বেসরকারি খাত এক সময় বড় আকারে বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে। এখন সেই অংশগ্রহণ কমে যাচ্ছে মূলত উচ্চ দামের কারণে। সরবরাহ বাড়াতে ট্যারিফে কোনো কৌশলী ভূমিকা রাখবে কিনা বেসরকারি খাত?

বেসরকারি খাতে সাড়ে নয় হাজার মেগাওয়াট তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র আছে। ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে ২০২২-২৩ তুলনায় বিগত দুই অর্থবছর কম বিদ্যুৎ কিনছে সরকার। কারণটা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে এসেছে। মূল বিষয়টা হচ্ছে কয়লার সঙ্গে প্রতিযোগিতা। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ট্যারিফ যেটা সেখানে দুটি কম্পোনেন্ট রয়েছে। প্রথমত, ক্যাপাসিটি কম্পোনেন্ট দ্বিতীয়ত, এনার্জি কম্পোনেন্ট। বতর্মানে কয়লার আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য ফার্নেস অয়েলের চেয়ে অনেক কম। ফলে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রের চেয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে এনার্জি কস্ট কম হচ্ছে। এছাড়া কয়লার আমদানিতে শুল্ক ৫ শতাংশ। বিপরীতে ফার্নেস অয়েলের শুল্ক ৩৪ শতাংশ। তবে এফিশিয়েন্সি বিবেচনা করলে আবার কিন্তু কয়লার চেয়ে ফার্নেস অয়েলের এফিশিয়েন্সি অনেক বেশি। শুল্কের বিষয়টি সমান করার জন্য আমরা সরকারকে পরামর্শও দিয়েছি।

বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর কাছে সরকারের বিপুল বিল বকেয়া পড়েছে। বন্ডের মাধ্যমে সরকার পরিশোধ করছে। সরকারের এ পদ্ধতি আইপিপি উদ্যোক্তাদের কতটুকু সহায়তা করছে?

সরকারের কাছে বিপুল পরিমাণ বকেয়া দীর্ঘদিন পড়ে আছে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর। আমরা অনেক দেরি করে বিল পেয়েছি। আবার ডলারের বিপরীতে টাকার যখন ব্যাপকভাবে অবমূল্যায়ন হচ্ছিল, তখন আমরা ৮৫ টাকা ধরে বিদ্যুতের বিল করেছি কিন্তু যখন বিলটা পেয়েছি, তখন আমার জ্বালানি তেল সরবরাহকারীর কাছে পেমেন্ট করেছি ১০৫ টাকা হিসাব ধরে। টাকার অবমূল্যায়নজনিত ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বড় আকারে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি। এভাবে গত দুই থেকে আড়াই বছরে এইচএফও বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার মতো লোকসান করেছি। বিভিন্ন কোম্পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের লোনের কারণে বিরাট চাপের মধ্যে পড়েছে। সামগ্রিকভাবে টাকার অবমূল্যায়ন এবং ব্যাংকের সুদের কারণে এইচএফও বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা লস করেছে। এটা অবশ্যই আমাদের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করেছে। এটার প্রতিফলনে শেয়ারবাজারের তালিকাভুক্ত বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থা ক্রমাগত খারাপ হয়েছে। এখন কিন্তু সেটা দৃশ্যমান।

বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো এবং বিদ্যুৎ খাত এমনিতেই আর্থিকভাবে অনেক আগে থেকে দুর্বল ছিল, সেখানে এ বন্ডের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ কোম্পানিকে আরো অর্থনৈতিকভাবে নাজুক করে দিয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের অনেক কোম্পানি আছে, যারা অপেক্ষাকৃত বৃহৎ একটা গ্রুপের পাওয়ার কোম্পানি। তারা হয়তো এ সমস্যাটাকে ভিন্নভাবে সামাল দিয়েছে। আর যারা শুধু বিদ্যুৎ ব্যবসাই করে, তারা কীভাবে সামাল দেবে এ পরিস্থিতি? যারা বিদ্যুৎ খাতে পুরনো উদ্যোক্তা তাদের এক ধরনের সমস্যা, আর যারা নতুন উদ্যোক্তা তাদের আরেক সমস্যা। বন্ডের মাধ্যমে সবাই পেমেন্ট নিতে চায় না। কিন্তু এটা ছাড়া আর কি উপায় ছিল? এ সরকার আসার পরে বন্ডের মাধ্যমে ৫ হাজার কোটি টাকা পেমেন্টে করেছে। বাস্তবতার নিরিখে আমাদের চলতে হবে।

বিদ্যুৎ খাতে একদিকে বিপুল সক্ষমতা, অন্যদিকে বড় আকারের বকেয়া, এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার কী করতে পারে, বেসরকারি খাতের পরামর্শটা কী হবে?

