ভারতের রিটেইল মার্কেটে পোশাক সরবরাহে আপনাদের অভিজ্ঞতা জানতে চাই।
ভারতে আমরা বাংলাদেশ থেকে পোশাক রফতানি করি। দেশটিতে অনেক আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের উপস্থিতিও আছে। উদাহরণস্বরূপ, ইন্ডিটেক্সের জারা, এইচঅ্যান্ডএম, অ্যাডিডাস, নাইকিসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দোকান আছে। তারা যখন বাংলাদেশ থেকে অর্ডার দেয়, সেটা কেন্দ্রীয়ভাবেই দেয়।
ওই অর্ডারের একটা অংশ ইউরোপে চলে যায়। একই স্টাইল, একই পণ্য আমেরিকা, ইউরোপে যায়, আবার ভারতেও যায়। ভারতীয় বাজারের জন্য, অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্যও যায়। আবার একই পণ্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যায়। অর্ডারগুলো এভাবেই দেয়া হয়।
ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারের আকার কিন্তু বিশাল। এখন এর মূল্য ১৬০ থেকে ১৯০ বিলিয়ন ডলার। ভুল না হলে ২০৩০ সালের প্রক্ষেপণ ২৮০ থেকে ৩০০ বিলিয়ন ডলার হবে। তাদের ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণী, তাদের অর্থনীতির যে শক্তি, সবকিছু মিলিয়ে এটা একটা বিশাল বাজার। এ জিনিসটাই আমরা হারাচ্ছি।
হারাচ্ছি কী জন্য? ভারতে এখন অনেক অর্ডার, রফতানি অর্ডার বাংলাদেশ থেকে ভারতে যেতে পারে। তাদের ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আছে, তারপর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির জন্য আলোচনা করছে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতেও যাচ্ছে। এটা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের রফতানির জন্য হুমকি তৈরি করলেও ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজার বাংলাদেশের জন্য একটা উন্মুক্ত, বিশাল সুযোগ। এ জিনিসটাই আমরা হারাচ্ছি।
ভারতে সরাসরি রফতানি কীভাবে বাড়ানো যেতে পারে?
এখানে যেমন কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (সেপা) নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সাফটার আওতায় আমি যখন ভারতে রফতানি করতাম, আমি প্রণোদনা পেতাম, প্রণোদনা দাবি করতাম। এখন সমস্যা যেটা হয়েছে, সাম্প্রতিক দুই বছরে যে রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলো এসেছে, ভারতের সঙ্গে কিছু নীতিগত অগ্রগতি হওয়ার কথা ছিল। সেখানে নীতি বা সীমান্ত বন্ধ করে ব্যবসাটাকে অনেক বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে।
যে প্রবৃদ্ধিটা আমাদের ছিল, ভারত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছিল কখন? ওই কভিডের সময়। ওই সময় আমরা দেখছিলাম পশ্চিমা দেশগুলো থেকে অর্ডার কমে যাচ্ছিল। তখন ভারতে তাদের যেমন টাটা, রিলায়েন্স, তাদের যেসব ব্র্যান্ড আছে, যেসব সুপারশপ আছে, ওখান থেকে বাংলাদেশে অর্ডার দেয়া শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড বাদ দিয়ে ভারতের স্থানীয় যে ব্র্যান্ডগুলো আছে, তারাও বাংলাদেশ থেকে অর্ডার নিত।
