বাংলাদেশ-সৌদি আরব বাণিজ্যের বর্তমান চিত্রটা কী? বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশ কীভাবে আরো রফতানি বাড়াতে পারে?
বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যবসা ও রফতানির অবস্থা আপনারা জানেন। ২০২৫-২৬ সালে বাংলাদেশ থেকে আমাদের আনুমানিক ১৫৫ মিলিয়ন ডলার রফতানি হয়েছে। সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে আসছে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ থেকে যেসব পণ্য গেছে, এগুলো মূলত তৈরি পোশাক। তার সঙ্গে গেছে কৃষি ও খাদ্যপণ্য, কিছু শাকসবজি, মাছ, কিছু জুস ও এ-জাতীয় সামগ্রী।
সৌদি আরব থেকে আসছে মূলত অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য, কেমিক্যাল চিপস, লুব্রিক্যান্ট পণ্য।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা ও সমর্থনে আমরা এটিকে তিন গুণ রফতানিতে নিয়ে যেতে চাই। এ তিন সংস্থার যৌথ উদ্যোগ, সহযোগিতা ও উৎসাহে আমরা সে লক্ষ্যেই কাজ করছি। সুতরাং আমাদের এখনকার স্লোগান হলো ‘তিন গুণ রফতানি, তিন গুণ প্রবৃদ্ধি’। ইনশাআল্লাহ, আগামী ৩-৯ অক্টোবর পর্যন্ত আমরা সৌদি আরবে বাণিজ্য উন্নয়ন মিশন ও পণ্য প্রদর্শনীর আয়োজন করতে যাচ্ছি। কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য রফতানি তিন গুণ করা এবং সে অনুযায়ী প্রবৃদ্ধি বাড়ানো।
প্রশ্ন আসতে পারে, তিন গুণ রফতানি কেন? বর্তমানে যে পর্যায়ে রফতানি রয়েছে, সেখান থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে তা ১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে, ইনশাআল্লাহ।
আমেরিকা ও ইউরোপের ওপর আমাদের যে নির্ভরশীলতা, সে নির্ভরশীলতা কমিয়ে অন্য দেশগুলোর ওপর বেশি রফতানির দিকে মনোযোগ দিচ্ছে সরকার। আমরা সৌদি আরবকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রফতানি গন্তব্য মনে করছি। এখানে ৩৫ লাখের ওপরে বাঙালি বাস করে। তাদের কাপড়চোপড়, থাকা, বাসস্থান, এগুলোর একটা বিরাট জোগান দরকার আছে। জোগানটা বাংলাদেশ কিন্তু সে পরিমাণে দিতে পারছে না। কারণ আমরা ওই ধরনের ভাবমূর্তি তৈরি করতে পারিনি, বাংলাদেশকে ব্র্যান্ড হিসেবে তুলে ধরতে পারিনি, আমাদের প্রচার-প্রসার হয়নি, চেম্বার অব কমার্স ছিল না।
এখন আমরা চেম্বার অব কমার্স হওয়ায় ব্যবসায়ী থেকে ব্যবসায়ী, অর্থাৎ রফতানিকারক ও আমদানিকারকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করছি। যোগাযোগ করে আমরা এসব জিনিস বাড়ানোর চেষ্টা করছি। আর বিকল্প বাজার হিসেবে আমরা এক নম্বর দেশ হিসেবে বিবেচনা করছি সৌদি আরবকে।
আর তৈরি পোশাকের ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা কমিয়ে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে, সৌদি আরবে আমরা অন্য পণ্যগুলোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। যেমন চামড়া, চা, কাঁচা চামড়ার পাশাপাশি খাদ্যদ্রব্য, কৃষি এবং খাদ্যপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, হিমায়িত মাছ, হস্তশিল্প এগুলোর ওপর আমরা জোর দিচ্ছি।
সৌদি বাজারে বাংলাদেশের এসব পণ্যের বিকাশে সবচেয়ে বড় বাধা কোনটা?
