এ নীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল ঋণের সুদহার বাড়িয়ে বাজারের চাহিদা কমানো এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা। কিন্তু বাস্তবে এ নীতির সুফল সাধারণ মানুষ খুব কমই পেয়েছে। বরং উচ্চ সুদহার বেসরকারি বিনিয়োগকে আরো সংকুচিত করেছে এবং অর্থনীতিতে স্থবিরতা বাড়িয়েছে। একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিপুল পরিমাণ মুনাফা অর্জন করেছে, যা নীতির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১-২২ থেকে ২০২৪-২৫—এ চার অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মোট ১ লাখ ৫২ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। এর মধ্যে ৫১ হাজার ৫১২ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া হয়েছে। এ বিপুল মুনাফার বড় অংশ এসেছে বৈদেশিক মুদ্রার পুনর্মূল্যায়ন এবং ডলার বিক্রি থেকে। ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এ সময়ে প্রায় ৯৮ হাজার ৮০৪ কোটি টাকার আয় হয়েছে, যার একটি বড় অংশ এসেছে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করে। পাশাপাশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে দেয়া স্বল্পমেয়াদি ঋণের সুদ থেকেও ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি আয় হয়েছে।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ রেকর্ড মুনাফার বিপরীতে দেশের অর্থনীতি একই সময়ে বড় ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। ডলার সংকট মোকাবেলায় রিজার্ভ থেকে টানা কয়েক বছর ডলার বিক্রির ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত কমে যায়। ২০২১ সালের আগস্টে যেখানে গ্রস রিজার্ভ ছিল প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার, তা মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে নেমে আসে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারে। একই সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন ঘটে, যা আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি আরো ত্বরান্বিত করে।
সংকোচনমুখী মুদ্রানীতির কারণে নীতি সুদহার দুই অংকের ঘরে ওঠায় বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি কমেছে, অনেক মানুষ বেকারত্বের ঝুঁকিতে পড়েছে এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে। আয় না বাড়লেও ব্যয় বাড়তে থাকায় বহু পরিবার সঞ্চয় ভেঙে খরচ চালাতে বাধ্য হয়েছে, ফলে দারিদ্র্যের ঝুঁকিও বেড়েছে।
যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান দায়িত্ব মুনাফা অর্জন নয়; বরং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের পরিবেশ তৈরি করা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, মুদ্রানীতির কঠোরতা সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়ালেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আয় বেড়েছে। তাই অর্থনীতির সামগ্রিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে নীতিনির্ধারণে ভারসাম্য ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা জরুরি





