দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানি সহযোগিতায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে জলবিদ্যুৎ বাণিজ্য। জলবিদ্যুৎ বাণিজ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করছে। ২০২৪ সালের ১৫ নভেম্বর নেপাল থেকে ভারতের সঞ্চালন লাইন ব্যবহার করে এ বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হয়। বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। এ বাস্তবতায় নেপালের উদ্বৃত্ত জলবিদ্যুৎ বাংলাদেশের জন্য পরিচ্ছন্ন ও তুলনামূলক কম কার্বন নির্গমনকারী বিদ্যুতের একটি সম্ভাবনাময় উৎস হয়ে উঠেছে।

প্রতি বছর ১৫ জুন থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত (বছরে পাঁচ মাস) ৪০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ আমদানি করবে বাংলাদেশ। ভারত হয়ে এ বিদ্যুৎ বাংলাদেশের গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। তবে সম্প্রতি নেপালে বন্যার কারণে এ সরবরাহ সাময়িকভাবে ব্যাহত রয়েছে। নেপাল-বাংলাদেশ বিদ্যুৎ বাণিজ্য সহযোগিতার অংশ হিসেবে ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাড়ানোর আলোচনা রয়েছে।

নেপাল থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানির আগে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বলতে ছিল কাপ্তাই হাইড্রো পাওয়ার। ২৩০ মেগাওয়াট সক্ষমতার এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র ১৯৫৬ খ্রিঃ তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের জন্য কর্ণফুলী নদীর ওপর বাঁধ দিয়ে তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়। ১৯৬২ সালে কেন্দ্রটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। মোট পাঁচটি ইউনিটের সক্ষমতা ২৩০ মেগাওয়াট। এখন পর্যন্ত দেশের জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র বলতে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র।

নেপালের জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা বিপুল। দেশটির পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি ও অসংখ্য নদী জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। কিন্তু অর্থায়ন, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের আকারের কারণে সম্ভাবনার তুলনায় উৎপাদন এখনো অনেক কম। ফলে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ আঞ্চলিক বাজারে রফতানির মাধ্যমে নেপাল যেমন বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে, তেমনি বাংলাদেশও আমদানি বিদ্যুতের দাম বিবেচনায় সাশ্রয়ী মূল্যে দেশটি থেকে বিদ্যুৎ কিনছে।

শুধু নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ বাণিজ্য রয়েছে বিষয়টি এমন নয়, বাংলাদেশ থেকে দেশটি তৈরি পোশাক, বস্ত্রজাত পণ্য, ওষুধ ও রাসায়নিক পণ্য, খাদ্য ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত পণ্যসহ বেশকিছু পণ্য আমদানি করে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে নেপালে বাংলাদেশের রফতানি হয়েছে ৩৫ দশমিক ৪০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের মধ্যে প্রধানত তৈরি পোশাক ও বস্ত্রজাত পণ্য, ওষুধ ও রাসায়নিক পণ্য, প্লাস্টিক ও প্লাস্টিকজাত পণ্য, কাগজ ও কাগজজাত পণ্য, খাদ্য ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত পণ্য, বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রিক্যাল সামগ্রী এবং বিভিন্ন শিল্পপণ্য রয়েছে। এর মধ্যে বস্ত্র ও পোশাক, ওষুধ এবং রাসায়নিকজাত পণ্য গুরুত্বপূর্ণ। ইপিবির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-জুন দেশভিত্তিক রফতানি তথ্যেই এ বাণিজ্য প্রবাহের হিসাব রয়েছে।

অন্যদিকে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নেপাল থেকে বাংলাদেশে আমদানির অর্থ পরিশোধ হয়েছে ৫ দশমিক ৫০ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের পণ্যভিত্তিক হিসাবে নেপাল থেকে আমদানিতে প্রস্তুত খাদ্য, পানীয় ও তামাকজাত পণ্য; উদ্ভিদ জাত পণ্য; রাসায়নিক ও রাসায়নিক শিল্পের পণ্য; বস্ত্র ও বস্ত্রজাত পণ্য; যন্ত্রপাতি ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম; কাগজ ও কাগজজাত পণ্য; প্লাস্টিক ও রাবারজাত পণ্য এবং খনিজ পণ্য রয়েছে। ফলে দুই দেশের বাণিজ্যে পণ্যের দিক থেকে বাংলাদেশ মূলত শিল্পজাত ও ভোগ্যপণ্য রফতানি করছে, আর নেপাল থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি আসছে কৃষি, খাদ্য ও কিছু শিল্পজাত পণ্য।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নেপাল থেকে আমদানি ৫ দশমিক ৫০ মিলিয়ন ডলার এবং নেপালে রফতানি ৩৫ দশমিক ৪০ মিলিয়ন ডলার হওয়ায় বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ২৯ দশমিক ৯০ মিলিয়ন ডলারে।

জ্বালানি সহযোগিতায় নেপাল থেকে বাংলাদেশে সরাসরি বিদ্যুৎ আনার সুযোগ নেই। দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সীমান্ত না থাকায় ভারতের ভূখণ্ড ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ-নেপাল বিদ্যুৎ বাণিজ্যের সঙ্গে ভারতও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতার মাধ্যমে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের ব্যবস্থা আরো বৃদ্ধি করা গেলে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের পরিধি আরো বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

নেপাল ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রফতানি শুরু করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ আমদানি বাবদ দেশটিকে পরিশোধ করেছে ১ কোটি ৫৮ লাখ ২৯ হাজার টাকা। নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি কার্যক্রম উদ্বোধন করেন বাংলাদেশের তৎকালীন বিদ্যুৎ-জ্বালানি উপদেষ্টা মো. ফাওজুল কবির খান এবং ভারতের বিদ্যুৎবিষয়ক মন্ত্রী মনোহর লাল ও নেপালের জ্বালানিমন্ত্রী দীপক খাডকা।

নেপাল ভারতের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশে ৪০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ রফতানি করবে। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হয় ৬ দশমিক ৪ সেন্ট (১০০ সেন্টে ১ ডলার)। বাংলাদেশী মুদ্রায় যা প্রায় সাড়ে ৭ টাকা।

এরই মধ্যে নেপাল থেকে বাংলাদেশে জলবিদ্যুৎ আমদানির উদ্যোগ দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়াতে হলে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি, সাশ্রয়ী মূল্য নির্ধারণ, সঞ্চালন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নিরবচ্ছিন্ন আন্তঃদেশীয় গ্রিড ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে মুদ্রা বিনিময়, অর্থ পরিশোধ ও বাণিজ্যিক ঝুঁকির বিষয়গুলোও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও নেপালের জলবিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের মতো উৎসের উৎপাদন আবহাওয়ানির্ভর হলেও জলবিদ্যুৎ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল সরবরাহ দিতে পারে। ফলে জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের অংশ বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহের ভারসাম্য রক্ষায় এটি সহায়ক হতে পারে।