বিশেষ করে উচ্চমানের খাদ্যপণ্যের চাহিদার কারণে বাজারটিতে বাংলাদেশের খাদ্যপণ্যের আরো বড় পরিসরে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে।

স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজের খাদ্যপণ্য রফতানির প্রায় ১৮-২০ শতাংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে। প্রায় ২০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে খাদ্যপণ্য রফতানি করছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে বর্তমান রফতানির তুলনায় এ বাজার আরো অনেক গুণ সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম শীর্ষ রফতানি গন্তব্য।

বাজারটির গুরুত্বের জায়গাটিও আলাদা। মধ্যপ্রাচ্যের বাজারের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চমানের পণ্যের চাহিদা বেশি। ফলে যুক্তরাষ্ট্র শুধু একটি বড় বাজার নয়, মূল্য বিবেচনায়ও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজের যুক্তরাষ্ট্রে রফতানীকৃত পণ্যের প্রায় ৫০ শতাংশই রাঁধুনী ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত গুঁড়া মসলা।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশী মসলার চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ চাহিদা শুধু বাংলাদেশী ভোক্তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সাম্প্রতিক বিভিন্ন বাজার পরিদর্শনেও দেখা গেছে, উপমহাদেশের অন্যান্য দেশের মানুষ এবং আরবীয় ভোক্তা-শ্রেণীর মধ্যে এসব পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। অর্থাৎ বাংলাদেশী কমিউনিটির বাইরে অন্য ভোক্তাদের মধ্যেও বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাবনাময় বাজারের তুলনায় বাংলাদেশের রফতানীকৃত পণ্যের পরিমাণ এখনো অনেক কম। এ বাজারের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে নীতিগত সহায়তা, খাদ্যপণ্যের মান নিশ্চিত করার সক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বাড়ানো জরুরি।

সুগন্ধি চালে নীতিগত সহায়তার প্রয়োজন

স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজের অন্যতম চাহিদাসম্পন্ন পণ্য চাষী চিনিগুঁড়া সুগন্ধি চাল, যা তিন-চার বছর ধরে রফতানি বাজারে নিয়মিতভাবে সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। সুগন্ধি চাল রফতানির ক্ষেত্রে নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও নিয়মিত রফতানি নিশ্চিত করা যায়নি। এ সুযোগে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলো রফতানির বাজার দখল করে নিচ্ছে। আরো উল্লেখ্য, বাজারে আমাদের পণ্যের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহে ঘাটতি থাকায় প্রতিবেশী দেশ থেকে চাষী ব্র্যান্ডের নকল পণ্য রফতানি হচ্ছে।

সুগন্ধি চালের রফতানির ক্ষেত্রে নীতিগত সহায়তা পাওয়া গেলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে খাদ্যপণ্য রফতানি আরো বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে রফতানি নীতিতে সামঞ্জস্যতা ও ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নীতির পরিবর্তনের ফলে দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের ওপর প্রভাব পড়ে।

কঠোর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থায় সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ

যুক্তরাষ্ট্রের বাজার খাদ্যপণ্য রফতানির অন্যতম পূর্বশর্ত হলো কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ। এখানে রফতানি করতে হলে ইউএস এফডিএ গাইডলাইন অনুসরণ করে রফতানিকারকদের উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণে সর্বোচ্চ গুণগতমান নিশ্চিত করতে হয়। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে খাদ্যপণ্য রফতানির ক্ষেত্রে রেডিয়েশন সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে মসলা রফতানির জন্য রেডিয়েশন প্রক্রিয়ায় স্টেরিলাইজেশন করার প্রয়োজন হয়। কিন্তু কয়েক বছর ধরে সরকারি রেডিয়েশন প্লান্টের মূল ইউনিট আংশিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ থাকায় রফতানিকারকরা এ সেবা নিয়ে সমস্যায় ছিলেন। রেডিয়েশন সুবিধা বাড়ানো গেলে খাদ্যপণ্য রফতানিকারকদের জন্য তা বড় সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

খাদ্যপণ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো লাখ লাখ ভোক্তার সঙ্গে কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অভিবাসী ও শিক্ষার্থী রয়েছেন। পাশাপাশি উপমহাদেশের অন্য দেশের মানুষও গুণগতমানের কারণে বাংলাদেশী পণ্য গ্রহণ করছেন। ফলে ভোক্তার পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রফতানি সম্প্রসারণের সুযোগও বাড়ছে।

বাংলাদেশের খাদ্যপণ্য রফতানির সামগ্রিক চিত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের পাশাপাশি কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ খাতের সম্ভাবনাকেও বড় করে দেখার সুযোগ আছে। বাংলাদেশ কৃষিভিত্তিক দেশ হওয়ায় এ খাতে আরো বড় পরিসরে রফতানি সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব।

বর্তমানে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত রফতানি প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা একসময় ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়ালেও পরে আবার কিছুটা কমেছে। অথচ সমন্বিত রফতানি নীতিমালা যথাযথভাবে প্রনয়ণ করা গেলে কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত পণ্য থেকেই বছরে ৪-৫ বিলিয়ন ডলার রফতানির সুযোগ রয়েছে।

প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে। এসব দেশ প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, শুকনো ফলসহ বিভিন্ন কৃষিভিত্তিক পণ্য রফতানি থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলার আয় করছে। এসব পণ্য বাংলাদেশেও উৎপাদন পরবর্তী পর্যায়ে প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব। ফলে বাংলাদেশেরও এ খাতে আরো বড় পরিসরে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের ফল শুকিয়ে ও টিনজাত করে রফতানির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের খাদ্যপণ্য রফতানিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারকে দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার জায়গা হিসেবে দেখা উচিত। প্রায় ২০ বছরের রফতানি অভিজ্ঞতার পরও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের খাদ্যপণ্যের অবস্থান এখনো খুব বেশি বড় নয়। তবে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির এ বাজারে বাংলাদেশের খাদ্যপণ্যের জন্য সম্ভাবনার পরিসর অনেক বড়। এ সুযোগ আমাদের কাজে লাগাতে হবে।

লেখক: প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড