সিমেন্টের ব্যবসায় কীভাবে যুক্ত হলেন?

এটি আমাদের পারিবারিক ব্যবসা, ওইভাবেই যুক্ত হওয়া। আমার বাবা মরহুম মোহাম্মাদ খবীরউদ্দিন মোল্লা আমদানি করে সিমেন্টের ব্যবসা করতেন। উনি খুব ছোট থেকে বড় হওয়া একজন মানুষ। ওনার ধারণা ছিল, গুণগত মান ছাড়া কোনো ব্যবসাকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা যায় না। আর ব্র্যান্ডের কথা যদি বলি, সেটিও একই। আমরা গুণগত মান নিশ্চিতের বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ব্যক্তিগত জীবনে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন নিয়ে পড়াশোনা করেছি। সিমেন্টের সঙ্গে রসায়নের একটা সম্পর্ক আছে। আমাদের এখানে সিমেন্টের অনেক রকম চাহিদা আছে। ২৭ রকমের সিমেন্টের লাইসেন্স বিএসটিআই দিতে পারে। আমাদের এ মুহূর্তে চার রকমের লাইসেন্স আছে। যার যেমন প্রয়োজন তেমন সিমেন্ট আমরা দিই।

আপনারা দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে কতটা সম্পৃক্ত?

দেশের বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণে আমরা সিমেন্ট সরবরাহ করেছি, এখনো করছি। যেমন পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেলসহ অনেক মেগা প্রজেক্টে ক্রাউন সিমেন্ট ব্যবহার হয়েছে। দেশের অবকাঠামোর ক্ষেত্রে এটা আমাদের মাইলফলক। এছাড়া বেসরকারি খাতের অনেক বড় বড় অবকাঠামোয় আমরা সিমেন্ট সরবরাহ করেছি। এগুলোয় কী ধরনের সিমেন্ট প্রয়োজন সেসব অভিজ্ঞতা আমাদের আছে। কংক্রিটের মূল উপাদান সিমেন্ট। আমাদের কংক্রিটেরও ব্যবসা রয়েছে। আগে কিন্তু ছয়তলার ওপরে বাড়ি হতো না, এখন গুলশানেই ১৪-১৫ তলা ভবন রয়েছে। ৪০ তলা পর্যন্ত বাণিজ্যিক ভবনের অনুমোদনও হচ্ছে। আমরা মনে করি, বাংলাদেশে যে ১০০ তলা ভবন হবে, সেটিও সম্ভব। জনসংখ্যার হিসাবে যে এখানে বহুতল ভবন প্রয়োজন সেটি এখন স্পষ্ট হচ্ছে।

দেশের সিমেন্ট খাতে চাহিদার চেয়ে উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ। এটি সমস্যা না সম্ভাবনা?

বাসস্থান মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে একটি। দেশে এখনো বহু গৃহহীন মানুষ আছে। তাদের জন্য আমাদের মানসম্মত বাসস্থান তৈরি করতে হবে। অন্যদিকে জনসংখ্যার তুলনায় আমাদের জমি অনেক কম। ফলে বহুতল ভবন নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বহুতল ভবন না করলেও মানসম্মত একটি থাকার ঘর তৈরি করতে গেলেও কিন্তু সিমেন্টের প্রয়োজন পড়ে। তাই আমি মনে করি, আগামীতে সিমেন্টের বাজার অনেক সম্প্রসারণ হবে। কারণ চাহিদা সামনে বাড়তেই থাকবে।

বর্তমানে সিমেন্টের ভ্যন্তরীণ বাজার কেমন?

আমার ধারণা, একসময় ৭০টির মতো কোম্পানি ছিল, এখন হয়তো ৩০টার কিছু বেশিসংখ্যক কোম্পানি থাকতে পারে। আর বাজার সাইজটা ৪০ মিলিয়ন টনের মতো। সিমেন্টের ব্যবহার বছরে মাথাপিছু ২১০ কেজি। এটা আমাদের পাশের দেশ ভারতে মাথাপিছু ৪০০ কেজি। আমাদের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মাথাপিছু ৬০০ কেজি। চীনে মাথাপিছু প্রায় ১ হাজার ৭০০ কেজি। সেই হিসেবে আমাদের ৮০০ কেজি হওয়ার একটা সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা যখন শুরু করেছিলাম তখন কিন্তু মাথাপিছু ছিল মাত্র ৪০ কেজি। সেখানে থেকে বাড়তে বাড়তে আজ এখানে। দেশের অর্থনীতির অবস্থা যদি ভালো হয়ে যায়, তাহলে খুব দ্রুতই চাহিদা দ্বিগুণ হয়ে যাবে। তবে উৎপাদন সক্ষমতা কিন্তু ৯০ মিলিয়ন টনের মতো, যা বর্তমান চাহিদার দ্বিগুণেরও বেশি। একটা সময় মানুষ শুধু দামটাকে গুরুত্ব দিত। বর্তমান সময়ে যারা সিমেন্ট ব্যবহার করেন তারা কিন্তু একটু সচেতন। ফলে তারা মূল্যের পাশাপাশি গুণগত মানের দিকটাও নিশ্চিত হতে চান।

বাংলাদেশে নির্মাণ খাতের শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও দক্ষতা উন্নয়ন নিয়ে সিমেন্ট কোম্পানি হিসেবে আপনারাই প্রথম কাজ শুরু করেন। এটি করতে গিয়ে আপনাদের অভিজ্ঞতা কেমন?

