আস্থার ঘাটতির মূল কারণটি খুঁজে বের করা জরুরি। গত প্রায় দেড় দশকে আমাদের বাজারে উল্লেখযোগ্য কোনো মানসম্পন্ন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি। যে বাজারে ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয় না, সেখানে ভালো পণ্য বা শক্তিশালী বিনিয়োগের সুযোগও আসে না। ফলে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ ধরে রাখতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সুরক্ষা ও যৌক্তিক মুনাফা নিশ্চিত করা না গেলে কোনো বাজারই সামনে এগোতে পারে না। কারণ সে বাজারের প্রতি তখন বিনিয়োগকারীদের আস্থা হারিয়ে যায়।

পুঁজিবাজারে আমরা ভালো বিনিয়োগকারীও তৈরি করতে পারিনি। ভালো বিনিয়োগকারী মানে হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী। আর প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হচ্ছে মিউচুয়াল ফান্ড, আমরা এটিকে উন্নত করতে পারিনি। আমাদের পুঁজিবাজার মূলত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীনির্ভর। যে কারণে বাজারে যখন একটা সংকট আসে, তখন সেটাকে কাটিয়ে ওঠার জন্য যে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা, মেধা ও পুঁজি দরকার সেগুলো আমরা তৈরি করতে পারিনি।

আরেকটা সমস্যা হচ্ছে আমাদের নেগেটিভ ইকুইটি; যেটা পৃথিবীর কোনো বাজারে আপনি শুনবেন না। নিয়ন্ত্রক কাঠামোর ব্যর্থতার কারণেই এটি ঘটেছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো বেশ জোরালো ও কার্যকর ভূমিকা পালন করে। শ্রীলংকা, পাকিস্তান ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বেশ শক্তিশালী, ভারত তো এক্ষেত্রে বৈশ্বিক স্তরে পৌঁছে গেছে।

নিয়ন্ত্রণ সংস্থার ব্যর্থতার কারণে আমাদের বাজার পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা সংস্থা যেমন ডিএসই, সিএসই, সিডিবিএল কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। সেই সঙ্গে ব্রোকার, মার্চেন্ট ব্যাংক ও সম্পদ ব্যবস্থাপকরাও তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। এটি পুরো ইকোসিস্টেমে একটি সামষ্টিক ব্যর্থতা, যার কারণে নেগেটিভ ইকুইটি তৈরি হয়েছে।

তাছাড়া নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতার কথা যখন বলছি তখন সেখানে সুশাসনের ঘাটতির বিষয়টিও চলে আসে। আমরা শুধু স্থানীয় নয় বিদেশী বিনিয়োগকারীদেরও পুঁজিবাজারে আনতে পারিনি। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য আমরা এমন একটি পুঁজিবাজার চাই যেখানে নিয়ন্ত্রক সংস্থায় যারা থাকবেন তাদের যাতে বাজার সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকে। ডিরেগুলেশনের মাধ্যমে স্টক এক্সচেঞ্জকে পর্যাপ্ত ক্ষমতা দিতে হবে, যাতে করে বাজার পরিচালনার কাজ তারা নিজেরাই করতে পারে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা শুধু সরকারে আর্থিক ও মুদ্রানীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নীতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি অনিয়ম ও আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি নজরদারি করবে ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে। পুঁজিবাজারে যত দ্রুত সম্ভব ভালো কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করতে হবে। এক্ষেত্রে যত ধরনের ছাড় দেয়া দরকার সেটি দিতে হবে। ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে বিনিয়োগকারীরাও এখানে আসতে আগ্রহী হবেন। সর্বোপরি সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিষয়ে কোনো ছাড় দেয়া যাবে না।