বাংলাদেশে পর্যটন খাতের সম্ভাবনা কেমন?
অবশ্যই পর্যটন খাত আমাদের দেশে সম্ভাবনাময়। কিন্তু আমার মনে হয়, আমরা এখনো সম্ভাবনার শুরুটা করতে পারিনি। আমরা দুদিক দিয়ে ভাগ্যবান ছিলাম। একটা হলো আমাদের দেশীয় অনেক পর্যটক আছে। আর দ্বিতীয়টি হলো বিদেশী পর্যটক। যখন দেশীয় পর্যটকরা খুশি থাকবে তখন বিদেশী পর্যটকরাও আসবে। সংস্কৃতি পরিদর্শন ছাড়াও বিদেশী পর্যটকরা কিছু সাধারণ সুযোগ-সুবিধা চায়। আমরা এটা নিশ্চিত করতে পারলে দেশী-বিদেশী দুই ধরনের পর্যটকের সংখ্যাই বাড়বে।
বাংলাদেশের পর্যটন খাতে বিনিয়োগের পরিবেশ কেমন?
বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে দেখেই বিনিয়োগ আসছে। আমার মনে হয়েছে, যেসব পারমিশন সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে নিতে হয়, সেসব জায়গায় একটা দীর্ঘসূত্রতার বিষয় থাকে। আমাদের সমাজের অনেকেই পর্যটকদের বিষয়ে ওয়েলকামিং না। বিদেশী পর্যটক আকর্ষণের ক্ষেত্রে সমস্যা হলো আমাদের দেশে এক্ষেত্রে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু যে পর্যটক বিদেশ থেকে এসেছেন তিনি তো আমার ধর্মের না। তার ধর্মে অনেক কিছু অনুমতি দেয়, যেটা আমার ধর্মে অনুমোদিত নয়। এ দুটোর মধ্যে ব্যালান্স করতে হবে, যেটা আমরা এখনো করতে পারছি না। দুবাইয়ের কথা যদি বলি, যারা পর্যটক ডাকছে, কাতার ওয়ার্ল্ড কাপের সময় দোহায় তারা বিশ্বকে যেটা দেখাতে পেরেছে কিংবা সৌদি আরবের কথা যদি বলেন, নিজেদের জনগণের জন্য এক আইন, আর অমুসলিম পর্যটকদের জন্য অন্য আইন। এমনকি মালয়েশিয়ায় দেখবেন রমজান মাসে বলে দেয়া হয়, পর্যটকদের জন্য রেস্টুরেন্ট, খাওয়াদাওয়া সব অনুমোদিত। ফলে বিদেশী পর্যটক কোনো অসুবিধায় পড়ছে না।
এটাকে যদি একটা প্র্যাকটিসে আনা যায়, পাশাপাশি আমাদের মানসিকতা যখন বদলাবে তখনই পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে।
পর্যটন খাতে ব্যাংক ঋণ ও মূলধন জোগানের সুযোগ রয়েছে কি? পর্যটননির্ভর অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনায় বাংলাদেশে ব্যাংক ঋণ ও মূলধন জোগানের চিত্রটি কেমন?
পর্যটন অলওয়েজ স্লো প্রডাক্ট—হসপিটালিটি ওয়ার্ল্ডওয়াইড স্লো প্রডাক্ট। কিন্তু এটি লং টাইম সাসটেইনেবল। অন্যান্য খাতে প্রযুক্তি বা চাহিদার অদল-বদল হয়। কিন্তু হসপিটালিটি সেক্টরে প্রযুক্তির অদল-বদল খুব কম হয়। সেই প্রকৃতি দেখতে যাওয়া, রুমে থাকা, সুইমিংপুলে সাঁতার কাটা, সিনেমা দেখা ইত্যাদি। কিন্তু একটা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, একটা সাসটেইনেবল প্রজেক্ট। সেখানে কিছু ব্যাংকিং ফ্যাসিলিটি দিতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশে লম্বা সময়ের জন্য বিনিয়োগ করা ব্যাংকের জন্য কঠিন। ব্যাংক তো স্বল্পমেয়াদে সব আমানত আনে। অনেক সময় দেখা যায়, একটা হোটেল বানাতে দুই-তিন বছর লেগে গেছে। আপনি পুরো টাকাটা নিলেন ব্যাংক থেকেতিন বছর পর প্রজেক্টের ব্যয় দ্বিগুণ না হলেও কাছাকাছি চলে যাচ্ছে। তারপর আপনি ওটা পে-ব্যাক শুরু করলেন। তখন বিনিয়োগকারীর জন্য শুরুতেই একটা বড় ধাক্কা হয়ে যায়।
পর্যটন খাতকে এগিয়ে নিতে বাজেটে আপনাদের প্রত্যাশা কী?
