আবাসন খাতে ব্যবসার পরিস্থিতি এখন কেমন?

আবাসন ব্যবসায় আমাদের কয়েক ধরনের প্রডাক্ট মার্কেটে আছে। একটা হচ্ছে কমার্শিয়াল প্রপার্টি—অফিস, দোকান, মাকের্ট। আরেকটা হচ্ছে মধ্যবিত্তের আবাসন প্রপার্টি, যেগুলো এক-দেড় কোটি টাকার মধ্যে হয়ে থাকে। এর বাইরে আছে, লাক্সারি মার্কেট—গুলশান, বনানী, বারিধারার মার্কেট। একেকটা মার্কেটের ব্যবসার পরিস্থিতি একেক রকম। তার মধ্যে বেশি দাম অর্থাৎ এক্সক্লুসিভ অ্যাপার্টমেন্ট, বড় অ্যপার্টমেন্ট—এ মার্কেটটা এখন একটু ধীর হয়ে পড়েছে। যেটা বড় মার্কেট, সাধারণ মানুষের জন্য যে প্রডাক্টগুলো আমরা করি, বিশেষ করে যারা ভাড়া বাসায় থাকেন, নিজের একটা বাসা দরকার, নিরাপত্তা ও পারিবারিক সুরক্ষা যাদের প্রধান বিবেচনা, এ মার্কেটে আসলে খুব একটা ইমপ্যাক্ট নেই। কমার্শিয়াল মার্কেটে যারা ইনভেস্ট করবেন, যারা নিজেদের জন্য অফিস কিনবেন, তারা হয়তো মার্কেটটা অবজার্ভ করবেন, ব্যবসায়িক কন্ডিশন বুঝে ওঠা পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। কিন্তু যারা ইনভেস্টর, এ ক্যাটাগরিতে আবার সবসময় কেউ কেউ চিন্তা করেন—আমি কম দামে একটা ভালো প্রাপার্টি পেয়ে গেলেই সেটা কিনছি। তো মার্কেটের পরিস্থিতি এক কথায় বলা যাচ্ছে না, বেশকিছু প্লাস-মাইনাস আছে। কিছু মার্কেট ভালো, কিছু মন্দা।

রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বর্তমানে যারা আবাসন খাতের ছোট বা মাঝারি পর্যায়ের ব্যবসায়ী, তাদের জন্য টিকে থাকা খুব চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন কি?

আসলে ছোট বা বড় বলে কোনো কথা নেই। প্রডাক্ট লাইন হলো বিষয়—কে কোন ধরনের প্রডাক্ট নিয়ে কাজ করে। আমার দৃষ্টিকোণ থেকে ঢাকার বেশ কয়েকটা অঞ্চল আছে—উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম। আমরা যদি আগে দক্ষিণটা চিন্তা করি, যেটা পুরান ঢাকা, আপনি দেখবেন ওখানে কোনো অ্যাপার্টমেন্ট সে রকম অ্যাভাইলেবল নেই। অ্যাপার্টমেন্ট যারা তৈরি করছে, বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। ওখানে জায়গাও কম, আবার ঘনবসতিও আছে। ফলে ভালো কোনো অ্যাপার্টমেন্ট বানালে সেটা থাকছে না, বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। ওখানের মানুষ আসলে প্রয়োজনটাকে বড় করে দেখে। চিন্তা করে আমি অ্যাফোর্ড করতে পারি কিনা। আবার ঢাকার পশ্চিম দিকটা যদি দেখেন, অর্থাৎ রায়ের বাজার, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর—আমি বলব, এসব এলাকায় বিক্রি ভালো। কিন্তু যেখানে অনেক লার্জ মাকের্ট—উত্তরা, বসুন্ধরা, এখানে হয়তো প্রপার্টি সেলিং কিছুটা স্লো। প্রশ্ন হলো ছোট ব্যবসায়ীরা কীভাবে টিকে আছেন বা থাকবেন? বড়-ছোট কোনো বিষয় না। যারা মানুষের চাহিদা অনুযায়ী প্রডাক্ট তৈরি করেন তারা কেউই আসলে ঝামেলার মধ্যে নেই। সবারই মোটামুটি ভালো চলছে।

ড্যাপ নিয়ে কথা উঠছে। ড্যাপের কারণে আবাসন ব্যবসায় মন্দা নেমে এসেছে। মানুষ বাড়ি বানাচ্ছে না। আপনি কী বলবেন?

