গুণগত মানের ক্ষেত্রে বিদেশী পণ্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে আছে দেশীয় সিরামিক পণ্য। এটি কীভাবে সম্ভব হচ্ছে?

আমরা এখন সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছি যেমন ইউরোপিয়ান মেশিন, ডিজিটাল প্রিন্টিং প্রযুক্তি এবং অটোমেশন সিস্টেম। আমরা ডিবিএল সিরামিকস -এ ইউরোপ থেকে আমদানিকৃত ফ্রিটস, গ্লেজ ও ডিজিটাল ইনক ব্যবহার করি। সেই সঙ্গে আমাদের প্রশিক্ষিত এবং অভিজ্ঞ টিম প্রতিটি ধাপে কঠোর কোয়ালিটি কন্ট্রোল এবং ইনোভেশনকে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের নিজস্ব অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি রয়েছে, যেখানে ব্রেকিং স্ট্রেন্থ, ওয়াটার অ্যাবজরপশন এবং ক্রেজিং টেস্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্যারামিটারগুলো নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের পণ্য আন্তর্জাতিক গুণমান বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।

সিরামিকে দেশীয় কাঁচামাল কতটুকু এবং আমদানি করতে হয় কতটুকু?

বর্তমানে আমাদের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ১০-২০% দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করা হয়, বিশেষ করে ক্লে ও কিছু মিনারেলস। বাকি ৮০-৯০% উন্নত মানের এবং বিশেষায়িত কিছু কাঁচামাল, যেমন ফেল্ডস্পার, গ্লেজ, ডিজিটাল ইনক বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। দেশীয়ভাবে কিছু খনিজ সম্পদ পাওয়া গেলেও গুণগত মান এবং প্রয়োজনীয় পরিমাণের জন্য আমদানীকৃত কাঁচামাল অপরিহার্য। তবে দেশীয় উৎসকে আরো উন্নত করা এবং বিকল্প কাঁচামাল অনুসন্ধানের জন্য আমাদের আরঅ্যান্ডআই টিম কাজ করে যাচ্ছে।

সিরামিক এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে রূপান্তরিত হয়েছে। দাম নাগালের মধ্যে রাখতে কী পদক্ষেপ প্রয়োজন? বাজেটে সিরামিক খাতের জন্য ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা কী?

সিরামিক পণ্য আজ আর বিলাসিতা নয়, এটি প্রতিটি বাসগৃহ ও কমার্শিয়াল স্পেসের অপরিহার্য অংশ। দাম সহনীয় রাখতে আমরা ম্যাস প্রোডাকশন করে ইউনিট কস্ট কমিয়েছি এবং গ্রিন ম্যানুফ্যাকচারিং (ওয়েস্ট রিসাইক্লিং, এনার্জি এফিসিয়েন্সি) ইমপ্লিমেন্ট করে খরচ নিয়ন্ত্রণ করছি। তবে দাম নাগালে রাখতে গ্যাসের স্থায়ী ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় উৎপাদনে সহায়তা বৃদ্ধি প্রয়োজন। তাই এবারের বাজেটে আমরা চাই গ্যাস প্রাইজ রিভিউ এবং স্থানীয় সিরামিক শিল্পের বিকাশে নীতিগত সহায়তা এবং প্রণোদনা প্রদান।

বিগত বাজেটগুলোয় আপনাদের দাবি কতটা পূরণ হয়েছে? এবারের বাজেটে প্রত্যাশা কী?

বিগত বাজেটে কিছু প্রণোদনা পাওয়া গেলেও তা ছিল আংশিক। আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ—গ্যাস সংকট এবং অধিকাংশ সময়ই কাস্টম থেকে পণ্য ছাড়কালীন সময়ে চালানের দাম থেকে অস্বাভাবিক হারে মূল্যায়ন ধার্য করে শুল্কায়ন করার নীতি-এখনো রয়ে গেছে। এবারের বাজেটে আমরা আশা করি, সিরামিক খাতকে থ্রাস্ট সেক্টর হিসেবে ঘোষণা দিয়ে বিশেষ সুবিধা প্রদান করা হবে, যাতে আমরা আরো প্রতিযোগিতামূলকভাবে বিশ্ববাজারে অংশ নিতে পারি।

দেশের বাজারে আপনারা কয় ধরনের সিরামিক পণ্য সরবরাহ করেন? পণ্যের গুণগত মান নিয়ে ভোক্তাদের উদ্দেশে বার্তা দিন।

