বাংলাদেশের কর ব্যবস্থাকে আরো আধুনিক, স্বচ্ছ ও ব্যবসাবান্ধব করতে হলে ডিজিটাল রূপান্তর এখন আর বিলম্ব করার বিষয় নয়, বরং সময়ের দাবি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এরই মধ্যে কর প্রশাসনের সংস্কার ও ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। যেমন গত বছর কয়েকটি ক্ষেত্রে ব্যক্তি আয়ের রিটার্ন ই-রিটার্ন প্লাটফর্মের মাধ্যমে প্রদান করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং এনবিআর চেয়ারম্যান এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন এ বছর শতভাগ ব্যক্তি শ্রেণীর রিটার্ন এ প্লাটফর্মের মাধ্যমে প্রদান করতে হবে। তবে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আহরণ, করদাতার অংশগ্রহণ এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়নে আমরা এখনো কাঠামোগত ও বাস্তবায়নজনিত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা, আমদানিনির্ভরতা, অর্থনৈতিক স্থবিরতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে কর আদায়ের হার কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে না। কর-জিডিপি অনুপাত এখনো মাত্র ৭ দশমিক ৮ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। অনেক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখনো করজালের বাইরে রয়েছে, যার অন্যতম কারণ কর ব্যবস্থার জটিলতা ও অস্বচ্ছতা। এনবিআরের কর সংগ্রহ প্রক্রিয়া এখনো অনেকাংশে ম্যানুয়াল, যেখানে করদাতাদের দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। এতে নতুন করদাতারা নিরুৎসাহিত হন এবং করজালের বাইরে থেকে যান। এ বাস্তবতায়, কর ও ভ্যাট ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ও অটোমেশন এখন সময়ের অনিবার্য চাহিদা।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে ডিসিসিআই সরকারের কাছে যে প্রস্তাবগুলো দিয়েছে, তার মধ্যে করপোরেট আয়কর রিটার্ন অটোমেশন এবং মোবাইল অ্যাপভিত্তিক মূসক ব্যবস্থাপনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ম্যানুয়ালি আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ, জটিল এবং অনেক সময় ভুলের ঝুঁকি থেকে যায়। এতে শুধু করদাতারই নয়, এনবিআরের প্রশাসনিক ব্যয়ও বেড়ে যায়। এ জটিলতা দূর করতে হলে একটি স্বয়ংক্রিয় অনলাইন কর রিটার্ন পদ্ধতি চালু করা দরকার, যেখানে প্রিপপুলেটেড রিটার্ন, ই-রিফান্ড ও ই-আপিলের সুবিধাসহ সমন্বিত ডিজিটাল সিস্টেম থাকবে। এতে করদাতা স্বাচ্ছন্দ্যে রিটার্ন জমা দিতে পারবেন এবং এনবিআরও রিটার্ন গ্রহণ ও যাচাই প্রক্রিয়ায় দ্রুততা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারবে। এমন একটি সিস্টেম চালু হলে কর ফাঁকির যে গ্লানি ব্যবসায়ীদের শুনতে হয় তা থেকে পরিত্রাণ পাবেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া করদাতাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারের রাজস্ব সংগ্রহের পরিমাণও অনেকাংশে বাড়বে বলে আমরা মনে করি।

ভ্যাট ব্যবস্থাপনায়ও এখন সময় এসেছে মোবাইল অ্যাপভিত্তিক সহজ ও কার্যকর সমাধানের। দেশের অধিকাংশ ব্যবসায়ীর কাছে ইএফডি মেশিন পৌঁছানো সম্ভব না হলেও তাদের হাতে রয়েছে স্মার্টফোন। এ বাস্তবতা বিবেচনায় ডিসিসিআই একটি মোবাইল অ্যাপ চালুর প্রস্তাব করেছে, যার মাধ্যমে বিক্রেতারা সহজেই পণ্যের বিক্রয়মূল্য, ক্রেতার নাম ও যোগাযোগ তথ্য ইনপুট দিয়ে একটি ডিজিটাল ভ্যাট রসিদ তৈরি করতে পারবেন। এ রসিদ ক্রেতার মোবাইল নম্বরে মেসেজ বা ই-মেইলের মাধ্যমে পাঠানো যাবে এবং একই সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এনবিআরের ডাটাবেজে সংরক্ষিত থাকবে। এমনকি অ্যাপটি অফলাইনে কাজ করবে, অর্থাৎ ইন্টারনেট না থাকলেও তথ্য ইনপুট করে পরবর্তী সময়ে ইন্টারনেটে সংযুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এনবিআরের ডাটাবেজে আপলোড হয়ে যাবে। এ উদ্যোগ শুধু রাজস্ব আহরণ বাড়াবে না, বরং ভোক্তার অধিকার সুরক্ষা ও ব্যবসায়ীদের জন্য সহজতর হিসাব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করবে।

ডিসিসিআই বিশ্বাস করে, এই দুটি ডিজিটাল পদক্ষেপ যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে দেশের কর প্রশাসনে যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। একদিকে যেমন কর ফাঁকি রোধ করা যাবে, অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা উৎসাহিত হবেন নিয়মিত কর প্রদানে। এতে রাজস্ব আয় বাড়বে, ব্যবসার খরচ কমবে এবং সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক পরিবেশ হবে আরো গতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক। অতএব বাজেট প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের সময় সরকারের নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানানো যাচ্ছে কর ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ ও সহজ করতে এ প্রস্তাবগুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করুন। একটি আধুনিক কর প্রশাসনই হতে পারে আগামীর উন্নত বাংলাদেশের ভিত্তি।

একই সঙ্গে ভ্যাটের ভিন্ন ভিন্ন হারকে একক হার ব্যবস্থা করার বিষয়েও ঢাকা চেম্বার প্রস্তাব দিয়েছে। যদি একক হার বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে ব্যবসায়ীদের ভ্যাট ব্যবস্থাপনায় জটিলতা কমবে।

এখন যেমন কয়েকটা হার হওয়ার কারণে হিসাব ও ক্রেডিট প্রাপ্তিতে কর প্রশাসনের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়। একক হার হলে কর প্রশাসন ও ব্যবসায়ীদের এর কাজ সহজ হবে। তবে ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট সঠিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে, নাহলে একক হারের কারণে এখন যেসব ক্ষেত্রে ২ থেকে ৭ শতাংশ আছে সেসব পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। সে কারণে ক্রেডিট নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে একক হার সিঙ্গেল ডিজিটে হওয়া বাঞ্ছনীয়। অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিক ও ক্ষুদ্র খাতের জন্য ভ্যাট হার ১ শতাংশ ধার্য করা প্রয়োজন। এ খাতের ব্যবসায়ীদের ওপর অধিক হারে ভ্যাট আরোপ করলে তাদের ওপর আর্থিক চাপ বাড়বে। কারণ তারা প্রায়ই ক্রেডিটের সুবিধা নিতে অক্ষম হয়। তবে তাদের একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রাথমিকভাবে ১ শতাংশ প্রয়োগ করে তাদের ভ্যাট নেটের আওতায় নিয়ে আসা প্রয়োজন।

এতে এনবিআর সাময়িকভাবে কম রাজস্ব পেলেও একেবারে না পাওয়ার থেকে ভালো অবস্থানে থাকবে। পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে সময় ও সক্ষমতার ভিত্তিতে এ হার নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে।

আয়করের বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সব থেকে বড় যে চিন্তার কারণ রয়েছে তা হচ্ছে উৎসে কর, অগ্রিম কর ও ন্যূনতম কর। অনেক উৎসে করকে ন্যূনতম করের আওতায় নেয়ার ফলে প্রদত্ত সেসব করকে ফেরত বা সমন্বয় করার উপায় থাকে না।

সে কারণে ঢাকা চেম্বার উৎসে কর ও অগ্রিম করকে পরিমিত পর্যায়ে নিয়ে আসার বিষয়ে প্রস্তাব রেখেছে। বর্তমানে ব্যবসায়ীদের ওপর যেভাবে অগ্রিম কর, উৎসে কর ও প্রমাণ না থাকলে ব্যয় অগ্রহণযোগ্য করার নীতি চলছে তা ব্যবসায়িক খরচ বৃদ্ধি এবং কর ব্যবস্থাকে শাস্তিমূলক করে তুলেছে। এ কর ব্যবস্থাপনাকে যৌক্তিক করা গেলে ব্যবসায়ীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর দিতে আগ্রহী হবেন। যা রাজস্বের পরিমাণ ও কর প্রশাসনের প্রতি ব্যবসায়ীদের আস্থা বাড়াবে। এছাড়া বিভিন্ন সময় কর রিটার্নে ছোটখাটো অনিয়মের জন্য যে পরিমাণ জরিমানা আরোপ করা হয়, তা উদ্যোক্তাদের জন্য বিপর্যয়কর হয়ে দাঁড়ায়। কর আদায় বাড়াতে হলে শাস্তির পরিবর্তে সচেতনতা, ডিজিটাল সমাধান এবং স্বতঃসিদ্ধ সংশোধনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

ঢাকা চেম্বার মনে করে, কর ব্যবস্থাপনাকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোয় নিয়ে আসা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং, তবে অসম্ভব নয়। যদি সরকার ও এনবিআর যুগোপযোগী ও প্রযুক্তিনির্ভর সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে তবে তা সম্ভব। ঢাকা চেম্বার বিশ্বাস করে ট্যাক্স বেইজ সম্প্রসারণ, ভ্যাটের ডিজিটালাইজেশন এবং কর ব্যবস্থার সরলীকরণ দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাকে আরো বেশি সক্ষম করে তুলতে পারে।