বিদ্যুৎ খাতে বিদ্যমান এ সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রথমত, ভর্তুকি এ খাতে কমাতে হবে, এটাই বাস্তবতা। এটা করা যেতে পারে এফিশিয়েন্সি কিংবা দক্ষ ব্যবস্থাপনা বাড়িয়ে। এগুলো ঠিক করা হলেও তার পরও দাম বাড়াতে হবে। বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি সব সময়ই ছিল। কিন্তু ভর্তুকি কেন বেড়ে গেল এটা বড় প্রশ্ন। ২০১৮-১৯-এর পর দেশে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। সে সময় আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি মিশ্রণে ১৫ শতাংশ ছিল আমদানি। আর ৮৫ শতাংশ ছিল নিজস্ব জ্বালানি। তার পরে আমরা যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছি সেখানে দুটি ঘটনা হচ্ছে। প্রথমত, সেই সময় বিদ্যুতের যে চাহিদা ছিল তার চেয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চাহিদা বেড়েছে। বর্ধিত এ চাহিদার বিদ্যুৎ আমরা দিচ্ছি সেটার জন্য প্রযোজ্য জ্বালানি সম্পূর্ণ আমদানিকৃত। এখন দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৩৫ শতাংশ নিজস্ব জ্বালানি আর ৬৫ শতাংশ আমদানিকৃত জ্বালানি। বিগত কয়েক বছরে কিন্তু জ্বালানির মিশ্রণে বড় পরিবর্তন এসেছে। আগের ১৫ শতাংশের তুলনায় এখন ৬৫ শতাংশ। এ ৬৫ শতাংশের দাম বৈশ্বিক বাজার মূল্য অনুযায়ী দিতে হবে।

সরকার ব্যয় কমাতে বেসরকারি খাতের ট্যারিফ কমানোর দিকে এগোচ্ছে। আসলে এ ধরনের কৌশল করে সরকার কতটুকু খরচ কমাতে পারবে?

প্রথমত আমাদের মূল খরচটা হয় জ্বালানিতে। সার্ভিস চার্জের পরিমাণ সরকার এইচএফও আমদানির ওপর ৯ থেকে ৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। এটা সরাসরি সরকার একটা সাশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু সাশ্রয়ের পরিমাণ বছরে সর্বোচ্চ ১ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। সার্ভিস চার্জ কমানোর ফলে কিন্তু আইপিপিগুলো লোকসান করছে, তার পরও কিন্তু আমরা বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রেখেছি। এ বছর আমরা গ্রীষ্মের পুরো প্রবাহটা এখনো পাইনি, হয়তো এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ থেকে পাওয়া শুরু হবে। তখন বুঝতে পারব এ সার্ভিস চার্জের আওতায় নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ আমরা কতটা দিতে পারছি। এখানে এইচএফও বিষয়টা সরকারের হাতে ছিল, কারো সঙ্গে আলোচনা না করেই সরকার কমিয়ে দিয়েছে। আমরা পর্যবেক্ষণ করছি, এ চার্জ কমানোর ফলে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারব কিনা। যদি আমরা পারি তাহলে ভালো। না হলে সরকারকে জানাব।

দেশের বিদ্যুৎ খাতের সমস্যা নিরসরে সরকারের কোন পদক্ষেপের প্রতি সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া জরুরি বলে মনে করেন।

সরকার বকেয়া বিলগুলো তাড়াতাড়ি পরিশোধের উদ্যোগ নিয়েছে। এটা সরকার বাস্তবায়ন করতে পারছে। একটা বিষয় হচ্ছে সরকারের উদ্দেশ্য, অপরটি সক্ষমতা। সরকারের সক্ষমতা আসছে মূলত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) থেকে। অর্থাৎ আমরা যে মাঠ পর্যায়ে রাস্তাঘাট তৈরি করি, প্রান্তিক পর্যায়ে টাকা পরিশোদের জন্য অন্যান্য রাজনৈতিক সরকার বিভিন্ন যে পদক্ষেপগুলো নিয়ে থাকে কিংবা ভবিষ্যতে নেবে—সেটা এ সরকার সেভাবে করছে না। বরং সেখান থেকে খরচ কমিয়ে এখন বিভিন্ন পাওনাদারদের দেনা পরিশোধ করছে। কিন্তু ভবিষ্যতে কি এটা ধরে রাখা সম্ভব হবে? প্রান্তিক পর্যায়ে আমাদের অর্থনীতিতে স্থবিরতা আছে এটা বাস্তবতা।