তখন যখন সরবরাহ ব্যবস্থা সহজ ছিল, তারা ছোট ছোট অর্ডার দিত। এ সপ্তাহে ১০ হাজার, পরের সপ্তাহে ২০ হাজার, পরের সপ্তাহে আবার ২০ হাজার পিস। এভাবে অর্ডার ভাগ করে নিত। আমরা ট্রাক দিয়ে পুরো কনটেইনার পাঠিয়ে দিতাম, ওইভাবে তারা দোকানে পণ্য নিত। সীমান্ত বন্ধ করার কারণে এ ব্যবসাটাও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
ওই সময় আমরা মোট যত রফতানি করতাম, তার ৫ শতাংশ ভারতে যেত। ক্রেতাদের জন্যও একটা সুবিধা ছিল। যখন দেখত ভারতে তার অনেকগুলো দোকান আছে, তখন বাংলাদেশ থেকে অর্ডারটা দিত। একবারে ১ লাখ পিসের জন্য মূলধন মজুদ করে না রেখে অর্ডার দিত ২০ হাজার পিস, ২০ হাজার পিস, ২০ হাজার পিস করে। এভাবে দোকানের মধ্যে ঢুকত। যখন জিনিসটা বিক্রি হচ্ছে, তখন সেভাবে আবার বাড়িয়ে দিত।
ভারতে এ জায়গায় আমরা আবার এটাও দেখেছি, আমি ভারত থেকে নিয়ে এলাম, তাদের সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে নিয়ে আসছি, পণ্যটা বানালাম, পণ্য বানিয়ে তাদের দোকানে দিলাম, তারা আবার ওখান থেকে রফতানি করছে। তাদের সুবিধা হতো, তারাও একটা প্রণোদনা পেত। পাশাপাশি তাদের মূলধনের খরচ এভাবে মজুদ হয়ে থাকত না।
একবারে ১ মিলিয়ন ডলারের অর্ডার দিল আমাকে, কিন্তু একবারে নিতে হচ্ছে না। দোকানে যতটুকু লাগবে, ততটুকু পরিমাণে নিচ্ছে। আমারও সুবিধা হতো। আমার ঋণপত্র খুললে একবারে ১ মিলিয়ন ডলারের ঋণপত্র করতে হতো না। আমি অল্প অল্প করে সুতা নিয়ে আসতাম, পেমেন্টের চাপটাও আমার ওপর পড়ত না। নানাবিধ সুবিধা আছে। আপনারা যদি কাছের বাজারে সরবরাহকারী হতে পারেন, তাহলে অনেক সুবিধা।
এ মুহূর্তে কি সরবরাহ একদমই বন্ধ?
অনেক কমে গেছে। আমাদের ক্ষেত্রে এখন মোট রফতানির ১ শতাংশের কম। এখন যখন পাঠাই, আমার পুরো বোঝাই করে পাঠাতে হয়। পুরো বোঝাই করে পাঠালে তারা আর ৫ হাজার পিস, ১০ হাজার পিস, ২০ হাজার পিস ওভাবে নেবে না।
তারপর বন্দরগুলো তাদের কেন্দ্র, দোকান বা কারখানা থেকে দূরে। তখন হিসাব করে দেখে, তারা যদি ভিয়েতনাম থেকে নিয়ে আসে, ভিয়েতনামে আরো সুবিধা আছে। মূল্য সংযোজিত পণ্য রেখে দিচ্ছে। আবার ভারত এখন নিজেরাও তাদের কারখানার আকার বড় করছে।
তাদের স্থানীয় ব্র্যান্ডের যারা সরবরাহকারী, তারা তো সবসময় তাদের নিজস্ব সক্ষমতার ক্ষতির কথা বলে থাকেন বাংলাদেশীদের কারণে। সে বিষয়ে আপনার অভিমত কী?
তারা প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পাচ্ছে। পাশাপাশি তারা ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করবে, এগুলো তো হয়ে গেছে। এটার সুবিধা এখন তারা কাজে লাগাবে। বর্তমান যে বাধা রয়েছে, সেগুলো আমাদের নীতিনির্ধারকদের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে। এখানে আরেকটা যে সুযোগ আমরা হারিয়েছি, সেটা হলো আমাদের যে সম্পর্কটা ছিল। আমি ভারত থেকে সুতা এনে এখানে প্রতিযোগিতামূলকভাবে জিনিসটা উৎপাদন করে, উন্নয়ন করে, পণ্যে বাড়তি মূল্য যোগ করতে পারতাম। সেটাও সেখানে ব্যাহত হয়ে গেছে। ভারত কিন্তু অনেকগুলো পণ্য নেয়, যেগুলো বাংলাদেশ থেকে নেয় না বা আমরা করি না। যেমন ব্যাকপ্যাকের মতো পণ্য। ব্যাকপ্যাক কিন্তু আমরা এখন কিছুটা শুরু করছি। কিন্তু ভারতে এটা একটা বিশাল বাজার। অভ্যন্তরীণ বাজার বিশাল। ওটাও আমরা এসব নীতির কারণে হারিয়েছি।
