ব্যাংক খাতের একজন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী হিসাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই?
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার টানা দেড় দশকের বেশি ক্ষমতাসীন ছিল। একটি রাজনৈতিক সরকারের জন্য এটি অনেক দীর্ঘ সময়। এ সময়ে তারা যদি সঠিকভাবে দেশ পরিচালনা করত, আইন-শৃঙ্খলা, আর্থিক ও সামাজিক ব্যবস্থাপনা যদি ঠিক থাকত, তাহলে সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশ উন্নত না হলেও উন্নত হওয়ার কাছাকাছি পৌঁছে যেত। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও অলিগার্করা মিলে দেশের সাত-আটটি ব্যাংক লুট করেছে। আরো অনেক ব্যাংক থেকেও বিভিন্ন অংকের অর্থ লোপাট হয়েছে। ব্যাংক থেকে বের করে নেয়া অর্থ দেশে থাকলেও অর্থনীতির এতটা ক্ষতি হতো না। ব্যাংক থেকে লোপাটকৃত অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। এ কারণে ব্যাংক খাত একেবারেই দুর্বল হয়ে গেছে। বিদেশে অর্থ পাচার না হলে ব্যাংক খাত অনেক শক্তিশালী থাকত।
মার্চে দেশে ৩ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আগে তো কোনো মাসে এত পরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে আসেনি। হুন্ডির বাজারে চলে যাওয়ার কারণেই গত কয়েক বছর দেশের রেমিট্যান্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। টাকা পাচারকারীরা দুবাই থেকে ডলার কিনে নিয়েছে। সে ডলার দেশে না এনে ব্যাংক থেকে সুবিধাভোগীদের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দিয়েছে। এভাবে দেশে হুন্ডির বড় বাজার তৈরি হয়েছে। এখন বিদেশে হুন্ডির চাহিদা কমে যাওয়ায় রেমিট্যান্স ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এ ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে বছরে ৩৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসবে। তখন যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রফতানি বন্ধ হয়ে গেলেও আমরা ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে পারব।
ব্যাংক খাত সংস্কারে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এরই মধ্যে নেয়া পদক্ষেপগুলোকে কীভাবে দেখছেন? ব্যাংক খাত সংস্কারে আরো কী উদ্যোগ প্রত্যাশা করেন?
ব্যাংক খাত ঠিক করতে অর্থ উপদেষ্টা ও গভর্নর চেষ্টা করে যচ্ছেন। তারা এরই মধ্যে বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছেন। এক ডজনের বেশি বেসরকারি ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দেয়া হয়েছে। নতুন পর্ষদ দায়িত্ব নেয়ার পর ওই ব্যাংকগুলো থেকে চুরি বন্ধ হয়েছে। তবে এটিও মনে রাখতে হবে, সবকিছু রাতারাতি ঠিক করে ফেলা যাবে না। লুণ্ঠনের শিকার হওয়া ব্যাংকগুলোর ইমেজ (ভাবমূর্তি) নষ্ট হয়ে গেছে। এখন যদি সরকার কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়, এ ব্যাংক দুর্বল, ওই ব্যাংক ভালো। তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। কোনো ব্যক্তি ব্যাংকে গিয়ে যদি টাকা তুলতে না পারে, তাহলে সে ব্যাংকের ওপর ওই গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনা খুবই কঠিন। পর্ষদ ভেঙে দেয়ার পর ব্যাংকগুলো এখন আর্থিক অবস্থা স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালাচ্ছে। যারা অর্থ লোপাট করেছে, তারা তো এখন আর নেই। ফলে নতুন করে কিছু হওয়ার সুযোগ কম। এ খাতে রাতারাতি বিপ্লব করে ফেলা যাবে না। আর্থিক খাতের নিয়মই হচ্ছে ধীরে ধীরে কাজ করতে হয়। খেয়াল রাখতে হবে, ব্যাংক খাতের সংস্কারটা যেন টেকসই হয়।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসে (বিএবি) দীর্ঘ ১৭ বছর পর পরিবর্তন এল। এ সংগঠনের চেয়ারম্যানের হিসেবে আপনি ব্যাংক খাতের জন্য কী কী করেছেন বা করবেন বলে ভাবছেন?