ড্যাপ হলো ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান। ঢাকা শহর কীভাবে তৈরি হওয়া উচিত, কোথায় কমার্শিয়াল প্রপার্টি হওয়া উচিত, কোথায় রেসিডেন্সিয়াল প্রপার্টি হওয়া উচিত, কোথায় কৃষিজমি থাকা উচিত, কোথায় জলাধার থাকা উচিত—এগুলো হলো ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানিং। ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানের সঙ্গে অ্যাপার্টমেন্ট ব্যবসার মন্দার সম্পর্ক আছে বলে আমি মনে করি না। এটা হলো পার্সপেক্টিভের ব্যাপার। আমার বাসা যদি পুরান ঢাকায় হয় তাহলে ক্রেতা হিসেবে আমি দেখব, আমার পরিবারের থাকার জন্য তিনটা বেডরুম প্রয়োজন, একটা ড্রয়িং-ডাইনিং লাগবে। এ ক্যাটাগরির দেড়-দুই হাজার বর্গফুটের একটা অ্যাপার্টমেন্ট যদি লক্ষ্মীবাজার, নারিন্দা বা সূত্রাপুরে আমি পেয়ে যাই, তাহলে এটা আমি কিনে ফেলব। ড্যাপের সঙ্গে এটার কোনো কানেকশন নেই। ক্রেতা হিসেবে আমি ড্যাপ নিয়ে ভাবব না। এখন আসি বিল্ডারের দৃষ্টিকোণ থেকে। বিল্ডার যখন একটা বিল্ডিং তৈরি করে, তখন তার ড্যাপের সঙ্গে প্রয়োজন ইমরাত নির্মাণ বিধিমালা। অর্থাৎ ফ্লোর এরিয়া রেশিও হিসাব করে আমি কোন এলাকায় কত বর্গফুট বাসা বানাতে পারব। আগে হয়তো ছোট রাস্তার পাশেও পারমিশন পাওয়া যেত। কিন্তু রাজউক বলে দিচ্ছে, একটা রাস্তা এক হাজার মানুষের লোড নিতে পারে। ওই রাস্তায় পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন ইত্যাদির ধারণক্ষমতা এর বেশি না। ফলে এ মাপের বেশি ভবন এখানে নির্মাণ করা যাবে না। উদাহরণস্বরূপ বলতে পারি, আগে হয়তো আমি ১০ তলা বিল্ডিং করতাম, এখন আমাকে আটতলা বিল্ডিং করতে বলা হচ্ছে। সেখানে বিল্ডার হিসেবে হয়তো আমার কিছু বর্গফুট কমে যাবে। কেউই নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে ব্যবসা করে না। খরচ বাড়ে-কমে। যা-ই হোক, আমি কিন্তু সেভাবে অ্যাপার্টমেন্টের মূল্য অ্যাডজাস্ট করে নেব।

এবারের বাজেট নিয়ে আপনাদের প্রত্যাশা জানতে চাই।

এ শহরের বেশির ভাগ মানুষ ভাড়া বাসায় থাকে। কিন্তু প্রত্যেকটা মানুষেরই নিজস্ব বাসস্থানে থাকার অধিকার আছে। একবারে সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করে আবাসন কেনার সামর্থ্য অনেকেরই নেই। তার কাছে কিছু সঞ্চয় থাকে। বাকিটা হয়তো ব্যাংক থেকে লোন নেয়। তাহলে যারা আবাসন খাতে বিনিয়োগ করবে তাদের যদি সহায়ক লোন দেয়া হয়, যে লোনের ইন্টারেস্টও কম হবে আবার সময়ও বেশি হবে, পাশাপাশি লোনের স্যাংশনটা সহজ হবে, তাহলে সাধারণ মানুষ প্রার্টি কিনতে পারবে। আমি মনে করি, বাজেটে এ সুবিধা দেয়া যেতে পারে। অথবা সরকার যেহেতু বেশির ভাগ জায়গার মালিক, এখন সরকার যদি বাজেটে কোনো বড় একটা জায়গা বরাদ্দ দিয়ে দেয় যে আবাসন খাতে মানুষের বাসস্থান নিশ্চিতের জন্য রাজউক বা অন্যান্য অথরিটিকে জায়গা বরাদ্দ করে দিলাম, তারা একটা মিনিমাম কস্টে, সরকার কিছু এডিশনাল রুম দিয়ে, লো কস্ট হাউজিং বা অ্যাফোর্ডেবল হাউজিং প্রমোট করতে পারে, তাহলে বড় অংশের মানুষ তার বাসস্থান নিশ্চিত করতে পারবে। পাশাপাশি আমরা যেসব কনস্ট্রাকশন ম্যাটেরিয়ালস ব্যবহার করি তার মধ্যে বেশকিছু আমাদের দেশে উৎপাদন হয়। এগুলোর ওপর যদি সরকার কিছুটা কর কমায়, তাহলে হয়তো বিল্ডারের পক্ষে একটু লো রেটে প্রপার্টি বানানো ও বিক্রি করা সহজ হবে। আমরা যেসব ম্যাটেরিয়াল দেশে তৈরি করতে পারি না, বাইরে থেকে আনতে হয়, এগুলোর ওপরও যদি সরকার কম কর আরোপ করে বা আগের যা আছে তার থেকে কিছুটা রেয়াত দেয়, তাহলে হয়তো কনস্ট্রাকশন ম্যাটেরিয়ালসের দাম কমবে। কিছু কিছু এলাকা আছে যেগুলো এখনো ডেভেলপড না, যেমন পূর্বাচল, গাজীপুর, মাওয়া এলাকাগুলো ডেভেলপ করার জন্য সরকার যদি একটা স্কুল, একটা মসজিদ, একটা হাসপাতাল প্ল্যান করে, যেটাকে কেন্দ্র করে চারদিকে বসতি গড়ে উঠতে পারে, বাজেটে যদি এ রকম একটা রুম রাখা যায় তাহলে আমাদের জন্য ভালো হবে। আমার মনে হয়, এ ধরনের কিছু বাজেটে রাখা হলে আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের জন্য সহায়ক হবে।

বাজেট এলেই আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনা প্রশ্নে বিনিয়োগের বিষয়টি আলোচনায় আসে। এ বিষয়ে আপনি কী বলবেন?

বিভিন্ন কারণেই সবাই আসলে সামগ্রিক উপার্জন প্রদর্শন করে না। আমি মনে করি, বাজেটে আমাদের যে সুযোগটা রেখেছে, আবাসন খাতে বিনিয়োগের অর্থ একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ কর দিয়ে দিয়ে তার সোর্স নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকবে না, আমার মনে হয় এ সুযোগটা কন্টিনিউ করা উচিত এবং এটা আরো সহজ করা যায় কীভাবে সেটাও সরকার ভেবে দেখবে। এতে মানুষ আরো বেশি প্রপার্টিতে ইনভেস্ট করবে। বিষয়টা অব্যাহত রাখা উচিত। এর সঙ্গে কেউ কেউ দুর্নীতির সম্পর্ক খুঁজতে চেষ্টা করেন। দুর্নীতি বিষয়টা অন্য জিনিস। দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য সরকারের পুলিশ আছে, দুদক আছে। তারা এটা দেখবে। কিন্তু অ্যাপার্টমেন্টে বিনা প্রশ্নে বিনিয়োগের সুযোগ পাওয়ার জন্য কেউ দুর্নীতি করে, ব্যাপারটা কিন্তু এমন না।