ডিবিএল সিরামিকস দেশজুড়ে ১২টিরও বেশি বিভিন্ন ক্যাটাগরির দেড় হাজারের বেশি ডিজাইনের সিরামিক পণ্য সরবরাহ করছে। এর মধ্যে রয়েছে ফ্লোর টাইলস (টেকনিক্যাল পোর্সেলিন, গ্লেজড পোর্সেলিন, হাই ডেফিনিশন রিলিফ, মিরর পলিশ, ন্যানো ক্রিস্টাল পলিশ, ডাবল লেয়ার) এবং ওয়াল টাইলস (গ্লেজড পোর্সেলিন—জিজিআর, লাস্টার ওয়াল, রাস্টিক ওয়াল, ম্যাট ওয়াল, ইন্টারলক রাস্টিক), স্টেয়ার টাইলস, ইন্ডাস্ট্রিয়াল টাইলস। আমাদের প্রতিটি পণ্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং উন্নত মানের কাঁচামাল দিয়ে তৈরি। ভোক্তাদের উদ্দেশে আমাদের বার্তা হলো, ডিবিএল সিরামিকস গুণগত মানের প্রশ্নে সবসময় আপসহীন। আমরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে পণ্য উৎপাদন করি এবং প্রতিটি পণ্যের গুণগত মান কঠোরভাবে পরীক্ষা করি। আধুনিক প্রযুক্তি, নান্দনিকতা এবং টেকসই—এ তিনের সঠিক সংমিশ্রণ দিয়ে প্রতিটি ঘরের জন্য উপযুক্ত সমাধান দিচ্ছি। আমাদের প্রতিটি টাইল শুধু একটি ডিজাইন নয়, একেকটি শিল্পকর্ম।

সিরামিক খাতে দেশে কর্মসংস্থান কেমন? বিনিয়োগের পরিমাণ কত?

সিরামিক খাতে বর্তমানে প্রায় পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। ডিবিএল সিরামিকসেও কয়েক হাজার কর্মী সরাসরি কাজ করছেন এবং ভবিষ্যতে নতুন ইউনিট চালু হলে এ সংখ্যা আরো বাড়বে। খাতটিতে এরই মধ্যে হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে, যার মাধ্যমে এ শিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

গ্যাস সংকটের কারণে এ খাত প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। এখন পরিস্থিতি কী?

গ্যাস সংকট দীর্ঘদিন ধরেই এ খাতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সিরামিক উৎপাদনে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলেও গ্যাসের সরবরাহ এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি এবং ভবিষ্যতে সরবরাহের নিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে। আমরা গ্যাস অপটিমাইজেশন, কো-জেনারেশন, হিট রিকভারি সিস্টেম এবং এনার্জি এফিসিয়েন্ট মেশিন ব্যবহার করে গ্যাস সাশ্রয় ও নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার চেষ্টা করছি, কিন্তু গ্যাসের দামে অস্থিরতা ও সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকায় উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। সাশ্রয়ী ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ এ খাতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। আমরা আশা করি, সরকার এ বিষয়ে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

সিরামিক পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে দেশীয় কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম কেমন চলছে?

বাংলাদেশের সিরামিক শিল্প এখন আর কেবল ঘরোয়া চাহিদা পূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই—এটি একটি সম্ভাবনাময় রফতানি খাতে পরিণত হয়েছে। গত এক দশকে এ খাত আন্তর্জাতিক বাজারে উল্লেখযোগ্যভাবে অগ্রগতি করেছে। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের সিরামিক পণ্য, বিশেষ করে টাইলস ও স্যানিটারি ওয়্যার ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। এর পেছনে মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে দেশীয় কিছু উদ্যমী কোম্পানি, যারা আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত মান নিয়ন্ত্রণ এবং বিশ্বমানের ডিজাইনের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতায় রূপান্তরিত করেছে।

বিশেষ করে ডিবিএল সিরামিকসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন উদ্ভাবন, ইনহাউজ ডিজাইন স্টুডিও, ইতালিয়ান প্রযুক্তি এবং গ্লোবাল ব্র্যান্ডিং স্ট্র্যাটেজির মাধ্যমে রফতানি সম্ভাবনাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এই কোম্পানিগুলোর লক্ষ্য এখন শুধু উৎপাদন নয়—বিশ্ববাজারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ সিরামিককে একটি মানসম্মত পরিচিতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।