বিএবির চেয়ারম্যান হওয়ার পর আমি বলেছি, সংগঠনের প্রত্যেক সদস্য কথা বলার সুযোগ পাবেন। যেটি আগে ছিল না। আগে আমরা মিটিংয়ে গিয়ে কথা বলতে পারতাম না। আগে বিএবির মিটিংয়ে গেলে চেয়ারম্যান বলে দিতেন, ওমুক দিন প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাব। আপনি ৫ কোটি দেবেন, আপনি ১০ কোটি দেবেন। কোনো বিষয়ে কথা বলতে চাইলে, বলতেন এ বিষয়ে আলোচনা হয়ে গেছে। বিএবি একটি সংগঠন হলেও এর চেয়ারম্যানই ছিলেন এটির মালিক। আর তিন-চারজন ছিল সহকারী। তিনি একই সিদ্ধান্ত নিতেন। এভাবে এ সংস্থাকে অকার্যকর করে রাখা হয়েছিল।
কোনো বিষয়ে আমি সমস্যা মনে করলে, প্রথমে গভর্নরের কাছে যাব। সেখানে যদি সমাধান না হয়, অর্থ সচিব আছেন, মন্ত্রী আছেন। কোথায়ও সমাধান না হলে তবেই প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাওয়ার প্রশ্ন আসে। কিন্তু বিগত সময়ে আমরা দেখেছি, বিএবির চেয়ারম্যান সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে চলে যাচ্ছেন। সেখান থেকে যে নির্দেশনা আসছে, সেটিই আইন। এখন আর সে সংস্কৃতি নেই। এখন আমরা যেকোনো সমস্যা গভর্নরের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করছি। আমরা প্রস্তাবনা দিচ্ছি, সেগুলো নিয়ে কাজ হচ্ছে। যেকোনো সমস্যা বা সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সরকারি-বেসরকারি সব পক্ষকে মিলেমিশে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এখানে কেউ কারো থেকে কম নয়। একটি কারখানা পরিচালনার জন্য একজন শ্রমিকও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম বাজেট আসন্ন। এ বাজেটে আপনাদের প্রত্যাশা কী?
অন্তর্বর্তী সরকারের নানা পক্ষের সঙ্গে এরই মধ্যে আমাদের তিন-চারটি বৈঠক হয়েছে। সব বৈঠকেই আমি বলেছি, আমাদের কথা শুনবেন। আমরা কী চাই, সেটি বোঝার চেষ্টা করবেন। যৌক্তিক হলে সমাধান করবেন। আগে বাজেটের ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর অংশীজনদের ডাকত। এরপর আমাদের থেকে শুনত। শুনে বাকি ৫ শতাংশ শেষ করত। লিখে দিত আমরা বেসরকারি খাতের সঙ্গে আলোচনা করেছি। ওই এটুকুই বাকি রাখত। এইটা এমন একটা প্রসেস, আলোচনাটা বছরের শুরুতে করা উচিত। তাহলে বাজেট সুন্দর হবে। সবার মতামতের প্রতিফলন ঘটানোর সময় থাকবে। যাচাই-বাছাইয়েরও সুযোগ থাকবে। এগুলো অতীতে এখানে হয়নি। আমরা চাই আমাদের কথাগুলো সঠিক সময়ে সরকার শুনুক এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করুক। বেশকিছু প্রস্তাবনা আমরা সরকারকে দিয়েছি। সেগুলো তারা বিবেচনায় নেবে—এটা প্রত্যাশা থাকবে।
দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে মনে করেন?
বর্তমানে খুব জরুরি হচ্ছে জ্বালানি সরবরাহ ঠিক রাখা। ইন্ডাস্ট্রিতে যদি গ্যাস আর বিদ্যুৎ সরবরাহ ঠিক থাকে তাহলে বিনিয়োগ আসবে। স্থানীয় বিনিয়োগকারীরাও বিনিয়োগ বাড়াবে। এখন একটা ইন্ডাস্ট্রির সব কিছু আছে, মেশিন, লিকুইড মানি, ক্রেতা, আধুনিক যন্ত্রপাতি, পর্যাপ্ত দক্ষকর্মী সব মানে সব। সেখানে যদি জ্বালানি না থাকে, তাহলে কি চলবে? কোনোভাবেই না। ফলে বিনিয়োগকারীরা এটিকে আগে গুরুত্ব দেয়। এখানে অনিশ্চয়তা থাকলে কেউ বিনিয়োগ করবে না। একটা মানুষের সব আছে, কিন্তু প্রাণ না থাকলে যা অবস্থা, এখানেও জ্বালানি ছাড়া অবস্থাটা এমন। ফলে জরুরিভাবে সরকারের উচিত জ্বালানি বিশেষ করে গ্যাস, বিদ্যুৎ সরবরাহ ঠিক করা। তাহলে নতুন বিনিয়োগ আসবে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগেও প্রবৃদ্ধি হবে।
করপোরেট করহার কমানো, বিভিন্ন ধরনের শুল্ক প্রত্যাহারসহ ব্যাংক খাতের নানা ধরনের দাবি আছে। এসব বিষয়ে আপনার বক্তব্য কি?
বাংলাদেশে করজালের বিস্তৃতি খুবই ছোট। এখানে যারা কর দেন, তাদের ওপরই আরো বেশি বোঝা চাপানো হয়। এটি অনন্তকাল চলতে পারে না। সরকারের পক্ষ থেকে করজালের আওতা বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ নেয়া দরকার। আরো বেশি মানুষ করজালের আওতায় এলে করদাতাদের ওপর চাপ কমবে। করহার কমিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় আনা দরকার। এর সঙ্গে নীতি-সহায়তাগুলোর মেয়াদ এক বছরের বদলে অন্তত পাঁচ বছর করা হলে সুনির্দিষ্টভাবে বিনিয়োগ পরিকল্পনা করা যায়। যেটি একটি কোম্পানির লক্ষ্য নির্ধারণ করতে সহায়তা করে, বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করে। সমস্যাগুলোর সমাধান আসলে বিনিয়োগকারীরা উৎসাহ পায়। এনবিআরের পক্ষ থেকে কর্মকর্তাদের কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া। যখন ওই কর্মকর্তার কর আদায়ের টার্গেট পূরণ না হয়, তখন সে ক্ষমতার অপব্যবহার করে কর সংগ্রহ বাড়ানোর চেষ্টা করে। এ ধরনের অনৈতিক চর্চা বন্ধ করতে হবে।
দেশের ব্যাংক খাতের সুদহার ১৪-১৫ শতাংশে ঠেকেছে। একজন ব্যবসায়ী হিসেবে এ উচ্চ সুদহারের বিষয়ে আপনার মতামত কী?
আমাদের দেশে এমনিতেই ব্যাংক ঋণের সুদহার অনেক বেশি। বর্তমানে এ সুদহার ১৪-১৫ শতাংশে উঠেছে। যে কোনো দেশের ব্যবসায়ীর জন্যই এটি বেশি। এত বেশি সুদ খুব কম দেশেই আছে। এটিকে নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। এছাড়া বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া উচিত। আমাদের কারেন্সি কিন্তু মিয়ানমারের চেয়ে শক্তিশালী। তারা বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। তারা পারলে আমরা কেন পারব না? সরকার বিনিময় হার ধরে রাখছে এবং অনেক টাকা ছাপছে। এত মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদ হার বাড়াতে হয়। কিন্তু বাস্তবে এত বেশি সুদ দিয়ে ব্যবসা বা উৎপাদন সম্ভব হয় না। অনেকেই বলেন হঠাৎ বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। তখন ডলার এক লাফে অনেক বেশি হয়ে যেতে পারে। কিন্তু আমি সেটা মনে করি না। আমি মনে করি, তখন বাজার প্রতিযোগিতার কারণে আরো কমে আসবে।










