শুরুতেই ইস্পাত খাতের বাজারে বর্তমান চাহিদা ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাই।

অবকাঠামো খাতের উন্নয়ন ইস্পাত শিল্পের সরাসরি চালিকাশক্তি। দেশে এখন চাহিদা যেটা আছে সে তুলনায় উৎপাদন সক্ষমতা অনেক বেশি। সরকারিভাবে বড় অবকাঠামোগুলোর কর্মযজ্ঞ ধীর হয়েছে। সব মিলিয়ে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে ইস্পাত উৎপাদনের যে সক্ষমতা তৈরি করেছে তার বড় অংশই ব্যবহার হচ্ছে না। দেশে ইস্পাতের ব্যবহার বর্তমানে বছরে গড়ে ৫০ লাখ টনে নেমে এসেছে।

ইস্পাত শিল্পে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ বড় করে দেখছেন আপনি?

প্রাইস নিয়ে প্রতিযোগিতা হচ্ছে এখন। ইস্পাত শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ঋণপত্র খুলতে আগে যেখানে প্রতি ডলারের বিপরীতে ৮০-৮৫ টাকা লাগত সেখানে ১২০ টাকা ছাড়িয়েছে। এমনিতে ইস্পাত খাতে চলতি মূলধন বেশি প্রয়োজন অন্যদিকে ডলারের দর অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় এখন ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল রিকুয়্যারমেন্টও ৭০ শতাংশ বেড়ে গেছে। অর্থাৎ আগে যেখানে ১০০ টাকা ওয়ার্কিং ক্যাপিটালে চালানো যেত এখন সেখানে ১৭০ টাকার প্রয়োজন হচ্ছে। অতিরিক্ত পুঁজির এ চাহিদার জন্য ব্যাংক থেকে যে সাপোর্ট প্রয়োজন সেটি আবার মিলছে না। ফলে কাঁচামাল আমদানির জন্য যতটুকু চাহিদা আছে সেটিও পুরোপুরিভাবে মিট করা সম্ভব হচ্ছে না। ইন্টারেস্ট রেট ছিল আগে নয় থেকে ১০ শতাংশ, সেটাও এখন ব্যবসায়ীদের অনুকূলে নেই।

ভারী এ শিল্প খাতের অনুকূলে কোন নীতি-সহায়তা আশা করছেন?

ইস্পাত খাতকে রক্ষা করতে হলে অবিলম্বে এর সুরক্ষা দেয়া প্রয়োজন। তা না হলে অনেক শিল্প-কারখানা রুগ্ন হয়ে যাবে। বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থান নিয়েও ঝুঁকি তৈরি হবে। এ ঘাটতি পূরণে আমরা কোনো প্রণোদনা কিংবা মূলধন সহযোগিতার কথাও বলছি না। সুরক্ষা হিসেবে ইস্পাত খাতের স্বল্পমেয়াদি ঋণকে বৃদ্ধি করে দীর্ঘমেয়াদি ঋণে রূপান্তর করার প্রস্তাব করছি। ইস্পাতসহ ভারী শিল্প খাতে যদি দীর্ঘমেয়াদে স্বল্প সুদে ঋণ না পায় দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা যাবে না। আরেকটা বিষয় হলো অন্যান্য খাতের উৎপাদন বাড়লে আমাদের খাতেও উৎপাদন বাড়বে। এককভাবে শুধু একটা খাতকে উজ্জীবিত করা সম্ভব নয়। কর কাঠামোকে আরো সরল ও ব্যবসাবান্ধব করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ইস্পাত শিল্পের জন্য করের বোঝা কমালে তারা আরো শক্তিশালী হবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান বাড়াতে পারবে।

সম্প্রতিকালে শিল্প খাতে দৃশ্যমান কোন কোন উন্নতি পরিলক্ষিত হয়েছে?

আশাজাগানিয়া খবর হলো ডলারের ঊর্ধ্বমুখী লাগাম টেনে ধরা ও ফরেন কারেন্সির রিজার্ভও ভালো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক উপাদানের দাম কমেছে এটাও স্বস্তিদায়ক একটা খবর। সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত আছে যেগুলো অর্থনীতির জন্য সুখকর হবে বলে আমার মনে হচ্ছে। কোভিড পরিস্থিতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ নানান কারণে যেসব ব্যবসায়ী প্রকৃতপক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের সহায়তায় অন্তর্বর্তী সরকারের যেসব উদ্যোগ আমরা জানতে পেরেছি এটা ব্যবসার পরিবেশকে শক্তিশালী করবে।

প্রযুক্তি কীভাবে ইস্পাত খাতের ওপর প্রভাব বিস্তার করে? আপনার প্রতিষ্ঠিত কারখানার প্রযুক্তি নিয়েও জানতে চাই।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চিন্তা করলে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রক্রিয়া সময়ের দাবি। আমরা জিপিএইচ ইস্পাতে অত্যাধুনিক গ্রিন টেকনোলজি ব্যবহার করছি। আমরা আড়াই হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তি ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস এনেছি বাংলাদেশে। এ প্রযুক্তির ব্যবহারে দ্রুত সময়ে সর্বোচ্চ পরিশোধিত রড তৈরি হচ্ছে। প্রযুক্তিতে অক্সিজেন ব্যবহারের মাধ্যমে স্ন্যাগ ফেলে দিয়ে নিখাদ স্টিল তৈরি করছি। শিল্পের ধরন, অবকাঠামোর মান, ব্যবহৃত প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতার ওপর দূষণের মাত্রা নির্ভর করে যেখানে জিপিএইচ ইস্পাতের কোয়ান্টাম আর্ক ফার্নেস প্রযুক্তিতে এ ক্ষতির মাত্রা খুবই কম। পানির দক্ষ ব্যবহারেও এগিয়ে আছে আমাদের কারখানা। এখানে বর্জ্য পানি পরিশোধনে ব্যবহার করা হয়েছে বিশ্বের সর্বোন্নত প্রযুক্তি।

আসন্ন ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট দরজায় কড়া নাড়ছে। দেশের ইস্পাত খাতের একজন প্রথমসারির উদ্যোক্তা এবং একই সঙ্গে এ খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠনের সভাপতি হিসেবে সুনির্দিষ্টভাবে কোন কোন নীতি পরিবর্তন বা নতুন পদক্ষেপ আপনারা বাজেটে দেখতে চান যা ইস্পাত শিল্পের বিকাশে সহায়ক হবে?

সুদহার অবশ্যই কমাতে হবে। এটার কারণে আমাদের সক্ষমতা অনেক কমে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত হলো, এআইটি না নেয়ার জন্য জোর আবেদন জানাই। এটা সত্যি অনৈতিক একটা কর। অগ্রিম কর নেয়ার এ পদ্ধতি উদ্যোক্তাদের পুঁজি আটকে রাখে। আসছে বাজেটে এ ব্যাপারে এনবিআরের পক্ষ থেকে একটা ভালো সিদ্ধান্ত পাব বলে বিশ্বাস করি। প্রধান কাঁচামাল পুরনো লোহার টুকরো আমদানির বিপরীতে যে শুল্ক বিদ্যমান সেটা অসহনীয় বলব না। এখানে ৩-৪ শতাংশ আমদানি শুল্ক আছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সরকারের শুল্ক নিয়ে সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে যে চিঠি পাঠানো হয়েছে তাতে ইস্পাতের কাঁচামালের ব্যাপারেও শূন্য শুল্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাই বর্তমানে আদায় হওয়া এ শুল্ক তুলে নেয়া হলে সরকারের পক্ষ হতে পাঠানো এ চিঠির যথার্থতা থাকবে এবং যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের দেশ হতে যে রফতানি তাতেও এর ইতিবাচক প্রভাব আসবে। সর্বোপরি একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং স্থিতিশীল নীতি কাঠামো তৈরি করা জরুরি যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে।