আমি মনে করি, দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এখন এমন একটি পর্যায়ে এসেছে, যেখানে শুধু বিদ্যমান বাণিজ্য ধরে রাখাই যথেষ্ট নয়, বরং নতুন খাত, নতুন পণ্য ও নতুন ধরনের ব্যবসায়িক অংশীদারত্বের মাধ্যমে সম্পর্কটিকে আরো বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে। দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে। এ আলোচনাকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাস্তব সম্ভাবনাগুলো চিহ্নিত করা দরকার।
ব্যবসায়ী হিসেবে আমরা এ সম্পর্কের সম্ভাবনাকে খুব কাছ থেকে দেখছি। ডেল্টা এগ্রোফুড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নিয়মিতভাবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন বীজ আমদানি করে। ভবিষ্যতে আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্যানোলা তেলও আমদানির পরিকল্পনা করছি। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য ও খাদ্যপণ্যের গুণগত মান আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশের খাদ্য ও ভোজ্যতেল শিল্পের সম্প্রসারণের সঙ্গে এসব পণ্যের চাহিদাও বাড়ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে আরো বড় পরিসরে বাণিজ্যের সুযোগ রয়েছে।
তবে একই সঙ্গে আমাদের একটি বাস্তব বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পণ্যের গুণগত মান যতটা গুরুত্বপূর্ণ, মূল্য প্রতিযোগিতাও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোনো পণ্য আমদানির মোট ব্যয় যদি একই ধরনের পণ্য অন্য কোনো উৎস দেশ থেকে আমদানির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হয়, তাহলে বাংলাদেশের আমদানিকারকদের জন্য সেই পণ্য প্রতিযোগিতামূলকভাবে বাজারজাত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এটি শুধু আমদানিকারকের বিষয় নয়, শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে শিল্পের উৎপাদন ব্যয় ও ভোক্তার ওপরও। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে—মূল্য, গুণগত মান ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ। তাই বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য আরো বাড়াতে হলে শুধু বাজার উন্মুক্ত করাই যথেষ্ট নয়, বরং দুই দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক ও কার্যকর বাণিজ্যিক পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে।
আমরা চাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য আরো বাড়ুক। কিন্তু এ সম্পর্ককে শুধু এক দেশ কত বেশি রফতানি করল আর অন্য দেশ কত বেশি আমদানি করল, সেই হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক হবে না। বাণিজ্যিক সম্পর্কের প্রকৃত মূল্যায়নের জন্য দুই দেশের অর্থনীতির কাঠামো, উৎপাদন সক্ষমতা, বাজারের আকার, মাথাপিছু আয় ও ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ের পার্থক্যও বিবেচনায় নিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। অন্যদিকে বাংলাদেশ একটি দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতি, যা এখনো শিল্পায়ন ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির পর্যায়ে রয়েছে। দুই দেশের অর্থনীতির আকার, মাথাপিছু আয়, উৎপাদন সক্ষমতা, জিডিপি ও ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় এক নয়। তাই একই মানদণ্ডে দুই দেশের বাণিজ্য সক্ষমতা বিচার করলে বাস্তব পরিস্থিতি পুরোপুরি প্রতিফলিত হবে না।
এ বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার আরো সহজ করা এবং কিছু বাণিজ্যিক সুবিধা বা প্রেফারেন্স বিবেচনা করা হলে তা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ইতিবাচক হবে। কারণ একটি শক্তিশালী ও ক্রমবর্ধমান বাংলাদেশী অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য, প্রযুক্তি, সেবা ও বিনিয়োগের জন্যও বড় বাজার তৈরি করবে।
আমরা মনে করি, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক হওয়া উচিত প্রকৃত অর্থে ‘ট্রেড অ্যান্ড ট্রেড’ বা পারস্পরিক বাণিজ্যভিত্তিক সম্পর্ক। দুই দেশের ব্যবসায়ীরা একে অন্যের বাজারে আরো সক্রিয়ভাবে অংশ নেবেন এবং নতুন নতুন খাতে ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরি হবে।
এ জায়গায় বেসরকারি খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের বাণিজ্যিক যোগাযোগের বড় অংশ সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে। এখন সময় এসেছে ব্যবসায়ী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ আরো বাড়ানোর। সরকার নীতিগত সহায়তা ও প্রয়োজনীয় বাণিজ্যিক কাঠামো তৈরি করবে, আর ব্যবসায়ীরা সরাসরি বাজার, পণ্য, বিনিয়োগ ও অংশীদারত্বের সুযোগ খুঁজে নেবেন।
