গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে কী ধরনের পরিবর্তন দেখছেন?

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গণজাগরণ নিঃসন্দেহে দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে গভীর আলোড়নের সৃষ্টি করেছে। আর এর রেশ পড়েছে দেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয়ও। এ পরিবর্তনের ধারায় আমরা যাতে প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক সব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, সুশাসন, নৈতিকতা, জবাবদিহিতা, দায়িত্ববোধ নিশ্চিত করতে পারি সে চেষ্টা করছি। ব্যাংক খাতের প্রেক্ষাপটে এ পরিবর্তন বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এ খাত কেবল অর্থনৈতিক নয়—মানসিক আস্থারও কেন্দ্রবিন্দু। ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও করপোরেট জবাবদিহিতার অভাব কিছুসংখ্যক ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের মাঝে এক ধরনের সংশয়ের দেখা দিয়েছে। এ খাতের ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, খাতের অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ শিল্পোদ্যোক্তা, কৃষক, রেমিট্যান্স যোদ্ধা, আমানত প্রদানকারী সবাইকে নিয়ে আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ইসলামিকসহ সব ব্যাংককে কঠোরভাবে তাদের বোর্ড ও ব্যবস্থাপনার কার্যকর জবাবদিহিতা, সক্ষমতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধির জন্য ডিজিটালাইজেশন, প্রসেস রি-ইঞ্জিনিয়ারিং, ইনডিপেন্ডেন্ট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট, অ্যাকাউন্টেবিলিটি, শরিয়াহ্ পরিপালন, ট্রান্সপারেন্সি সবকিছুকেই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে, এগুলোকে অর্গানাইজেশনাল কালচারের পার্ট হিসেবে গ্রহণ করে নিতে হবে।

এ খাতের অতীত ভুল-ভ্রান্তি থেকে শিক্ষা নিয়ে পরিবর্তনের এ ধারায় ব্যাংকগুলোকে"রিফর্মেশনের ভেতর দিয়ে নিয়ে গিয়ে গ্রাহকদের সর্বোচ্চ মানের সেবাপ্রদানের মাধ্যমে তাদের আস্থার ভিত্তিকে আরো মজবুত করতে হবে। জনগণ চায় একটি সুশাসিত, স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর, নৈতিক ও দায়িত্বশীল ব্যাংকিং ব্যবস্থা—যা তাদের কষ্টার্জিত অর্থ শুধু নিরাপদই রাখবে না, সঙ্গে সঙ্গে তাদের উন্নয়নের অংশীদার হয়ে সবার জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে পাশে থেকে কাজ করে যাবে। আমরা বিশ্বাস করি, ইসলামিক ব্যাংকগুলোর জন্য নৈতিক ব্যাংকিং কেবল ধর্মীয় অনুশাসন নয়, বরং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের আধুনিক প্রকাশ। এসব নীতিমালা, গ্রাহকদের আরো ব্যাংকমুখী করবে এবং দেশের ব্যাংক খাত আরো শক্তিশালী হয়ে ইতিবাচক ধারায় আসবে। তাই জনগণের প্রতিফলনে ব্যাংকগুলোকেও হতে হবে আরো মানবিক, স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল। আমরাই সেই পরিবর্তনের চালক হতে চাই।

বিগত দেড় দশকে দেশের ব্যাংক খাতে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে সরকারের বলে শ্বেতপত্রে তুলে ধরা হয়। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?

শ্বেতপত্রে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের অব্যবস্থাপনার যে চিত্র উঠে এসেছে, তা মূলত পরিকল্পিত। ফলে দেশে বিনিয়োগ সংকট, ব্যাংকের প্রতি জনগণের নেতিবাচক ধারণা, ছোট ও বড় বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীদের মাঝে উদ্বেগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে; বেড়েছে বৈষম্য ও মূল্যস্ফীতি, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভিত্তিকে নতুন করে ভাবার জায়গায় নিয়ে গেছে। এ শ্বেতপত্র ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন কেবল অনিয়ম ও দুর্নীতি উদঘাটন নয় বরং এটি আমাদের সবার জন্য একটি আত্মসমালোচনার সুযোগ। এখন সময় এসেছে সদিচ্ছার মাধ্যমে এ খাতকে পুনর্গঠন করার, যেন জনগণের অর্থ নিরাপদ থাকে এবং অর্থনীতি একটি টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে। এ সমস্যা সমাধানে কেবল আইন নয়, মানসিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি ও নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।

অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে। সরকারের কাছে কেমন বাজেট চান?

আমরা এমন একটি বাজেট প্রত্যাশা করি—যা হবে অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি এবং ভবিষ্যতের টেকসই প্রবৃদ্ধির রূপরেখা। বাংলাদেশের বড় একটি অংশ এখনো কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। একটি টেকসই ও উৎপাদনমুখী কৃষি ব্যবস্থার জন্য প্রণোদনা বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য সহজ ঋণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে সহায়তা। সামাজিক ব্যবসা, দারিদ্র্য হ্রাস, তরুণদের কর্মসংস্থান ও শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করে এসব খাতে সঠিক বিনিয়োগের মাধ্যমে স্টার্টআপ সহায়তা, প্রযুক্তিতে দক্ষতা উন্নয়ন ও ফ্রিল্যান্সারদের কর-সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব। তৈরি পোশাক ও রেমিট্যান্স—দেশের বৈদেশিক আয়ের প্রধান দুই খাতগুলোকে টেকসই করতে বাজেটে সুনির্দিষ্ট প্রণোদনা, আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও দিকনির্দেশনা জরুরি। তথ্যপ্রযুক্তি, টেলিযোগাযোগ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশ সুরক্ষায় বাস্তবমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করে দেশকে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে হবে। বিশেষভাবে আমি বলতে চাই, একটি বাস্তবধর্মী বাজেট দেশের অর্থনীতি, সামাজিক কাঠামো ও ব্যাংক খাতকে সমন্বিতভাবে রূপান্তরের পথে এগিয়ে নিতে পারে এবং জনগণের আস্থা সুদৃঢ় করতে সহায়ক হবে।

ব্যাংক খাতের জন্য আপনি এবারের বাজেটে কী কী প্রত্যাশা করছেন?

এরই মধ্যে ব্যাংক খাত নিয়ে বিভিন্ন কথা বলেছি। এজন্য উল্লেখ করা বিষয়গুলো নতুন করে বলতে চাই না। তবে ব্যাংক খাতের কাঠামোগত পরিবর্তন, স্বাধীনতা, জবাবদিহিতা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও নৈতিক ব্যাংকিং সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা, এ বাজেটের একটি অন্যতম দিক হবে বলে আমি মনে করি। এছাড়া কিছু নীতিমালা ও পদক্ষেপ প্রয়োজন যার মাধ্যমে ব্যাংক খাত একটি টেকসই ব্যবসায়িক ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে।

বাজেটে একটি ব্যাংকিং রূপরেখা প্রয়োজন, যা খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল ও ইসলামী ব্যাংকিং উন্নয়ন এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে অগ্রাধিকার দেবে। কৃষি, শিল্প, মৎস্য, রফতানি ও রেমিট্যান্সনির্ভর খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, প্রণোদনা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। সিএমএসএমই ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে জামানতবিহীন ঋণ, কর সুবিধা এবং দক্ষতা উন্নয়নমুখী স্কিম থাকা জরুরি। যুব উন্নয়ন ও স্টার্টআপ প্রবৃদ্ধির জন্য আলাদা ব্যাংকিং প্যাকেজ, স্কুল ব্যাংকিংয়ের সম্প্রসারণ এবং করপোরেট ও শিল্প খাতে অর্থায়নের ভারসাম্য বজায় রাখা উচিত। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং টেকসই কৃষি ও জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তিতে অর্থায়নকে উৎসাহিত করতে হবে। একই সঙ্গে স্বচ্ছতা, সুশাসন ও জবাবদিহিতার কাঠামো আরো শক্তিশালী করতে হবে।

সরকার ঘোষিত বাজেট বাস্তবায়নে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক কী ভূমিকা পালন করবে?

আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক বাজেট বাস্তবায়নে শরিয়াহসম্মত ও দায়িত্বশীল আর্থিক সেবা প্রদানের মাধ্যমে সরকারকে সহযোগিতা করবে। বাজেট বাস্তবায়নে আমাদের ভূমিকা কেবল আর্থিক সেবা প্রদানে সীমাবদ্ধ নয়, বরং নৈতিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শরিয়াহসম্মত ব্যাংকিংয়ের পরিচালনা করাই আমাদের মূল অঙ্গীকার। বাজেটে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, এসএমই ও নারী উদ্যোক্তা সহায়তা, হালাল শিল্প, কৃষি, রেমিট্যান্স, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, জলবায়ু সহনশীল অর্থনীতি ও ডিজিটাল ফিনান্সকে অগ্রাধিকার দেয়া হলে এসব খাতে শরিয়াহভিত্তিক রিফাইন্যান্সিং, কোয়াড-ই-হাসানাহ, মুদারাবা, মুশারাকা ও ইজারাভিত্তিক অর্থায়ন আরো সম্প্রসারিত করব। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগণের জন্য শাখা ও এজেন্ট ব্যাংকিং সম্প্রসারণ, প্রবাসীদের জন্য শরিয়াহসম্মত সঞ্চয় ও বিনিয়োগ স্কিম, ইয়ুথ এন্টারপ্রেনার ফান্ড চালু, ইসলামিক ফিনান্স টুল সংযুক্ত ডিজিটাল ব্যাংকিং অ্যাপ চালু, ওয়াকফভিত্তিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন, সিএসআরের কার্যকর ব্যবহার, এবং কর সচেতনতা বৃদ্ধিতে আমাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকবে।

আমরা বিশ্বাস করি, একটি সফল বাজেট মানে হলো সুশাসন, আস্থা ও অন্তর্ভুক্তির সমন্বয়, যা কেবল সরকারের একক প্রচেষ্টায় নয়—আর্থিক খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণে বাস্তবায়ন সম্ভব। আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক বাজেট বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে প্রস্তুত। আমরা এক নিরাপদ, স্বচ্ছ, মানবিক ও শরিয়াহভিত্তিক অর্থনীতির সহযাত্রী হতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।