কৃষি উৎপাদন খাতে আমরা কতটা স্বয়ংসম্পূর্ণ?

১৮ কোটি ভোক্তার বিশাল বাজার আমাদের কৃষি খাতকে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে গেছে। আমাদের খাদ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত। শস্যভিত্তিক ও প্রাণিজ কৃষিতে আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছি এবং এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। ভুট্টা চাষ, মাছ, মুরগি ও দুগ্ধ খামারের মতো অর্থনীতিভিত্তিক কৃষির দিকে মানুষের আগ্রহ বাড়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সামগ্রিকভাবে আমাদের কৃষি খাত ভালো করছে এবং এগিয়ে যাচ্ছে।

প্রান্তিক কৃষকদের লভ্যাংশ নিশ্চিতে সরকার কী করতে পারে?

কৃষকের লভ্যাংশ বাড়ানোর প্রধান উপায় হলো উদ্ভাবনী উপায়ে উৎপাদন বাড়ানো। এতে যেমন ব্যয় কমবে, তেমনি মুনাফাও বাড়বে। শুধু ধানের ক্ষেত্রেই নয়, মাংসসহ অন্য কৃষিপণ্য উৎপাদনেও একই নীতি প্রযোজ্য। বিশ্বব্যাপী এ পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। অথচ আমাদের দেশে বেশি খরচ করে মাংস উৎপাদনের কারণে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।

প্রান্তিক কৃষকদের লভ্যাংশ বাড়াতে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যয়ও কমাতে হবে। একই সঙ্গে উন্নত প্রযুক্তি ও যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

গত বাজেট কৃষি খাতের বিকাশে কতটা সহায়ক ছিল?

কৃষি বাজেট বলতে সারের ভর্তুকির বিষয়টিই আমাদের মনে আসে। এর বাইরে তেমন কিছু চিন্তা করি না। এ ধরনের গতানুগতিক চিন্তাভাবনার পরিবর্তন দরকার। কৃষি বাজেটকে কেবল সারের ভর্তুকির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বৈচিত্র্য বাড়ানো প্রয়োজন। উন্নত জাতের ফসলসহ গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি আধুনিক পদ্ধতি এবং উন্নত চাষাবাদ কৌশল কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ানোর দিকে মনোযোগী হওয়ার সময় এসেছে।

ফসল তোলার পরের ক্ষতি কমানোর জন্য পোস্ট হারভেস্ট ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে হবে। প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের রাজস্বে কিছু ছাড় দেয়া যেতে পারে।

কৃষিপণ্য উৎপাদন ব্যয় কমানোর জন্য এবারের বাজেটে আপনাদের প্রত্যাশা কী?

উন্নত প্রযুক্তি খামারিদের দিতে হবে, যাদের উৎপাদনশীলতা বেশি। এটার খুবই প্রয়োজন। এটা সঠিক প্রশিক্ষণ ও উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমেই সম্ভব। এদিকে মনোযোগ দেয়া দরকার।

এসিআই মোটরস কৃষির যান্ত্রিকীকরণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। কিন্তু কৃষি যন্ত্রপাতি এখনো আমদানিনির্ভর, এখানে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন কতদূর?

বিষয়টি বেশ দুরূহ। এসিআই মোটরস দেশেই ছোট কৃষি যন্ত্রপাতি এবং ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার তৈরি করছে। ট্রাক্টরের বাজারের আকার ছোট হওয়ায় (বার্ষিক চাহিদা ১০ হাজার) বড় কারখানা স্থাপন কঠিন। যেখানে ভারতের কারখানাগুলোর উৎপাদনক্ষমতা বছরে এক থেকে সোয়া লাখ ইউনিট। বর্তমানে বাংলাদেশের ৯৫ শতাংশ জমি মেশিনের সাহায্যে চাষ হয়, যার মধ্যে ৪০ শতাংশ ট্রাক্টর এবং বাকিটা হ্যান্ড ট্রাক্টরের মাধ্যমে। সমস্যাটি মূলত বাজারের আকারের সীমাবদ্ধতা। শুধু ট্রাক্টর উৎপাদন করে এ খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন কঠিন।

