প্রিমিয়ার সিমেন্ট দীর্ঘ পথ পেরিয়ে দেশের অন্যতম শীর্ষ সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। এই সাফল্যের পেছনের গল্পটা শুনতে চাই।
আমাদের সাফল্যের মূল মন্ত্র তিনটি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। গুণগত মান, প্রযুক্তির প্রতি আস্থা এবং একটি টেকসই ভবিষ্যতের অঙ্গীকার। আমরা কখনই আমাদের পণ্যের মানের সঙ্গে আপস করিনি। শুরু থেকেই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দেয়া হয়েছে, যা উৎপাদন প্রক্রিয়াকে আরো কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব করেছে। প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলসের কর্মীদের আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং গ্রাহকদের আস্থা আমাদের এ দীর্ঘ পথ চলায় সাহস জুগিয়েছে।
উৎপাদন ব্যবস্থায় ভার্টিক্যাল রোলার মিল (ভিআরএম) প্রযুক্তি স্থাপন করেছেন, এর বিশেষত্ব কী?
প্রযুক্তি আমাদের কাছে শুধু উৎপাদন বৃদ্ধির হাতিয়ার নয়, এটি গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং পরিবেশের ওপর প্রভাব কমানোর অন্যতম উদ্দেশ্য। ভার্টিক্যাল রোলার মিল (ভিআরএম) প্রযুক্তি আমাদের তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। ডেনমার্কের এফএল স্মিথের এ প্রযুক্তি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী, এর কার্বন নিঃসরণ কম এবং এটি পরিবেশবান্ধব। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে সিমেন্টের কাঁচামাল এমনভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হয়, যা প্রয়োজনীয় উপাদান দূর করে সিমেন্টের শক্তি এবং গুণাগুণ বৃদ্ধি করে। আমাদের ঢাকা ও চট্টগ্রামের কারখানাগুলোয় এ প্রযুক্তি স্থাপনের ফলে উৎপাদন সক্ষমতা যেমন বেড়েছে তেমনি আমরা উন্নত মানের সিমেন্ট সরবরাহ করতে পারছি। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো বৃহৎ প্রকল্পে সুনির্দিষ্ট কম্পোজিশনের সিমেন্ট সরবরাহের ক্ষেত্রেও এ প্রযুক্তি আমাদের সাহায্য করছে।
গুণগত মান বজায় রাখার কৌশল জানতে চাই। সঙ্গে কাঁচামাল সংগ্রহে মান নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়াটাও।
গুণগত মান অগ্রাধিকারের শীর্ষে। ক্লিংকারসহ সিমেন্টের পাঁচটি প্রধান কাঁচামালের সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করা হয়। আমাদের নিজস্ব মান নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যেখানে থেকে আমরা কাঁচামাল সংগ্রহ করি, সেখানে উপস্থিত থেকে প্রতিটি স্তরে কঠোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। মান নিশ্চিত হলেই সেই কাঁচামাল জাহাজে তোলা হয়। এভাবে উৎপাদন প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপেই কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিদ্যমান।
আসন্ন ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে আপনার প্রত্যাশা ও কেমন নীতি সহায়তা প্রত্যাশা করছেন?
আসন্ন বাজেট আমাদের শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের কাছে একটি স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি পলিসি কাঠামো প্রত্যাশা করি। কাঁচামালের স্থিতিশীল সরবরাহ এবং যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে আরো বেশি বরাদ্দ এবং স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষার জন্য একটি সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করার জন্য প্রণোদনা থাকা উচিত।
সিমেন্ট শিল্পের বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা এবং নতুন বিনিয়োগের বিষয়ে আপনার মতামত কী?
আমাদের দেশে সিমেন্ট শিল্পের একটি উল্লেখযোগ্য উৎপাদন সক্ষমতা এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে। তবে এর পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য লজিস্টিক সাপোর্ট যেমন গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহটাও জরুরি। নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মার্কেট অ্যাসেসমেন্ট এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অপরিহার্য। তাই বিনিয়োগের আগে যথাযথ গবেষণা করা প্রয়োজন। সিমেন্ট খাতকে ইকো ফ্রেন্ডলি শিল্প হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলাদেশের সিমেন্ট খাত বৈশ্বিক প্রযুক্তির সঙ্গে কতটা তাল মিলিয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
বাংলাদেশের সিমেন্ট খাত কাঁচামাল এবং প্রযুক্তির দিক থেকে বিশ্বমানের বললে এতে কোনো ভুল হবে না। আমরা এখন ভিয়েতনাম ও চীনের মতো দেশগুলোর সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা রাখি। তাই বলছিলাম আমাদের এখন প্রয়োজন একটি সহায়ক নীতি-কাঠামো এবং সরকারের সহযোগিতা, যা এ শিল্পের সম্ভাবনাকে আরো বিকশিত করতে সাহায্য করবে।
প্রিমিয়ার সিমেন্টের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? আপনারা এখন কোনো নতুন উদ্ভাবন বা সম্প্রসারণের কথা ভাবছেন?
আমাদের লক্ষ্য হলো এমন একটি ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা যেখানে প্রিমিয়ার সিমেন্ট শুধু একটি সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবেই নয়, পরিবেশ সুরক্ষার প্রতি দায়বদ্ধ একটি ব্র্যান্ড হিসেবেও পরিচিতি লাভ করবে। এজন্য গবেষণা ও উন্নয়নের ওপর জোর দিচ্ছি যাতে আরো উন্নত এবং টেকসই নির্মাণ সামগ্রী সরবরাহ করতে পারি। প্রিমিয়ার সিমেন্ট আগামীতেও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে উন্নত মানের পরিবেশবান্ধব সিমেন্ট গ্রাহকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার অঙ্গীকার ধরে রাখবে। এ প্রতিষ্ঠান শুধু মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যেই পরিচালিত না হয়ে বরং গুণগত মান, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতার এক সমন্বিত রূপ হিসেবেই যাত্রা অব্যাহত রাখুক।










