লিভাই স্ট্রস অ্যান্ড কোম্পানির ২০২৫ অর্থবছরের হিসাবে, তাদের পণ্য এখন প্রায় ১২০টি দেশে বিক্রি হয়। ওই বছর কোম্পানিটির নিট রাজস্ব ছিল প্রায় ৬৩০ কোটি ডলার। বিশ্বের প্রায় ৩২টি দেশ থেকে স্বাধীন চুক্তিভিত্তিক প্রস্তুতকারকদের মাধ্যমে পণ্য সংগ্রহ করে লিভাইস। কোনো একক দেশ থেকে মোট সংগ্রহ ৩০ শতাংশের বেশি নয়।
এ বৈশ্বিক উৎপাদন মানচিত্রে বাংলাদেশের অবস্থানও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য এবং প্রাপ্ত বাণিজ্যিক ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, জিন্সসহ লিভাইসের অন্তত ২০ শতাংশ পোশাকের সরবরাহকারী বাংলাদেশ। তবে এ হিসাব লিভাইসের নিজস্ব প্রকাশিত দেশভিত্তিক উৎপাদন পরিসংখ্যান নয়। বরং বিভিন্ন উৎসের তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের সরবরাহ সক্ষমতার একটি চিত্র পাওয়া যায়।
চীনা পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান নিউএশিয়া গার্মেন্ট তাদের ওয়েবসাইটে লিভাইসের বৈশ্বিক ডেনিম উৎপাদন নেটওয়ার্ক নিয়ে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বাংলাদেশের অংশ আনুমানিক ২০ শতাংশ বলে উল্লেখ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, এ হিসাব ‘সোর্সিং ডেটা ও উৎপাদন অনুমান’ ভিত্তিতে করা। একই হিসাবে চীনের অংশ ২০-৩০ শতাংশ, ভারতের ১৫-২০, ভিয়েতনামের ১৫-২০ ও মেক্সিকোর ১০-১৫ শতাংশ বলা হয়েছে। নিউএশিয়া গার্মেন্ট নিজেদের লিভাইসের অংশীদার প্রস্তুতকারক হিসেবেও উল্লেখ করেছে।
বাংলাদেশের অবস্থানের পক্ষে অবশ্য লিভাইসের নিজস্ব নথিও রয়েছে। কোম্পানির ২০২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে প্রায় ৩২টি দেশ থেকে স্বাধীন চুক্তিভিত্তিক প্রস্তুতকারকদের মাধ্যমে পণ্য সংগ্রহের কথা বলা হয়েছে। লিভাইসের প্রকাশিত সরবরাহকারী মানচিত্র ও কারখানা তালিকায় বাংলাদেশের একাধিক কারখানার নাম রয়েছে। ২০১৭ সালে কোম্পানির এক প্রকাশনায় বাংলাদেশে ১৬টি সরাসরি সোর্সিং কারখানার সঙ্গে কাজ করার তথ্যও দেয়া হয়েছিল।

সাম্প্রতিক আমদানি তথ্য বাংলাদেশের অবস্থানকে আরো দৃশ্যমান করে। বাণিজ্য ও সরবরাহ ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ট্যারিফলোর ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের তথ্যানুযায়ী, লিভাই স্ট্রসের ১ হাজার ২০৫টি ইনবাউন্ড শিপমেন্টের ২৬৮টির উৎস ছিল বাংলাদেশ। অর্থাৎ চালানের সংখ্যার হিসাবে বাংলাদেশের অংশ ২২ দশমিক ২ শতাংশ। এ হিসাবে শ্রীলংকার পর বাংলাদেশ ছিল লিভাই স্ট্রসের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস। তবে এ ২২ দশমিক ২ শতাংশ চালানের সংখ্যা দিয়ে হিসাব করা; পণ্যের মূল্য, ওজন কিংবা উৎপাদনের অংশ নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি নথিতেও বাংলাদেশের কারখানা থেকে লিভাইসের জিন্স যাওয়ার সরাসরি প্রমাণ রয়েছে। বাণিজ্য তথ্যভাণ্ডার সিয়ারের নথিতে বাংলাদেশের রেফাত গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন প্রস্তুতকারকের কাছ থেকে লিভাই স্ট্রসের জন্য নারীদের ডেনিম জিন্স এবং পুরুষ ও নারীদের ডেনিম প্যান্ট যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর তথ্য রয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের সরবরাহে লিভাইসের মূল ডেনিম পণ্যও রয়েছে।
এ অবস্থান অবশ্য একদিনে তৈরি হয়নি। কয়েক দশকে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প মূলত কম শ্রমমূল্যের সুবিধা থেকে বেরিয়ে উৎপাদন সক্ষমতা, কারখানার নিরাপত্তা, পরিবেশগত মান, পণ্যের বৈচিত্র্য ও বড় অর্ডার সামলানোর সক্ষমতায় বিনিয়োগ করেছে। বিশেষ করে ডেনিমে বাংলাদেশ এখন শুধু কাটিং ও সেলাইয়ের বাজার নয়; সুতা, কাপড়, ওয়াশিং, ডায়িং এবং ফিনিশিংসহ ক্রমবর্ধমান সমন্বিত উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন বা লিড সনদ পাওয়া বিশ্বের বিপুলসংখ্যক সবুজ পোশাক কারখানার একটি বড় অংশও বাংলাদেশে। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে উৎপাদন সক্ষমতার পাশাপাশি পরিবেশগত ও সামাজিক কমপ্লায়েন্সের দিক থেকেও দেশের অবস্থান বদলেছে।
এ রূপান্তরের অর্থনৈতিক তাৎপর্য শুধু একটি ব্র্যান্ডের সরবরাহকারী হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের বড় অর্ডার সামলাতে যে ধরনের দক্ষতা, প্রযুক্তি, মান নিয়ন্ত্রণ ও সময়ানুবর্তিতা প্রয়োজন, তা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের সক্ষমতারও একটি সূচক। একই সঙ্গে স্থানীয় কারখানাগুলো ক্রমেই উচ্চমূল্যের ডেনিম ও নন-কটন পণ্যে যাওয়ার চেষ্টা করছে, যাতে শুধু শ্রমমূল্যের ওপর নির্ভর না করে প্রযুক্তি, নকশা ও উৎপাদন দক্ষতার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতা করা যায়।
লিভাইসের মতো ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রেও সামনে তাই সম্ভাবনার জায়গাটি বড়। বাংলাদেশ এরই মধ্যে তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। অবকাঠামো, জ্বালানি, বন্দর, বাণিজ্যনীতি ও অর্থায়নের পরিবেশ আরো প্রতিযোগিতামূলক করা গেলে এবং বৈশ্বিক ক্রেতারা দীর্ঘমেয়াদি অর্ডার ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা অব্যাহত রাখলে এ সক্ষমতা আরো বাড়তে পারে। তখন লিভাইসের বড় সরবরাহকারী থেকে সবচেয়ে বড় সরবরাহকারীতে পরিণত হওয়ার পথটিও বাংলাদেশের জন্য অস্বাভাবিক কোনো সম্ভাবনা হবে না।





