দুবাইয়ের একটি সুপার মার্কেটের তাক থেকে বাংলাদেশের জন্য খুলে যেতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের আরো বড় বাজারের দরজা। শুধু তৈরি পোশাক নয়, তাজা ফল ও সবজি, মাংস, সামুদ্রিক পণ্য, ইলেকট্রনিকস, গৃহস্থালি সরঞ্জামসহ বহুমুখী পণ্য নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অন্যতম বড় খুচরা বিক্রেতা লুলু হাইপার মার্কেটের আগ্রহ সেই সম্ভাবনাকেই সামনে আনছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে জেবেল আলীভিত্তিক বৈশ্বিক লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক। ফলে ইউএইকে শুধু একটি রফতানি বাজার নয়, মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত বাজারে প্রবেশের বাণিজ্যিক সেতু হিসেবেও দেখার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও লুলু হাইপার মার্কেটের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে পণ্য সংগ্রহের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে তাজা ফল, সবজি, মাংস ও সামুদ্রিক পণ্য, ইলেকট্রনিকস ও গৃহস্থালি সরঞ্জাম, রান্নাঘর ও অন্যান্য গৃহস্থালি পণ্য সংগ্রহের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করে লুলু। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সহযোগিতা আরো গভীর করার আগ্রহের কথাও জানান।

ইউএইর বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের সম্ভাবনা অবশ্য একটি খুচরা বিক্রয় চেইনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মধ্যপ্রাচ্যের বড় ভোক্তা বাজারগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি দেশগুলোতে কর্মরত বাংলাদেশী জনশক্তি। ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‌মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের অবশ্যই বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে বাণিজ্যের মূল শক্তি হলো আমাদের জনশক্তি। সেখানে সৌদি আরব, আরব আমিরাত বা ওমানে প্রায় ৪০-৫০ লাখ বাংলাদেশী কাজ করছেন। বাংলাদেশ থেকে যেসব কৃষিপণ্য বা অন্যান্য পণ্য রফতানি করা হয়, তা মূলত এ প্রবাসীরাই ভোগ করে থাকেন।’

প্রবাসী জনগোষ্ঠীর এ বাজারের বাইরে সামনে আসছে বৃহৎ অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নতুন সুযোগও। বিশেষ করে সৌদি আরবকে ঘিরে আগামী দশকের বড় আয়োজনগুলো বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান। তার ভাষায়, ‘‌২০৩০ সালে রিয়াদে এক্সপো এবং ২০৩৪ সালে সৌদি আরবে ফুটবল বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে তারা আট-নয়টি নতুন স্টেডিয়ামসহ বিশাল অবকাঠামোগত নির্মাণকাজ শুরু করছে। কাতারে বিশ্বকাপের কারণে অর্থনৈতিক অগ্রগতি হলেও সৌদি আরবে তার চেয়ে বহু গুণে বেশি প্রবৃদ্ধি হবে।’

এ বৃহৎ আঞ্চলিক সম্ভাবনার সঙ্গে ইউএইর বাজারসংযোগকে একসঙ্গে বিবেচনা করলে লুলুর মতো খুচরা চেইনের গুরুত্ব আরো স্পষ্ট হয়। ইউএইতে প্রবেশ করতে পারলে বাংলাদেশী পণ্যের জন্য শুধু একটি দেশের ভোক্তা বাজার নয়, বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের বাজারেও পরিচিতি তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। খাদ্য, কৃষি ও সামুদ্রিক পণ্যের পাশাপাশি ভোগ্যপণ্য ও অন্যান্য পণ্যের সরবরাহ বাড়ানোর মাধ্যমে তৈরি পোশাকনির্ভর রফতানি কাঠামোর বাইরে যাওয়ার সুযোগও তৈরি হবে।

তবে দুই দেশের বাণিজ্য এখনো ভারসাম্যপূর্ণ নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাবে, ওই বছর ইউএই থেকে বাংলাদেশ প্রায় ১৪৮ কোটি ৫৬ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে ইউএইতে রফতানি হয়েছে প্রায় ৩৫ কোটি ১৫ লাখ ডলারের পণ্য। আগের অর্থবছরে ইউএই থেকে আমদানি ছিল প্রায় ১৩৫ কোটি ২৯ লাখ ডলার, আর রফতানি ছিল প্রায় ৪০ কোটি ৫১ লাখ ডলার। ফলে বাণিজ্য ব্যবধান কমাতে বাংলাদেশের জন্য রফতানি বাড়ানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

এক্ষেত্রে বাজারে প্রবেশের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ। দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের জেবেল আলীবন্দর ও বৈশ্বিক লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের জন্য সেই সংযোগের একটি সম্ভাব্য অবকাঠামো তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানটির নৌ-পরিবহন নেটওয়ার্কে জেবেল আলীর সঙ্গে চট্টগ্রামসহ এশিয়ার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বন্দর যুক্ত রয়েছে। ২০২৪ সালে ডিপি ওয়ার্ল্ড পাকিস্তানের ন্যাশনাল লজিস্টিকস করপোরেশনের সঙ্গে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সরাসরি নৌসেবা চালু করে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, করাচি-চট্টগ্রাম সরাসরি সংযোগে পরিবহন সময় ৫০ শতাংশের বেশি কমেছে।

অর্থাৎ লুলু যেখানে বাংলাদেশের পণ্যের জন্য ভোক্তা বাজারের দরজা খুলতে পারে, ডিপি ওয়ার্ল্ড সেখানে পণ্য পরিবহনের আঞ্চলিক সংযোগকে শক্তিশালী করতে পারে। দুটির সমন্বিত ব্যবহার ইউএইকে বাংলাদেশের জন্য শুধু রফতানি গন্তব্য নয়, মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সেতুতে পরিণত করতে পারে।

এ সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাও জরুরি। ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যানের ভাষায়, ‘‌সেখানে বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠী থাকায় বাংলাদেশ এ বড় সুযোগটি গ্রহণ করতে পারে, তবে তার জন্য ওই অঞ্চলে শান্তি বজায় থাকা এবং যুদ্ধ বিগ্রহ না থাকা একটি বড় শর্ত। যুদ্ধ লাগলে এ সম্ভাবনা অর্জন করা দুরূহ হয়ে পড়ে।’

মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তাই শুধু কত পণ্য রফতানি করা যাবে, তার হিসাব নয়। প্রবাসী জনগোষ্ঠী, বড় অবকাঠামো বিনিয়োগ, খুচরা বাজারের সম্প্রসারণ এবং দ্রুততর লজিস্টিকস সংযোগ, সব মিলিয়ে এটি বাংলাদেশের রফতানি বহুমুখীকরণের একটি বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র। দুবাইয়ের একটি তাক সেই সম্ভাবনার দৃশ্যমান সূচনা হতে পারে।