দেশের স্বাস্থ্য খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের আকার কত? এ খাতে বিনিয়োগ কতটা লাভজনক বলে মনে করেন?
প্রথমত, আমাদের দেশে তৈরি পোশাকসহ অন্য খাতের মতো স্বাস্থ্যকেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এখানকার বিদ্যমান মার্কেটের আকার ২০-২২ বিলিয়ন ডলার, যা অদূরভবিষ্যতে ৩৫-৪০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে। আর দ্বিতীয়ত, সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলনে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। আগামী চার-পাঁচ বছরের মধ্যে এ খাতে ২০-২৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হবে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোয় স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সাধারণত বেসরকারি খাত এগিয়ে থাকে। বিভিন্ন ট্রান্সপ্লান্টের জন্য প্রতি বছর দুই থেকে চার হাজার রোগী দেশের বাইরে যান। সুতরাং চাহিদাসম্পন্ন এমন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এবারই প্রথম বাজেট। দেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য এ বাজেটে কী ধরনের ঘোষণা প্রত্যাশা করছেন?
পোশাক খাতে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রণোদনা ও সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়। সেভাবেই গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে স্বাস্থ্য খাতকে এগিয়ে নিতে ট্যাক্স, অ্যাডভান্সড ট্যাক্স, অ্যাডভান্সড ইনকাম ট্যাক্স, ভ্যাট, যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের আমদানি শুল্ক মওকুফসহ বিভিন্ন সুবিধা দিতে হবে। এতে সরকার হয়তো এক-দেড় হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে। কিন্তু এর বিপরীতে ১০ হাজার কোটি টাকা আয় হবে।
অন্যদিকে বাজেট বাড়ালেই যে স্বাস্থ্য খাতের উন্নতি হবে—বিষয়টি এমন নয়। বিগত অর্থ বছরে স্বাস্থ্য খাতের জন্য ৪২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। এ রকম প্রতি বছর যে বাজেট দেয়া হয় তা যথাযথভাবে খরচ হয় না। এ খাতে সুশাসন, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে বরাদ্দের অর্থ খরচ করলে এ ৪২ হাজার কোটি টাকায় ১ লাখ কোটি টাকার ফল পাওয়া যেত।
বাজেট বাড়ানোর ক্ষেত্রে আমি উচ্চাশা পোষণ করি না। বরং যে অর্থ বরাদ্দ হয় তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া স্বাস্থ্য খাতের জন্য আলাদা কমিশন করা যেতে পারে, যা এ খাতের বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোকে গাইড করে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
চিকিৎসাসেবার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা দক্ষ জনশক্তির অভাব। এ সংকট নিরসনে কী কী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে? সেক্ষেত্রে বাজেটের কী অবদান থাকতে পারে?
দেশের ১২ লাখ স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার ডাক্তার এবং ৮০-৮৫ হাজার নার্স। তাদের দুই-তৃতীয়াংশই কাজ করেন বেসরকারি খাতে। এদের প্রশিক্ষণের জন্য ছোট ছোট কিছু সংগঠন রয়েছে। তবে এ-সংক্রান্ত সরকারি কোনো পরিকল্পনা স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নেই। পদোন্নয়নের ক্ষেত্রে পরীক্ষার ব্যবস্থাও নেই। যদিও হেলথ ডিরেক্টরিতে স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের কথা উল্লেখ আছে, তবে সেটার উন্নয়ন দরকার।
পার্শ্ববর্তী দেশে একটি হাসপাতাল কিংবা ডায়াগনস্টিক সেন্টার প্রতিষ্ঠা করলে অ্যাক্রেডিটেশনের আওতায় আসতে হয়। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন হাসপাতালে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ-কর্মশালা পরিচালনা করে থাকে। হসপিটাল ম্যানেজমেন্টে প্রশাসনের লোক এনে বসিয়ে দিলে হবে না। এ কাজে স্বাস্থ্যকর্মীদেরই যুক্ত করতে হবে।
বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার দিক থেকে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে। সংকট ও সীমাবদ্ধতা কোথায়? জাতীয় বাজেটে এ সংকট মোকাবেলায় কী ধরনের নীতি নেয়া উচিত?
স্বাস্থ্য বাজেটের ১০-২০ শতাংশ বরাদ্দ রাখতে হবে শুধু বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য। এভাবে আগামী চার-পাঁচ অর্থবছর বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার জন্য অর্থ বরাদ্দ করলে উন্নত চিকিৎসার জন্য হাহাকার আর থাকবে না।
আসছে বাজেটে ওষুধ শিল্পের জন্য কী ধরনের বিশেষ সুবিধা প্রত্যাশা করছেন? রেয়াত সুবিধার বিষয়ে নতুন কোনো প্রত্যাশা রয়েছে কি?
ওষুধ শিল্প অনেক ভালো করছে। চাহিদার ৯৮ শতাংশ ওষুধ আমরা তৈরি করছি। বাইরে থেকে মাত্র ২ শতাংশ আসে। উল্টো তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার ওষুধ রফতানি করা হচ্ছে।
গজারিয়ায় একটি শিল্প পার্ক হয়েছে। কিন্তু নীতিমালা না থাকায় কোনো ফ্যাক্টরি এখনো সেভাবে কাজ শুরু করতে পারেনি। প্রথমত, অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যালস ইনগ্রেডিয়েন্টসের (এপিআই) জন্য ওষুধ শিল্পে ব্যাপক বিনিয়োগ দরকার হয়। চার-পাঁচটি কোম্পানি যদি একই পণ্য তৈরি করে তাহলে বাজারটাও প্রতিযোগিতামূলক হবে। এক্ষেত্রে সরকারের নীতিনির্ধারণী সংস্থা ও বিনিয়োগকারীদের এক টেবিলে বসে কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। বর্তমানে আমরা ৫-৬ হাজার কোটি টাকার এপিআই আমদানি করি। কিন্তু এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলে তিন থেকে পাঁচ বছর পর ৮-১০ হাজার কোটি টাকা রফতানি করতে পারব।
অন্যদিকে কাঁচামাল আমদানিতে প্রায় ৩০ শতাংশ ট্যাক্স দিতে হয়। এ জায়গায় অবশ্যই নজর দিতে হবে। কেননা এ খাতের সুবিধাভোগী জনগণ এবং একই সঙ্গে এটি আমাদের রফতানি আয়ের খাত।
বলা হয়, আমাদের দেশে ওষুধের দাম বেশি। কিন্তু অন্য দেশ যেমন যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের তুলনায় দেশে ওষুধের দাম ৫ ভাগ কম। ১১৭টি অ্যাসেনশিয়াল ড্রাগস সরকার বানায়। এক্ষেত্রে উৎপাদনের পরিমাণ বাড়াতে হবে কিংবা বেসরকারি উৎপাদকদের প্রণোদনা দিতে হবে।