অর্থাৎ সরকার-টু-সরকার সম্পর্কের পাশাপাশি বিটুবি সহযোগিতাকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। বাংলাদেশের শিল্পগোষ্ঠীগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে হবে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোকেও বাংলাদেশের দ্রুত সম্প্রসারিত বাজার, উৎপাদন সক্ষমতা ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের সম্ভাবনা সম্পর্কে আরো বেশি তথ্য দিতে হবে।
বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানির সম্ভাবনাও বর্তমান অবস্থার তুলনায় অনেক বেশি। তৈরি পোশাকের বাইরে কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল, প্লাস্টিক, পাট ও পাটজাত পণ্যসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশের রফতানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে সক্ষমতা বাড়ানো গেলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরো শক্তিশালী করা সম্ভব।
এজন্য প্রয়োজন উপযুক্ত নীতিসহায়তা, বাজারে প্রবেশাধিকার, মাননিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন ও দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক পরিকল্পনা। শুধু শুল্ক সুবিধা পেলেই রফতানি বাড়বে না। পণ্যের মান, উৎপাদন সক্ষমতা, সময়মতো সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী পণ্য তৈরির সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগ করলে তারা শুধু বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে না। বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা ও ভৌগোলিক অবস্থান ব্যবহার করে দক্ষিণ এশিয়া ও আশপাশের বাজারেও ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ পেতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা ও বৈশ্বিক বাজারসংযোগ থেকে উপকৃত হতে পারে।
সঠিক নীতিসহায়তা, বাণিজ্য সুবিধা, বাজারে প্রবেশাধিকার ও যৌথ বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে আগামী বছরগুলোয় বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি রফতানি অর্জন করা সম্ভব। এটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য হলেও বাংলাদেশের বর্তমান শিল্প সক্ষমতা ও নতুন নতুন রফতানি খাতের সম্ভাবনা বিবেচনায় এটি অসম্ভব নয়।
তবে এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট হবে না। বেসরকারি খাতকেও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, নতুন পণ্য ও বাজার নিয়ে কাজ করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। চেম্বার ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
চট্টগ্রাম দেশের প্রধান বন্দরনগরী ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে এ সম্পর্কের সম্প্রসারণে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য, কাঁচামাল, জ্বালানি ও শিল্পের বিভিন্ন উপকরণ আমদানি এবং বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে কার্যকর সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরি করা গেলে চট্টগ্রামকে ঘিরে নতুন বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও তৈরি হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অন্যান্য বন্দর, লজিস্টিকস অবকাঠামো ও কাস্টমস ব্যবস্থাকে আরো দক্ষ করতে হবে।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি অর্থনৈতিক সম্পর্ক, যেখানে বাংলাদেশ শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য বিক্রি করবে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব গড়ে তুলবে। কৃষিপণ্য থেকে প্রযুক্তি, কাঁচামাল থেকে শিল্পযন্ত্র, পণ্য বাণিজ্য থেকে বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের ব্যবসায়ীরা যেন একে অন্যের শক্তিকে কাজে লাগাতে পারে, সে পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ আমি দেখি পারস্পরিক সম্মান, আস্থা এবং যৌথ স্বার্থের ভিত্তিতে। আমাদের বিশ্বাস, বাণিজ্যের ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা অবশ্যই থাকবে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ও পরিধি বাড়ানো। নতুন পণ্য, নতুন বাজার, নতুন বিনিয়োগ এবং নতুন ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব তৈরি করতে পারলে উভয় দেশই লাভবান হবে।
বাংলাদেশ যত বড় অর্থনীতিতে পরিণত হবে, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশের বাজারও তত বড় হবে। একইভাবে বাংলাদেশের শিল্প সক্ষমতা যত বাড়বে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের উপস্থিতিও তত বিস্তৃত হবে।










