মজুদ, আমদানি ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্যও কাজ চলছে। তৃতীয়ত, প্রয়োজন হলে বিদ্যুৎ, কৃষি ও জরুরি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে জ্বালানি বণ্টনের ব্যবস্থা নেয়া হবে। অর্থাৎ আমরা প্যানিক রেসপন্স নয়, প্ল্যানড রেসপন্সের পথে হাঁটছি।

বৈশ্বিক অস্থিরতা শুধু জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় না; শিপিং খরচ, বীমা ব্যয়, এলএনজি সরবরাহ, সার উৎপাদন, এমনকি ভোক্তাদের মনস্তত্ত্বের ওপরও প্রভাব ফেলে। সে কারণে সরকার শুধু জ্বালানির বিষয়টি দেখছে না; একই সঙ্গে বাজার তদারকি, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ, প্রবাসী বাংলাদেশীদের নিরাপত্তাসহ সবকিছু একসঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। সরকার জনগণকে আশ্বস্ত করতে চায়, আমরা পরিস্থিতির ওপর সতর্ক নজর রাখছি এবং তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি।

আসন্ন বাজেটের মূল বার্তা হবে বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ আরো শক্তিশালী করা, আর সে প্রক্রিয়ায় বেসরকারি খাতকে প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে এগিয়ে নেয়া। আমরা বিশ্বাস করি, টেকসই কর্মসংস্থান, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক শক্তি সবকিছুর কেন্দ্রেই রয়েছে ব্যক্তি খাত নিয়ন্ত্রিত প্রবৃদ্ধি। সে কারণেই সরকার বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ঋণপ্রবাহ ও আর্থিক খাতের কার্যকারিতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে।

পুঁজিবাজারের বিষয়ে আমাদের বার্তা হবে খুবই পরিষ্কার আমরা কৃত্রিম উত্থান চাই না, কাঠামোগত সংস্কার চাই। বাজারকে কয়েকজনের নিয়ন্ত্রণে রেখে নয়, বরং আরো বিস্তৃত অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসনের ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে চাই। আমরা চাই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমে আসুক এবং পুঁজিবাজার প্রকৃত অর্থেই শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের একটি কার্যকর প্লাটফর্মে পরিণত হোক। অর্থাৎ বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য হলো ঋণনির্ভর নয়; বরং বিনিয়োগনির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, যেখানে পুঁজিবাজার মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে। সরকার বাংলাদেশীদের নিরাপত্তাসহ সবকিছু একসঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। সরকার জনগণকে আশ্বস্ত করতে চায়, আমরা পরিস্থিতির ওপর সতর্ক নজর রাখছি এবং তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি।

আসন্ন বাজেটের মূল বার্তা হবে বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশকে আরো শক্তিশালী করা, আর সে প্রক্রিয়ায় বেসরকারি খাতকে প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে এগিয়ে নেয়া। আমরা বিশ্বাস করি, টেকসই কর্মসংস্থান, উৎপাদন বৃদ্ধি ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক শক্তি সবকিছুর কেন্দ্রেই রয়েছে ব্যক্তি খাতের নেতৃত্বে প্রবৃদ্ধি। সে কারণেই সরকার বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ঋণপ্রবাহ ও আর্থিক খাতের কার্যকারিতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে।