আকিজ রিসোর্সের অন্যতম অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আকিজ সিমেন্টের বর্তমান বাজারচিত্র, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও শিল্প খাতের অগ্রগতি নিয়ে সম্প্রতি বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন আকিজ রিসোর্সের ভাইস চেয়ারম্যান এ. কে. জোয়াদ্দার
বর্তমানে দেশের সিমেন্ট খাতের আকার কত? এ খাতে কতটি কোম্পানি রয়েছে?
বাংলাদেশের সিমেন্ট খাত দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও দ্রুত বিকাশমান শিল্প খাত। বর্তমানে দেশের সিমেন্ট বাজারের বার্ষিক আকার ৪৫০-৫০০ বিলিয়ন টাকার কাছাকাছি। বার্ষিক চাহিদা প্রায় সাড়ে ৩-৪ কোটি টন। দেশের মোট উৎপাদন সক্ষমতা আট কোটি টনের বেশি, যা দেশের মোট চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ। দেশে বর্তমানে প্রায় ৩৫-৪০টি কোম্পানি সিমেন্ট উৎপাদনে সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে আকিজ সিমেন্ট, লাফার্জহোলসিম, ক্রাউন, সেভেন রিংস সিমেন্ট, শাহ সিমেন্ট, বসুন্ধরা, ফ্রেশ সিমেন্ট, প্রিমিয়ার সিমেন্ট ইত্যাদি বড় ব্র্যান্ডগুলো উল্লেখযোগ্য বাজার শেয়ার দখল করে রেখেছে।
দেশে চাহিদার তুলনায় সিমেন্ট খাতের উৎপাদন সক্ষমতা অনেক বেশি। ফলে এ খাতের ব্যবসায় প্রতিযোগিতাও অনেক বেশি। বর্তমানে এ খাতের ব্যবসা কেমন যাচ্ছে?
বর্তমানে সিমেন্ট খাতে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার কারণে কঠিন প্রতিযোগিতা চলছে। প্রতিটি কোম্পানি বাজার ধরে রাখতে বা বাড়াতে মূল্যছাড়, অফার ও নানা প্রমোশনাল কার্যক্রম পরিচালনা করছে। একদিকে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও ডলারের অস্থিরতা, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির কারণে নির্মাণ খাতে বিনিয়োগ কিছুটা ধীর হয়ে পড়েছে। ফলে বিক্রিও প্রত্যাশার তুলনায় কম হচ্ছে। তবে ব্র্যান্ড ভ্যালু, প্রডাক্ট কোয়ালিটি, টেকনিক্যাল সাপোর্ট ও ক্রেতাদের আস্থা যাদের ওপর বেশি তারা এখনো স্থিতিশীলভাবে ব্যবসা করতে পারছে, যার বড় উদাহরণ আকিজ সিমেন্ট।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে এ খাতের জন্য আপনাদের প্রত্যাশা কী?
আমাদের প্রত্যাশা সিমেন্ট খাতকে অবকাঠামোগত শিল্প হিসেবে ঘোষণা দেয়া হোক; যাতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সাশ্রয়ী সুদে ঋণ পাওয়া যায়। অগ্রিম কর, উৎসে কর ও শুল্কে রেয়াত দেয়া হোক। ডলারের স্থিতিশীল হার নিশ্চিত করা হোক, যাতে আমদানি ব্যয় অনিয়ন্ত্রিত না হয়। রফতানি সুবিধা বা ট্যাক্স রিবেট চালু করে দেশীয় সিমেন্টের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ সহজ করা হোক।
দেশের সিমেন্ট খাতে প্রায় শতভাগ কাঁচামাল আমদানিরনির্ভর। কাঁচামাল আমদানিতে কোনো প্রতিবন্ধকতা রয়েছে?
হ্যাঁ, প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। সিমেন্ট শিল্প প্রায় ৮০-৯০ শতাংশ কাঁচামাল যেমন ক্লিংকার, জিপসাম, লাইমস্টোন, ফ্লাই অ্যাশ আমদানি করে। বর্তমানে ডলার সংকট, এলসি ওপেনে জটিলতা এবং ব্যাংকগুলোর পর্যাপ্ত ফান্ড না থাকা ইত্যাদি কারণে কাঁচামাল আমদানিতে চ্যালেঞ্জ দেখা দিচ্ছে।
এতে সময়মতো পণ্য তৈরি সম্ভব হচ্ছে না, প্রডাকশন সাইকেল ব্যাহত হচ্ছে এবং গ্রাহকের কাছে সময়মতো পণ্য ডেলিভারি দেয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
দেশে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। এটি কমিয়ে আনতে নীতিনির্ধারণ পর্যায়ে কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
উচ্চ মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির সব খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি নিয়ন্ত্রণে আনতে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে সমন্বয় জরুরি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর শুল্ক ও ভ্যাট কমিয়ে ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। উৎপাদন খাত ও শিল্পে বিনিয়োগে প্রণোদনা দেয়া প্রয়োজন, যাতে কর্মসংস্থান বাড়ে এবং মানুষের হাতে টাকা আসে। পণ্য আমদানিতে রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং ডলারের ওপর কৃত্রিম নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করে বাজারভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করা দরকার।
অগ্রিম কর ফেরত বা সমন্বয় না করার ব্যাপারে উদ্যোক্তাদের অভিযোগ পুরনো। আপনারা এ কর প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছেন। ব্যবসার খরচ কমানোর ক্ষেত্রে এটি কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে কি?
অবশ্যই এটি বড় প্রতিবন্ধকতা। অগ্রিম কর ও উৎসে কর মূলত ব্যবসায়িক খরচের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। সমস্যাটা হলো এ কর আদায় হলেও তার রিফান্ড বা সমন্বয় হয় দীর্ঘসূত্রতায়, যা কোম্পানির ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল আটকে রাখে। ফলে প্রতিযোগিতামূলক দামে বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে এ করের বোঝা গ্রাহকের ওপরও গিয়ে পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে ব্র্যান্ড ইমেজকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।





