অন্তর্বাস, জিন্স, পোশাক, আনুষঙ্গিক পণ্য, গৃহসজ্জা ও সুগন্ধি পণ্যের বিস্তৃত পরিসর নিয়ে গড়ে ওঠা ব্র্যান্ডটির ২০২৪ সালে বৈশ্বিক খুচরা বিক্রি ছিল প্রায় ৯০০ কোটি ডলার। ক্যালভিন ক্লেইন, ক্যালভিন ক্লেইন জিন্স, ক্যালভিন ক্লেইন আন্ডারওয়্যার ও ক্যালভিন ক্লেইন পারফিউমসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ড লাইনের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে ব্যবসা করছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০০৩ সালে ক্যালভিন ক্লেইন অধিগ্রহণ করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পিভিএইচ করপোরেশন।
ব্যান্ডের নাম বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ায় ক্যালভিন ক্লেইনকে বিস্তৃত বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হয়েছে। আর সেই ব্যবস্থার অংশ এখন বাংলাদেশও। পিভিএইচের নিজস্ব ২০২৪ সালের করপোরেট দায়িত্বশীলতা সংক্রান্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই বছর স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশে ছিল ৭৪টি সরবরাহকারী কারখানা। এসব কারখানায় প্রাথমিকভাবে ৫ হাজার ৭১৪টি স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যা চিহ্নিত হয়েছিল এবং বছরের শেষে সেগুলোর ৯৩ শতাংশের প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা সম্পন্ন হয়েছিল।
এ ৭৪টি কারখানাকে সরাসরি ক্যালভিন ক্লেইনের ৭৪ সরবরাহকারী বলা যাবে না। কারণ পিভিএইচের প্রধান দুটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ড ক্যালভিন ক্লেইন ও টমি হিলফিগার এবং একই সরবরাহ নেটওয়ার্ক উভয় ব্র্যান্ডের জন্য ব্যবহৃত হয়। তবে বাংলাদেশ যে পিভিএইচের দীর্ঘদিনের সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ। কোম্পানির নিজস্ব তথ্যেই তা বলা হয়েছে।
পিভিএইচের বৈশ্বিক ব্যবসার আকার হাজার কোটি ডলারের কাছাকাছি। ২০২৫ সালে পিভিএইচের আয় ছিল ৮৯৫ কোটি ডলার। প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ২৮ হাজার কর্মী রয়েছে। ৪০টির বেশি দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করে তারা। কোম্পানিটির মোট রাজস্বের ৭০ শতাংশের বেশি যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থেকে এসেছে। ক্যালভিন ক্লেইন ও টমি হিলফিগারকে কেন্দ্র করেই পিভিএইচের বৈশ্বিক ব্যবসার মূল কাঠামো গড়ে উঠেছে।
ক্যালভিন ক্লেইনের সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশের অবস্থানকে শুধু পোশাক রফতানির পরিসংখ্যান দিয়ে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। নিউইয়র্কে একটি বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের পণ্য উন্নয়ন ও সোর্সিং কাঠামোর সঙ্গে ঢাকার একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ তৈরি হয়েছে। এর মাধ্যমে পিভিএইচের বাংলাদেশভিত্তিক সরবরাহকারী কারখানাগুলো বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থার অংশ হয়ে কাজ করছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য এ সংযোগের আরেকটি গুরুত্ব রয়েছে। দীর্ঘদিন দেশের প্রধান প্রতিযোগিতামূলক শক্তি ছিল তুলনামূলক কম খরচে বেশি পরিমাণে মৌলিক পোশাক উৎপাদন। কিন্তু ক্যালভিন ক্লেইনের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের জন্য কাজ করার ক্ষেত্রে শুধু উৎপাদনের পরিমাণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নির্দিষ্ট মান বজায় রাখা, পণ্যের বৈচিত্র্য, উন্নত কাপড় ও উপকরণ ব্যবহার, বিশেষ ফিনিশিং, নমুনা তৈরির সক্ষমতা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ।
ক্যালভিন ক্লেইনের পণ্যভাণ্ডারও সেই পরিবর্তনের সুযোগটি বোঝায়। ব্র্যান্ডটি নিজেদের পণ্যকে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পোশাক থেকে বৈশ্বিক ফ্যাশন পণ্যে উন্নীত করার ওপর গুরুত্ব দেয়। কোম্পানির ভাষ্য অনুযায়ী, ক্যালভিন ক্লেইনের পণ্যে দায়িত্বশীল নকশা, উচ্চমানের নির্মাণ এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যবহারের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয়া হয়। আর বাংলাদেশ তৈরি পোশাক শিল্প এখন এসব উৎকর্ষ ও গুনমানের নিশ্চিত করতে পারছে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে এরই মধ্যে এসব সক্ষমতার বেশ কিছু ভিত্তি তৈরি হয়েছে। ডেনিম, নিট, ওভেন, অন্তর্বাস, স্পোর্টসওয়্যারসহ বিভিন্ন ধরনের পোশাক উৎপাদনের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব কারখানা, আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি ও স্থানীয় বস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতাও বাড়ছে। ফলে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য তৈরি করার পরিসরও আগের তুলনায় বিস্তৃত হচ্ছে।
পিভিএইচের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সরবরাহকারী কারখানাগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতির যে চিত্র পাওয়া যায়, সেটিও এ পরিবর্তনের একটি দিক। ৭৪টি কারখানায় চিহ্নিত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যার ৯৩ শতাংশের প্রতিকার সম্পন্ন হওয়া শুধু কমপ্লায়েন্সের বিষয় নয়, বৈশ্বিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের উৎপাদন ভিত্তির গ্রহণযোগ্যতারও একটি সূচক।
তবে বাংলাদেশের সামনে এখন বড় প্রশ্ন হলো কতটা বেশি মূল্য দেশে রাখা সম্ভব। একটি পোশাকের কেবল সেলাই ও সংযোজনের পরিবর্তে কাপড়, সুতা, রং, ফিনিশিং, নকশা, পণ্য উন্নয়ন ও অন্যান্য ধাপ দেশে যুক্ত করা গেলে রফতানি মূল্যের বড় অংশ স্থানীয়ভাবে ধরে রাখা সম্ভব। একই সঙ্গে ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি হলে নতুন পণ্য ও উচ্চ মূল্যের অর্ডার পাওয়ার সুযোগও বাড়বে।
এখানেই ক্যালভিন ক্লেইনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের তাৎপর্য। নিউইয়র্কে জন্ম নেওয়া একটি মার্কিন ব্র্যান্ডের প্রায় ৯০০ কোটি ডলারের বৈশ্বিক খুচরা ব্যবসার পেছনের সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশ এখন একটি সোর্সিং হাব।
সাধারণ পোশাকের বড় উৎপাদন হাব থেকে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চমূল্যের বৈশ্বিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডের সরবরাহ অংশীদার হয়ে ওঠার এ পথ বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের পরবর্তী সম্ভাবনাটিও দেখিয়ে দিচ্ছে। নীতি সহায়তা, প্রযুক্তি ও দক্ষতায় বিনিয়োগ এবং মার্কিন ক্রেতাদের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে ক্যালভিন ক্লেইনের মতো ব্র্যান্ডের সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশের অবস্থান শুধু আরো বিস্তৃতই নয়, আরো বেশি মূল্য সংযোজনের দিকেও যেতে পারে।










