ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এক নতুন ধারায় প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। ব্যাংক খাতের জন্য পরিবর্তিত এ পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখছেন?

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশ একটি নতুন ধারায় প্রবেশ করেছে। অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দেশ ও জনগণের প্রত্যাশা অনেক। দেশের মানুষ বিভিন্ন খাতে সংস্কার চাইছে। বিগত প্রায় ১৬ বছরে দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি খাতই ব্যাপক মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর্থিক খাতে সংঘটিত হয়েছে সীমাহীন লুটপাট। ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও প্রাতিষ্ঠানিক লুটেরা সিন্ডিকেট জনগণের অর্থ শুধু লুটপাট করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করেছে; দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। রাষ্ট্র ও সমাজ দীর্ঘকাল বিচারহীনতার মধ্যে থাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এ দেশের অর্থনীতিতেই।

গণ-অভ্যুত্থানের ফলে সরকারের পতন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের আগমন ব্যাংক খাতের জন্য নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার সময়ক্ষেপণ না করে দায়িত্ব গ্রহণের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ব্যাংক খাতের সংস্কারের জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে। টাস্কফোর্সে দেশী-বিদেশী নামকরা ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা রয়েছেন। তারা এরই মধ্যে কার্যক্রম শুরু করেছেন। টাস্কফোর্সের কার্যক্রমের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক ১৫টি তফসিলি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়েছে এবং আরো কয়েকটি ব্যাংকের পর্ষদ নিয়ে আলোচনা চলছে। ভেঙে দেয়া ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের মাধ্যমে পুনর্গঠন করা হয়েছে। সেসব ব্যাংকে নতুন করে নিরীক্ষা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকগুলোতে শরিয়াহ বোর্ডে বেশকিছু পরিবর্তন এসেছে। নতুন পরিচালনা পর্ষদ দায়িত্ব নেয়ার পর অনেক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন হয়েছে। কোনো কোনো ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহীদের কেউ পদত্যাগ করেছেন আবার কেউ আত্মগোপনে চলে গেছেন। কোনো কোনো ব্যাংকে কর্মচারী ছাঁটাই চলছে, আবার ছাঁটাইয়ের শিকার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রাস্তায় নেমে তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে দেখা গেছে।

তবে আশার কথা হলো, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর বড় অংশই এরই মধ্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। গত ছয় মাসে আমানত সংগ্রহ ও গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে এসব ব্যাংক এ অগ্রগতি অর্জন করেছে। ঘুরে দাঁড়ানো ব্যাংকের মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির সাফল্য উল্লেখ করার মতো। দেশের সর্ববৃহৎ ব্যাংক হিসেবে আমরা আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। গত আট মাসে আমরা ২৪ হাজার কোটি টাকা আমানত বৃদ্ধি ও ১৮ লাখ নতুন অ্যাকাউন্ট খুলেছি। আর্থিক অবস্থা মূল্যায়নের জন্য চারটি অডিট ফার্ম নিয়োগ করা হয়েছে। অতীতের অনিয়মের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে। কেমন বাজেট চান?

বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশের যেসব খাত সংকটে রয়েছে, বাজেটে সেসব খাতের ওপর জোর দেয়া উচিত। প্রথমত, মুদ্রাস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশের নিচে রাখলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে ও জীবনমান স্বাচ্ছন্দ্য হবে। আয়করের বোঝা না বাড়িয়ে রাজস্ব বাড়ানোর জন্য আয়করের আওতা (ট্যাক্স-নেট) বৃদ্ধি ও অবৈধ অর্থপ্রবাহ রোধ করা যেতে পারে। ব্যাপকভাবে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগের (সিএমএসএমই) জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা দরকার। তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে।

বাজেটে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি শক্তিশালী করা প্রয়োজন। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী, বয়স্ক এবং নারীদের জন্য ভাতা ও সহায়তা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। বাজেট ঘাটতি কমাতে রাজস্ব আহরণের দক্ষতা বাড়াতে হবে। কর ফাঁকি রোধ, ডিজিটাল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার সদ্ব্যবহার করা যেতে পারে। সরকারের কাছে প্রত্যাশা হলো এমন একটি বাজেট, যা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে, দুর্নীতি কমাবে এবং সবার জন্য ন্যায়বিচার ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করবে।

ব্যাংক খাতের জন্য বাজেটে কী ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন?

২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে এ খাতের সংস্কার ও স্থিতিশীলতার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছি। ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দ্রুত বিচার এবং ঋণ পুনরুদ্ধারে প্রণোদনার জন্য বাজেটে বরাদ্দ প্রত্যাশা করছি। এছাড়া ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান পরীক্ষায় ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহার জরুরি মনে করি। অর্থ পাচার রোধে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আইএমএফের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ে কাজ করার জন্য বিশেষ তহবিল বরাদ্দ করা উচিত। ব্যাংকের শাসন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ, ডিজিটাল নিরীক্ষা ব্যবস্থা চালু এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন বাড়াতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে বিনিয়োগ প্রয়োজন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ প্রদানে বিশেষ তহবিল গঠন ও মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা উচিত। এছাড়া আর্থিক সাক্ষরতা বাড়াতে জনসচেতনতা প্রকল্পে তহবিল বরাদ্দ করা উচিত। রিজার্ভ আরো শক্তিশালী করার জন্য বিদেশ গমনেচ্ছুদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করে উচ্চ বেতনের চাকরিতে পাঠানো ও রফতানি খাতে প্রণোদনা এবং বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয়ে তহবিল সংগ্রহে বাজেটে অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন। ব্যাংক খাতে দুর্নীতি ও ঋণ কেলেঙ্কারি রোধে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন, পূর্ববর্তী শাসনামলের কেলেঙ্কারি তদন্ত ত্বরান্বিত করতে আইনি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং ব্যাংক কর্মকর্তাদের জন্য সততা প্রশিক্ষণে বাজেটে বরাদ্দ রাখা জরুরি।

দীর্ঘদিন ধরে আপনারা ব্যাংকের করপোরেট করহার, আবগারি শুল্কসহ সেবার বিপরীতে আরোপিত ভ্যাট কমানোর দাবি জানিয়ে আসছেন। এবারের বাজেটেও কি একই দাবি জানাচ্ছেন?

ব্যাংক খাতের প্রেক্ষাপটে করপোরেট করহার, আবগারি শুল্ক এবং সেবার বিপরীতে আরোপিত ভ্যাট কমানোর দাবি দীর্ঘদিনের। এ দাবির পেছনে মূল যুক্তি হলো উচ্চ করের বোঝা ব্যাংকগুলোর লাভজনকতা কমায়, বিনিয়োগ সক্ষমতা হ্রাস করে এবং শেষ পর্যন্ত গ্রাহকদের ওপর উচ্চ সুদহার বা সেবা মূল্যের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাতের প্রত্যাশা হিসেবে এ দাবি পুনর্ব্যক্ত করা যৌক্তিক। বর্তমানে ব্যাংকের করপোরেট করহার ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় উচ্চ। এ উচ্চহার ব্যাংকগুলোর পুঁজি গঠন ও ঋণ প্রদানের সক্ষমতাকে সীমিত করে, বিশেষ করে খেলাপি ঋণ (এনপিএল) এবং আর্থিক অস্থিতিশীলতার প্রেক্ষাপটে। তাই ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে করপোরেট করহার কমিয়ে ৩০ শতাংশ বা তার নিচে নির্ধারণের দাবি জানাচ্ছি। এটি ব্যাংকগুলোর লাভজনকতা বাড়াবে, বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে এবং শিল্প ও এসএমই খাতে স্বল্প সুদে ঋণ প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রক্ষণাবেক্ষণ ও লেনদেনের ওপর আরোপিত আবগারি শুল্ক গ্রাহকদের জন্য বোঝা সৃষ্টি করে, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের গ্রাহকদের জন্য। বাজেটে আবগারি শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার বা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাসের দাবি উঠছে। এটি গ্রামীণ এলাকায় ব্যাংকিং সেবার প্রসারে সহায়তা করবে এবং ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের আর্থিক ব্যবস্থায় সম্পৃক্ত করবে। এছাড়া সেবার বিপরীতে আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট ব্যাংকিং সেবার খরচ বাড়িয়ে দেয়। এ ভ্যাট গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত বোঝা সৃষ্টি করে এবং ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের প্রসারে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবে এ কর হ্রাসের ফলে সরকারের রাজস্ব আয়ে ঘাটতি হতে পারে, তাই বাজেটে বিকল্প রাজস্ব উৎস যেমন কর ফাঁকি রোধ, ডিজিটাল কর ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং ধনী ও করপোরেট খাত থেকে ন্যায্য কর আদায়ের মাধ্যমে এ ঘাটতি পূরণের কৌশল ঘোষণা করা যেতে পারে।

সরকার ঘোষিত বাজেট বাস্তবায়নে ইসলামী ব্যাংক কী ধরনের ভূমিকা রাখবে?

ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই দেশের স্বার্থে কাজ করে আসছে। এ ব্যাংক সরকারের উন্নয়ন সহযোগী, বাজেট বাস্তবায়নের অংশীদার ও আর্থিক নীতিমালা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখছে। আগামীতেও এ ভূমিকা অব্যাহত থাকবে। ইসলামী ব্যাংক পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের (আরডিএস) মাধ্যমে সারা দেশে বর্তমানে ৩২ হাজার গ্রামে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, উদ্যোক্তা তৈরি ও নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করছে। আগামীতে দেশের ৬৮ হাজার গ্রামে আরডিএস প্রকল্পের প্রসার ঘটানো হবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে খাদ্য, কাঁচামাল ও উৎপাদন ও বিতরণ সরবরাহে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। এটি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক হবে। এছাড়া সরকারের ডিজিটাল কর ব্যবস্থাপনা বা রাজস্ব সংগ্রহে সহায়তার জন্য ইসলামী ব্যাংক ইলেকট্রনিক পেমেন্ট গেটওয়ে দিতে প্রস্তুত। বাজেটে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা বিতরণের জন্য ইসলামী ব্যাংকের সহায়তা থাকবে। সর্বোপরি সরকারের বাজেট বাস্তবায়নে সব ধরনের সহযোগিতা দিতে ইসলামী ব্যাংক প্রস্তুত।