অন্যদিকে সমন্বিত হারভেস্টার বাজার প্রায় ৩০ হাজার ইউনিটের। ভর্তুকির মাধ্যমে বর্তমানে ছয়-সাত হাজার হারভেস্টার বাজারে এসেছে এবং এ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। জাপানি ইয়ানমার (একটি জাপানি কোম্পানি) সঙ্গে আমাদের আলোচনা চলছে। আমরা হারভেস্টারের কিছু অংশ (ধান ধারণকারী অংশ) তৈরির উদ্যোগ নিয়েছি। ধীরে ধীরে এর খোল এবং পরবর্তী সময়ে ইঞ্জিন তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। এছাড়া পাম্পের ক্ষেত্রে ইঞ্জিন বাইরে থেকে এনে স্থানীয়ভাবে সংযোজনের চেষ্টা চলছে।

কৃষি যান্ত্রিকীকরণের কোন পর্যায়ে রয়েছি আমরা?

কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারতের তুলনায় ভালো অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশে ধান চাষের ক্ষেত্রে প্রায় ৯৫ শতাংশ জমি মেশিনের সাহায্যে চাষ করা হয়, যেখানে ভারতে মাত্র ৬০ শতাংশ। সেচ ব্যবস্থার প্রায় ৯০ শতাংশ যান্ত্রিকীকরণ হয়েছে। ধান কাটার ক্ষেত্রে যান্ত্রিকীকরণ তুলনামূলকভাবে নতুন (মাত্র চার-পাঁচ বছর), তাই এর ব্যবহার প্রায় ১৫ শতাংশ। ধান লাগানোর ক্ষেত্রে যান্ত্রিকীকরণ এখনো ১ শতাংশের নিচে। সবজি চাষে তেমন যান্ত্রিকীকরণ না ঘটলেও আলুর ক্ষেত্রে চেষ্টা চলছে। প্রাণিজ কৃষির মধ্যে মাছ উৎপাদনে সামান্য এবং মুরগি উৎপাদনে মোটামুটি যান্ত্রিকীকরণ হয়েছে।

দেশে ভবিষ্যতে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার হবে কী?

অনেক দেশেই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) পরিচিত হয়ে গেছে। আমাদের দেশেও শুরু করেছি। এখন সমন্বিত হারভেস্টরে আমরা জিপিএস লাগিয়ে দেখতে পাচ্ছি, জমি কতটুকু প্রস্তুত হয়েছে বা কোনো কঠিন বস্তু আছে কিনা। থাকলে হারভেস্টর অটোমেটিক বন্ধ হয়ে যাবে। ট্রাক্টরে লাগানো সেন্সর জমিতে উর্বরা শক্তির উপাদান সম্পর্কে জানাচ্ছে। ড্রোনের মাধ্যমে মাটির জৈব ও অজৈব উপাদানের পরিমাণ দেখতে পাচ্ছি। আশা করি দুই-তিন বছরের মধ্যে বড় আকারে এআইয়ের ব্যবহার দেখতে পাব।

কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, এটা কমিয়ে আনতে যান্ত্রিকীকরণ কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে?

ধানের ক্ষেত্রে যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে প্রতি কেজিতে ৬-৭ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত লাভ করা সম্ভব। অন্য ফসলের ক্ষেত্রেও একই সম্ভাবনা রয়েছে। মাটির ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে জমিতে কোন উপাদান আছে বা অভাব রয়েছে, তা সঠিকভাবে জানা গেলে সারের ব্যবহার ও খরচ কমবে। মোটকথা যদি কৃষকের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য থাকে এবং সে অনুযায়ী যন্ত্র ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে, তাহলে উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব।