বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, কর্মসংস্থান ও শিল্প সহযোগিতা এখন এ সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমার বিশ্বাস, আগামী দিনের বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা এখানেই।

আমি মনে করি, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে এখন একটি নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। এ সম্পর্ক এমন হতে হবে, যেখানে দুই দেশই সমানভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ পাবে। একপক্ষীয় বাণিজ্য সুবিধা কিংবা সহায়তানির্ভর সম্পর্কের পরিবর্তে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত পারস্পরিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ওপর দাঁড়ানো একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব।

এক্ষেত্রে একটি আধুনিক ও ভারসাম্যপূর্ণ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিতে পারে। এর মাধ্যমে শুধু পণ্য বাণিজ্য বাড়বে না; যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ বাংলাদেশে আসার সুযোগ তৈরি হবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থানান্তর বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্প সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে। অর্থাৎ বাণিজ্যকে শুধু পণ্য কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলের বৃহত্তর অংশীদারত্বে নিয়ে যেতে হবে।

মেঘনা গ্রুপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্কের অভিজ্ঞতা থেকে আমি সম্ভাবনাটি খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। মেঘনা গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ সয়াবিন বীজ আমদানি করে আসছে। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এ আমদানি আরো বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে আমরা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইউএস সয়াবিন এক্সপোর্ট কাউন্সিলের সঙ্গে বড় অংকের আগ্রহপত্র ও সরবরাহসংক্রান্ত সমঝোতায় যুক্ত আছি।

আমাদের কাছে এটি শুধু একটি বাণিজ্যিক চুক্তি নয়। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষক ও বাংলাদেশের শিল্প খাতের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি হয়েছে। এক দেশের কৃষিপণ্য অন্য দেশের শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে এবং এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে একটি সরাসরি অর্থনৈতিক সংযোগ তৈরি হচ্ছে। আমি মনে করি, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যিক সম্পর্কের ধরন এমনই হওয়া উচিত।

এ অংশীদারত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মেঘনা গ্রুপ বাংলাদেশের প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘টেকসই মার্কিন সয়াবিন’ লেবেল অর্জন করেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এ স্বীকৃতি পেয়েছে। আমরা এটিকে শুধু একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখি না, বরং দায়িত্বশীল ও টেকসই ব্যবসা পরিচালনার প্রতি আমাদের অঙ্গীকারের প্রতিফলন হিসেবে দেখি।

বিশ্বে খাদ্য, পশুখাদ্য ও ভোজ্যতেল শিল্পে এখন কাঁচামালের গুণগত মানের পাশাপাশি তার উৎস ও উৎপাদন প্রক্রিয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একটি পণ্য কীভাবে উৎপাদন হয়েছে, পরিবেশের ওপর তার প্রভাব কতটা, কৃষিজমি ও পানির ব্যবহার কতটা দায়িত্বশীল এবং সরবরাহ ব্যবস্থা কতটা স্বচ্ছ, আন্তর্জাতিক বাজারে এসব বিষয় ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে।

এ জায়গায় ‘মার্কিন সয়াবিন টেকসই নিশ্চয়তা প্রটোকল’ একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এর আওতায় পরিবেশবান্ধব চাষাবাদ, মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ, পানির দক্ষ ব্যবহার, বায়ুর মান রক্ষা ও দায়িত্বশীল ভূমি ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী যাচাই করা হয়। ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিশ্চিত হতে পারে যে তারা নিরাপদ, মানসম্মত ও টেকসই উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করছে।

আমাদের জন্য এর গুরুত্ব আরো বেশি। কারণ ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য শুধু পণ্যের দামে বা গুণমানে প্রতিযোগিতা করবে না; পণ্যটি কতটা টেকসইভাবে উৎপাদন হয়েছে এবং পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল কতটা দায়িত্বশীল, সেটিও প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে। সেই দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষক এবং বাংলাদেশের শিল্প খাতের এ অংশীদারত্ব ভবিষ্যতের বাণিজ্যের একটি সম্ভাব্য মডেল হতে পারে।

তবে সয়াবিনের মধ্যেই আমাদের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমানে আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরো বেশি কৃষিপণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানির সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছি। ভুট্টা আমদানির উদ্যোগ রয়েছে। পাশাপাশি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, এলপিজি, পেট্রোকেমিক্যাল এবং শিল্প-কারখানায় ব্যবহৃত আধুনিক যন্ত্রপাতি ও ইকুইপমেন্ট আমদানির ক্ষেত্রেও বড় সুযোগ রয়েছে।

মেঘনা গ্রুপের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত আধুনিক যন্ত্রপাতির একটি অংশ এরই মধ্যে আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে সংগ্রহ করছি। আমাদের গ্লাস ফ্যাক্টরিসহ বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে উন্নত প্রযুক্তি ও মানসম্মত যন্ত্রপাতি প্রয়োজন। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে। এর মধ্য দিয়ে শুধু পণ্য আমদানি হচ্ছে না; প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গেও বাংলাদেশের শিল্প খাতের একটি সংযোগ তৈরি হচ্ছে।

খাদ্যপণ্য আমদানির ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র আমাদের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। আমরা শিল্প-কারখানায় ব্যবহারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে উচ্চমানের গম আমদানি করি, যা বিশেষ করে বেকারি ও বিভিন্ন খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে ব্যবহার হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যের গুণগত মান আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। ফলে কৃষি ও খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি এবং প্রযুক্তি আমদানিতেও দুই দেশের বাণিজ্য আরো সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

তবে এ সম্ভাবনাকে বাস্তব বাণিজ্যে রূপ দিতে হলে কিছু বাধা দূর করতে হবে। পণ্যের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে আমদানি প্রক্রিয়াকে আরো সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করতে হবে। ব্যবসায়ীদের জন্য লেনদেনের খরচ কমানো এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরো দক্ষ করা গেলে দুই দেশের বাণিজ্য অনেক বাড়তে পারে।

আরেকটি বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে পণ্য আমদানি করতে হয়। এর পরিবর্তে বাংলাদেশের সক্ষম শিল্পগোষ্ঠীগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরাসরি আমদানিতে উৎসাহিত করা গেলে উভয় দেশই লাভবান হবে। এতে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যস্বত্বভোগী ব্যয় কমবে, সরাসরি সরবরাহকারীদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের রফতানিকারকরাও বাংলাদেশের বাজারে সরাসরি প্রবেশের সুযোগ পাবেন। ফলে দুই দেশের প্রকৃত বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরো গভীর হবে।

আমাদের অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস এবং সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসায়িক যোগাযোগ ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। বাজারসংক্রান্ত তথ্য, সম্ভাবনাময় পণ্য, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে তারা বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দুই দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্প খাতের মধ্যে মতবিনিময় ও সহযোগিতাও বেড়েছে।

আমার বিশ্বাস, আগামী দিনের বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক হবে আরো গভীর, বহুমাত্রিক ও পারস্পরিক লাভজনক। শুধু বাণিজ্য নয়, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, টেকসই কৃষি, জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের আধুনিকায়নেও দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।

একটি শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে ওঠে উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা-চেতনা, বিনিয়োগ ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র যদি একই দর্শন নিয়ে আগামী দিনের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে পারে, তাহলে দুই দেশের জন্যই নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে।

আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি সম্পর্ক, যেখানে বাংলাদেশ শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য রফতানি করবে না; বরং যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজি, প্রযুক্তি, কৃষি, জ্ঞান ও শিল্প সক্ষমতার সঙ্গে বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা ও উদ্যোক্তা শক্তির সংযোগ ঘটবে। একইভাবে বাংলাদেশের দ্রুত বিকাশমান বাজার ও উৎপাদন সক্ষমতাও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে।

আমি মনে করি, এ পারস্পরিক স্বার্থের জায়গাটিই বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ভবিষ্যৎ। বাণিজ্যকে যদি আমরা বিনিয়োগের সঙ্গে, বিনিয়োগকে প্রযুক্তির সঙ্গে এবং প্রযুক্তিকে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করতে পারি, তাহলে আগামী দশক দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।