আরেকটা হলো, শেষ পর্যন্ত ভারতে যদি আমাদের ওই সম্পর্কটা থাকত। এখন তারা একটা নতুন ব্যবসা শুরু করছে, যেটা আমরা করতাম না, তারাও করত না। যেমন কোনো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের ভারতীয় বাজারের স্বত্ব একটা ভারতীয় কোম্পানি কিনে নিচ্ছে।
এখন আন্তর্জাতিক কোনো ব্র্যান্ডের ভারতীয় বাজারের স্বত্ব একটা ভারতীয় কোম্পানি কিনছে। তারা তখন নিজেদের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন দিয়ে ওই ব্র্যান্ডের পণ্যগুলো বানায়, ওই নামটা ব্যবহার করে, ট্যাগটা লাগায় এবং এর বিনিময়ে একটা রয়্যালটি পায়।
ভারতে আগে যে সরবরাহ ব্যবস্থার সমন্বয়টা ছিল, এটা যদি থাকত, তাহলে আমরাও সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করতে পারতাম। আমরা এখন সরাসরি কাজ করতে পারছি না, কারণ ওই কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে সংগ্রহ না করে, ভারত থেকে সংগ্রহ করছে। আমি কিন্তু ওটার অংশ হতে পারতাম।
আমার পণ্যের তালিকা যখন একজন ক্রেতা দেখত, তখন দেখত আমি নামকরা সব ব্র্যান্ডের জন্য কাজ করছি। কিন্তু বাংলাদেশে এসে যদি এখন সেই সহযোগিতাটা না থাকে, আমি বাংলাদেশে দেখাতে পারছি না যে কাজ করি। তখন আর ওই কাজটা করার সুযোগ থাকে না।
অনেক কিছু আছে এখানে। যেমন ওই ব্র্যান্ডটা ভিন্ন পণ্য নিয়ে কাজ করে, অথবা ওদের ফিনিশিংটা ভিন্ন হয়, অথবা পরিচর্যার নিয়ম ভিন্নভাবে করতে হয়। নতুন পণ্যটা কিন্তু আমার কাছে আসছে না। অথচ নতুন পণ্য, নতুন নকশা দিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থায় সহযোগিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের যে বাজারটা আমার বাড়ছিল, সেখানে এখন আমি ওইভাবে পরিকল্পনা করতে পারছি না।
দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ক উন্নয়ন নিয়ে আর কিছু বলতে চান?
ভারতের একটা বড় সুবিধা আছে। ভারতে যে নেপালের বাজারগুলো আছে, সেগুলো কিন্তু একটা ট্রানজিট বা যোগাযোগ সুবিধা পায়। তারপর এখানে আরেকটা সুযোগ ছিল। আমাদের বাংলাদেশের স্থানীয় অনেক ভালো ভালো ব্র্যান্ড তৈরি হয়েছে। আমাদের একটা সুযোগ ছিল এগুলোকে ভারতে নিয়ে গিয়ে বড় করা। যেমন ভারতের অনেক ব্র্যান্ড এখন বাংলাদেশে চলে। আপনি দেখবেন, ভারতীয় ব্র্যান্ড বাংলাদেশে রমরমিয়ে চলছে। কিন্তু বাংলাদেশের যে ভালো ভালো ব্র্যান্ড আছে, এগুলো কিন্তু সেখানে নেই।
আপনি স্থানীয় ব্র্যান্ড বলতে কাদের বিষয়ে বোঝাচ্ছেন?
ওয়েস্টেক্স আছে, ক্যাটস আই আছে, এছাড়া অনেক ব্র্যান্ড আছে এখানে। এসব ব্র্যান্ডকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা যাচাই করা প্রয়োজন। আমরা হয়তো যথেষ্ট চেষ্টা করি না। আমাদের স্বাচ্ছন্দ্যের জায়গাটা ভাঙতে হবে। মূল বিষয় হলো যখন সবকিছু মসৃণ থাকে, তখন আপনি প্রচলিত চিন্তার বাইরে ভাবেন না। আমার যখন আমেরিকার সঙ্গে সবকিছু ভালো, আমি আমেরিকায় রফতানি করছি, ইউরোপে রফতানি করছি, তখন তো আমি এগুলো নিয়ে চিন্তা করি না। যখন বিপদে পড়ি, তখন আমি চিন্তা করি নতুন বাজারে কীভাবে যাব। ততদিনে এতো দেরি হয়ে যায় আর সেটা ততক্ষণে সবাই নিয়ে নেয়।