বাজেটে আমার প্রত্যাশা একটাই—একটু আগেই যেটা বললাম, বাংলাদেশ ব্যাংক আছে, গভর্নর বা যারা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আছেন, তারা যদি একটু ভাবেন—সিনেমা হলের জন্য যদি একটা ফান্ড করা যায়,
টেক্সটাইলের জন্য যদি একটা ফান্ড করা যায়, তাহলে ঢাকার বাইরে বা জেলা শহরের বাইরে নতুন জায়গায় ট্যুরিজম শিল্প বিকাশের লক্ষ্যে কেন আলাদা একটি ফান্ড করা যাবে না? এটা স্বল্প সুদে লম্বা সময়ের জন্য হতে হবে, এছাড়া হবে না। বাজেটে যদি এ বিষয়টা নিয়ে আসা হয় আমার মনে হয় পর্যটন ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন।
দেশের পর্যটকদের বড় আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। গত কয়েক দশকে মেগা অবকাঠামো আমাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে আঘাত হেনেছে। পর্যটক আকর্ষণে এতে কোনো নেতিবাচক ভূমিকা পড়বে বলে মনে করেন কি?
বিদেশী পর্যটকরা পরিবেশ নিয়ে খুবই সচেতন, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আবার আপনাকে এটাও বিবেচনায় রাখতে হবে, বাংলাদেশ খুব ছোট একটা দেশ। আমাদের এত মানুষ, অবকাঠামো হবেই। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, পরিবেশ রক্ষা করে অবকাঠামো করা যায় কিনা? সেটার জন্য চেষ্টা করা যেতে পারে। ঘুরেফিরে একই কথা। আমাদের সচেতন হতে হবে।
পর্যটকদের নিরাপত্তায় কী করণীয়, সুনির্দিষ্টভাবে যদি বলতেন।
সর্বপ্রথম সচেতনতা বাড়ানোর জন্য আমরা জোরালো চেষ্টা করতে পারি। একদম স্কুল পর্যায় থেকেই পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি শেখাতে হবে। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ায় একেবারে স্কুল থেকেই বলা হয়, আমরা একটি ট্যুরিস্ট কান্ট্রি। ট্যুরিস্টের সঙ্গে এ আচরণ করতে হবে; এ আচরণ করা যাবে না। আমরাও যদি স্কুল লেভেল থেকে ট্যুরিজম ও হসপিটালিটিকে প্রমোট করতে পারি, তাহলে আমাদের জন্য ভালো হবে।
পর্যটন খাতের বিকাশে ব্র্যান্ডিংয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বলুন।
ব্র্যান্ডিং অবশ্যই লাগবে। শুরুতেই আমি নিরাপত্তার বিষয়ে বলেছি। ট্যুরিস্ট এসে নিরাপত্তা পাবে—এটাও একটা ব্র্যান্ডিংয়ের বিষয়। আপনি যদি ভারতের কোনো কোনো জায়গায় যান সেখানে ট্যুরিস্টদের ব্যাপারে বলাই আছে—‘ইউ ক্যান ওয়াক এনি টাইম।’ ওই জোনটা পুরোপুরি সিকিউরড। এটাও কিন্তু ব্র্যান্ডিংয়ের একটা অংশ। আমাদের দেশে কী কী আছে, ট্যুরিস্টকে আমি কী কী সেবা দেব, কোনো সমস্যায় পড়লে ট্যুরিস্ট আমার থেকে কী সহযোগিতা পাবে—এগুলো সবই ব্র্যান্ডিংয়ের অংশ। মনে রাখতে হবে, পর্যটক আর্কষণের জন্য কেবল অবকাঠামো ডেভেলপমেন্টই শেষ কথা নয়, তারা যখন এয়ারপোর্টে এসে নামবে, সেখানে কাঙ্ক্ষিত সাপোর্টটা পাবে কিনা; এ দেশ থেকে কানেক্টিভিটি ফ্লাইট অন্য দেশে আছে কিনা এবং বিমানের ভাড়াটা কি অন্যান্য দেশের চেয়ে আমাদের দেশে বেশি না কম—যদি এসব বিষয়ে ট্যুরিস্ট সন্তুষ্ট না হয় তাহলে কিন্তু তারা আমাদের দেশে আসবে না।