সম্ভাবনার বিকাশে কয়েকটি জায়গায় বাধা আছে। এর মধ্যে একটি হলো শুল্ক ও কর। এক্ষেত্রে সরকার রফতানিকারকদের বিশেষ সুবিধা দিতে পারে। পাশাপাশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য সুযোগ তৈরি করতে হবে।
ধরুন, কোনো একটি দেশ থেকে একটি প্রতিষ্ঠানের পণ্য সরবরাহের জন্য নিশ্চিত ঋণপত্র (এলসি) এল। সে পণ্য সরবরাহ করতে হলে প্রতিষ্ঠানের চলতি মূলধন প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক যদি বিশেষ নির্দেশনা দেয় যে নিশ্চিত ঋণপত্রের বিপরীতে রফতানিকারককে ঋণ বা চলতি মূলধন সুবিধা দেয়া যাবে, তাহলে প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারবে। এরপর সে পণ্য বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে রফতানি করা সম্ভব হবে।
দ্বিতীয় বিষয় হলো লজিস্টিক। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে লজিস্টিক খরচ অনেক বেড়ে গেছে। আগের মতো পরিবহন সুবিধাও এখন নেই। বর্তমানে যে লজিস্টিক সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে, তা ব্যবহার করতে হলে পণ্য পরিবহনে আগের তুলনায় বহুগুণ বেশি খরচ হচ্ছে।
আরেকটা হলো, সৌদি আরবে আমাদের কিছু গুদাম বা সংরক্ষণাগার দরকার। গুদাম করলে আমাদের পণ্যগুলো নিয়ে ওখানে সংরক্ষণ করা যাবে, পরবর্তী সময়ে সরবরাহ শৃঙ্খলের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছে দেয়া সম্ভব। আমাদের বেশ কয়েকজন সদস্য আছে, তাদের মধ্যে শপ-আপ অন্যতম। যারা সৌদি আরবে বড় ধরনের বাজার পরিবেশক। মক্কা মিউনিসিপাল করপোরেশন ও সরকার, অর্থাৎ ওই এলাকায় যত পণ্য যাবে, ওরা সরাসরি বাড়ি থেকে বাড়ি অথবা স্থান থেকে স্থানে সরবরাহ ও বিতরণ করবে। এটা আমরা কাজে লাগাতে পারলে সরবরাহ শৃঙ্খলের ভেতরে বড় ধরনের সুবিধা বা ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
এছাড়া প্রচারের জন্য ব্র্যান্ডিংও প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্র্যান্ডিং যত বেশি করা যাবে, তত বেশি মানুষ বাংলাদেশের পণ্যের প্রতি আগ্রহী হবে। আমাদের বাণিজ্য উন্নয়ন মিশন ও পণ্য প্রদর্শনীর মূল উদ্দেশ্য হলো সরাসরি বাজারের মূল পর্যায়ে পৌঁছানো।
আগে এ ধরনের কার্যক্রম একটি নির্দিষ্ট শহরকে কেন্দ্র করে হতো। যেমন জেদ্দা, মক্কা বা রিয়াদ। এবার আমরা সৌদি আরবের পাঁচটি চেম্বার অব কমার্সে যাচ্ছি—মক্কা, মদিনা, রিয়াদ, জেদ্দা ও দামামের ইস্টার্ন প্রভিন্স চেম্বার অব কমার্সে। আমাদের সদস্যরা সরাসরি এসব চেম্বারের সদস্যদের সঙ্গে বসবেন। সেখানে পণ্যের তালিকা ও নমুনা প্রদর্শন করা হবে। পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভাবনা নিয়ে সরাসরি আলোচনা হবে।
একটা চেম্বার অব কমার্সে যদি ৫০ জন সৌদি সদস্য হয়, পাঁচটা চেম্বারে ২৫০ জন সৌদি সদস্য আমাদের পণ্য, বাণিজ্য, বিনিয়োগের সুযোগ এবং দেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে পারবে। এটা আমরা মনে করি বিরাট একটি অর্জন। এর ১০ শতাংশ অর্জনও আমাদের জন্য অনেক বড় কিছু হবে।
সৌদি আরবের সঙ্গে বাণিজ্য শুধু পণ্যনির্ভর না রেখে সেবা খাতে সম্প্রসারণের সুযোগ কেমন? আর আগামী ৫-১০ বছরে বাংলাদেশ-সৌদি সম্পর্ককে কোন পর্যায়ে দেখতে চান?
এটার ওপর আমরা কাজ করছি। ভিশন ২০৩০, ওয়ার্ল্ড এক্সপো ২০৩০ ও ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ২০৩৪-এর মতো বড় বা বৈশ্বিক আয়োজনগুলো সৌদি আরবে হবে। আমাদের লক্ষ্য এসব অনুষ্ঠান। এ লক্ষ্যে আমরা এবার দুটি আয়োজনে অংশ নিচ্ছি। একটা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মিশন, আর অন্যটা ডিসেম্বরে জেদ্দা আন্তর্জাতিক কৃষি মেলা, যেখানে অর্থমন্ত্রী ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরসহ অন্যান্য উচ্চপর্যায়ের মানুষ যাবেন।
সেবা খাতে আমাদের সুযোগ ও সম্ভাবনা প্রচুর। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষ অনেক সময় স্বল্পমেয়াদে কীভাবে আয় করা যায়, সেটি নিয়েই বেশি চিন্তা করেন। দীর্ঘমেয়াদি সুযোগের দিকে তেমন নজর দেয়া হয় না। দীর্ঘমেয়াদি সুযোগের একটি উদাহরণ হলো বন ও মরুভূমি সবুজায়ন প্রকল্প। সৌদি আরব মরুভূমি ও শহরগুলোকে সবুজ করা ও বৃক্ষরোপণের জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। এ ধরনের প্রকল্পে বাংলাদেশও অংশগ্রহণ করতে পারে। আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো এ খাতে দক্ষতা ও সেবা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
আরেকটি বড় সম্ভাবনার জায়গা হলো অবকাঠামো উন্নয়ন। সৌদি আরবে বড় বড় জলাধার ও লেক খনন হচ্ছে। বিশ্বকাপ ও বিশ্বপ্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো উন্নয়ন চলছে। এছাড়া দেশটিতে প্রায় ১০ হাজার হোটেলের প্রয়োজন হবে। এসব নির্মাণকাজে বাংলাদেশ বিভিন্নভাবে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারে। আমরা নির্মাণসেবা দিতে পারি, রডসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ করতে পারি। এছড়া ব্যাংকিং, সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও আমাদের কাজের সুযোগ রয়েছে। এগুলোও সেবা রফতানির আওতায় পড়ে।
ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলংকা এমনকি নেপালের মতো দেশও সেবা খাত থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করছে। আমাদেরও এ খাতে সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সে পর্যায়ে যেতে হবে।










