লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ পিএলসি (তৎকালীন লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট) ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করে। ২০০৩ সালে প্রথম গ্রিনফিল্ড কোম্পানি হিসেবে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় লাফার্জহোলসিম। এর দুই বছর পর ২০০৫ সালে ভারতের মেঘালয়ে অবস্থিত নিজস্ব লাইমস্টোন খনি থেকে ১৭ কিলোমিটার কনভেয়ার বেল্টের মাধ্যমে সিলেটের সুনামগঞ্জের ছাতকে অবস্থিত কারখানায় লাইমস্টোন আনা শুরু হয়। সীমান্তের দুই পাশের এ খনি ও কারখানার সমন্বিত কার্যক্রমই হয়ে উঠেছে কোম্পানিটির ব্যবসায়িক মডেলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

মেঘালয়ের ১০০ হেক্টর জমির ওপর অবস্থিত খনিটি লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের কাঁচামালের প্রধান উৎস। খনিটি পরিচালনা করে লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের শতভাগ মালিকানাধীন ভারতীয় সাবসিডিয়ারি লাফার্জ উমিয়াম মাইনিং প্রাইভেট লিমিটেড (এলইউএমপিএল)। প্রতিষ্ঠানটি খনি থেকে লাইমস্টোন উত্তোলন ও ক্রাশিং করে এবং উৎপাদিত লাইমস্টোনের পুরোটাই ছাতকের সুরমা প্লান্টে পরিবহন করে। এ লাইমস্টোনই লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের ক্লিংকার, সিমেন্ট ও অ্যাগ্রিগেট উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল।

সীমান্তপারের এ ব্যবসার আর্থিক গুরুত্বও স্পষ্ট এলইউএমপিএলের কার্যক্রমে। ২০২৫ সাল শেষে প্রতিষ্ঠানটির সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২৩ কোটি ৩৬ লাখ ভারতীয় রুপি। এ সময়ে লাইমস্টোন বিক্রি থেকে প্রতিষ্ঠানটির আয় হয়েছে ৩৭৭ কোটি ৯১ লাখ রুপি। আর কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ১১৭ কোটি ৪৬ লাখ রুপি।

অন্যদিকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির আয় হয়েছে ২ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা। এর মধ্যে সিমেন্ট বিক্রি থেকে ২ হাজার ২৭৪ কোটি এবং অ্যাগ্রিগেট থেকে ৬৪৩ কোটি টাকা আয় হয়েছে। ২০২৫ সালে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ৪৬৫ কোটি টাকা।

লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশে আমাদের গ্রুপের ব্যবসা রয়েছে। কিন্তু এ ধরনের ক্রস-বর্ডার মাইনিং ও কাঁচামাল সরবরাহের ব্যবস্থা অন্য কোথাও নেই। বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য লাইমস্টোন রিজার্ভ নেই, অন্যদিকে মেঘালয়ে প্রচুর লাইমস্টোন রয়েছে। ফলে এটি দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার একটি অনন্য উদাহরণ।’

তিনি বলেন, ‘পারস্পরিক বিনিময়ের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত দুই দেশই লাভবান হচ্ছে। অন্য কোনো তৃতীয় দেশ থেকে লাইমস্টোন আমদানি করতে হলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হতো এবং তৃতীয় একটি দেশ লাভবান হতো। কিন্তু এখানে ভারত ও বাংলাদেশ—দুই দেশই উপকৃত হচ্ছে।’

লাফার্জহোলসিম গ্রুপের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রকল্পে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ হয়েছে বলেও জানান তিনি। তার ভাষ্য, ‘সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি ব্যবসায়িক প্রকল্প নয়; এটি সীমান্তপারের বিনিয়োগ, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, স্থানীয় কর্মসংস্থান ও জীবিকা এবং দুই প্রতিবেশী দেশের পারস্পরিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি উদাহরণ।’

মেঘালয়ের লাইমস্টোন বাংলাদেশের জন্য ভৌগোলিকভাবে সুবিধাজনক হওয়ার পাশাপাশি ভারতের জন্যও এ ব্যবস্থার রয়েছে আলাদা অর্থনৈতিক যুক্তি। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচুর লাইমস্টোনের মজুদ থাকায় মেঘালয়ের এ লাইমস্টোন দেশটির অন্য অঞ্চলে নিয়ে গিয়ে ব্যবহার করা তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল। ফলে দীর্ঘ দূরত্বে পরিবহনের বদলে সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের ছাতক প্লান্টে সরাসরি কাঁচামাল সরবরাহ করাই বেশি কার্যকর। এর ফলে দুই দেশই বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হচ্ছে।

সীমান্তপারের এ প্রকল্পের প্রভাব শুধু ব্যবসা ও বিনিয়োগে সীমাবদ্ধ নয়; স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও এর উল্লেখযোগ্য সামাজিক প্রভাব রয়েছে। মেঘালয়ের খনিসংলগ্ন দুটি হোস্ট কমিউনিটির অনেক মানুষ ওই জমির মালিক। তাদের আয়ের বড় কোনো বিকল্প উৎস না থাকায় লাফার্জহোলসিমের কাছ থেকে পাওয়া রয়্যালটি তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস। এ অর্থের মাধ্যমে শিক্ষা, জীবিকা ও অন্যান্য সামাজিক কার্যক্রমে সহায়তা করা হচ্ছে। ফলে ভারতের ওই অঞ্চলের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক জীবনেও এ প্রকল্পের প্রভাব রয়েছে।

বাংলাদেশের ছাতক অঞ্চলেও প্রকল্পটির অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব রয়েছে। ছাতক সিমেন্ট কারখানাটি ছাড়া দীর্ঘদিন সেখানে বড় কোনো শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠেনি। ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য কারখানাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস। পাশাপাশি স্থানীয় কমিউনিটির জন্য লাফার্জহোলসিমের অর্থায়নে প্রায় ১০টি স্কুল ও ছয়টি ক্লিনিকের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

মেঘালয়ের খনি থেকে ছাতকের কারখানায় কাঁচামাল সরবরাহের এ ব্যবস্থা শুধু একটি কোম্পানির উৎপাদন ব্যবস্থার অংশ নয়; এটি দুই দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। একদিকে বাংলাদেশ পাচ্ছে প্রয়োজনীয় কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, অন্যদিকে ভারত পাচ্ছে মেঘালয়ের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের খনিজ সম্পদের একটি কার্যকর বাজার। একই সঙ্গে দুই দেশের স্থানীয় জনগোষ্ঠীও এ কার্যক্রম থেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিধা পাচ্ছে।