বর্তমানে প্রকৌশলীরা অবকাঠামোর ডিজাইন করার সময় শ্রমিকের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রাখেন। কারণ এটি বাস্তবায়ন কীভাবে করবে, একজন শ্রমিকের কাজের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কতটুকু সবই বিবেচ্য বিষয়। বাংলাদেশে দক্ষতা ও নিরাপত্তার কারণে অনেক ক্ষেত্রে ডিজাইনে কম্প্রোমাইজ করা হয়। সিমেন্ট তো এক ধরনের কেমিক্যাল। এটি নিয়ে কাজ করার সময় শ্রমিকদের শরীরে অ্যাসিডিক রিঅ্যাকশন হয়। কিন্তু আধুনিক নির্মাণের ক্ষেত্রে দেখা যায় শ্রমিকদের জন্য যথেষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়। স্পেশাল জুতা থাকে, গ্লাভস থাকে। তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সচেতন করা যায়। আমরা চিন্তা করে দেখলাম, যতক্ষণ পর্যন্ত ভোক্তা, শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন করা যাচ্ছে না, ততক্ষণ কিন্তু জনবান্ধব বা জনকল্যাণমূলক ব্যবসা করা যায় না। তখন আমরা এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন করার উদ্যোগ নিলাম, শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলাম। তার পরও ঝুঁকি তো থাকেই। অনেকেই মৃত্যুবরণ করেন, অনেকের অঙ্গহানি হয়, চোখ নষ্ট হয়ে যায়।

নির্মাণকর্মীদের জন্য আমরা গত বছর থেকে ‘নির্মাণে নিরাপত্তা’ নামে একটা ক্যাম্পেইন শুরু করেছি। এ উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে হেলমেট, গ্লাভস, নিরাপত্তা জুতা, নিরাপত্তা বেল্ট ও গগলসের মতো ব্যক্তিগত সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম (পিপিই) বিনামূল্যে বিতরণ, পাশাপাশি দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা। এছাড়া এ কর্মসূচির আওতায় দুর্ঘটনায় আহত বা প্রাণহানির ক্ষেত্রে ১০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা দেয়া হচ্ছে। আমাদের প্রতি ব্যাগ সিমেন্ট থেকে ২ টাকা করে কল্যাণ তহবিলে জমা রাখা হচ্ছে। তবে এ সুবিধাগুলো পেতে ক্রাউন সিমেন্টের সঙ্গে আগে থেকেই নিবন্ধিত হতে হয়। এরই মধ্যে ৮০ হাজার নির্মাণ শ্রমিক আমাদের তালিকাভুক্ত হয়েছেন। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই এটি আমরা শুরু করেছি। আমাদের পরে এখন অনেকেই শুরু করেছেন, যেটি দেশের জন্য খুবই ভালো।

বাংলাদেশে চাহিদার দ্বিগুণের বেশি সিমেন্ট উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে, যেটি রফতানির সম্ভাবনাও তৈরি করেছে। আমাদের দেশের পরিস্থিতিতে সিমেন্ট রফতানি কতটুকু সম্ভব?

আসলে ভারতের নর্থইস্ট পার্ট কিন্তু ল্যান্ড লকড এলাকা পুরোটাই। এলাকাটি তাদের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার দূরে। ফলে সেখানে আমাদের এখান থেকে রফতানির একটা সুযোগ আছে। তাদের মূল ভূখণ্ড থেকে সিমেন্ট আনতে গেলে যেখানে এক মাস সময় লাগে শুধু পরিবহনে সেখানে বাংলাদেশ থেকে একদিনেই পাঠানো যাচ্ছে। সিমেন্ট খাত সরকারের কাছ থেকে রফতানির জন্য কোনো ভর্তুকি পায় না। অতীতে যে শুল্ক নেয়া হতো সেটি ভ্যাটের সঙ্গে সমন্বয় করা যেত। কিন্তু চার বছর ধরে তা হচ্ছে না। চার বছর আগে একটি আইন করা হয়। সেখানে বলা হয়, আমাদের রফতানি ডিউটি ফেরত দেবে, যা আমরা এখন পর্যন্ত পাইনি। এটি যদি আগের নিয়মে পাই, তাহলে রফতানিতে আমরা এগিয়ে যেতে পারব।

আমাদের এখানে কোনো কাঁচামাল পাওয়া যায় না। শতভাগ কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। এখন আমদানির সময় অগ্রিম কর নেয়া হয়। যে হিসাব করে অগ্রিম কর নিচ্ছে, সেটি মানতে গেলে ১৪০ শতাংশ লাভ করতে হবে, যা আসলে সম্ভব নয়। সিমেন্ট লাক্সারি পণ্য নয়, এটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। ফলে সরকার এদিকে নজর দিলে এবং আমরা একটু চেষ্টা করলে রফতানি আরো সম্প্রসারণ করতে পারি।

আমরা চাই অগ্রিম আয়করের বিষয়টি সমাধান হোক। পণ্য বিক্রির আগেই যদি লাভ ধারণা করে কর নিয়ে যায়, তাহলে আমাদের জন্য ব্যবসা করা কঠিন হয়ে যায়। ফলে আমরা চাই, এ সমস্যাগুলো সরকার সমাধান করুক। আমাদের এখানে ব্যাংক সুদ অনেক বেশি। এত সুদে কোনো শিল্প-কারখানা গড়ে তোলা সম্ভব না। একদিকে ব্যাংক সুদ, অন্যদিকে কর। এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের যে সমাজিক দায়বদ্ধতা, সেখানে কাজ করাটা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। নির্মাণসংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের জন্য প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা সত্যিই কঠিন। আমরা আশা করি, সরকার এ বিষয়গুলোকে আমলে নেবে।