দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার বড় অংশ পূরণ করে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও আফ্রিকার পাশাপাশি ভৌগোলিকভাবে কাছের দক্ষিণ এশিয়াও এ শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাজার হয়ে উঠেছে। শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপে বাংলাদেশী ওষুধের উপস্থিতি তৈরি হয়েছে একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। সরকারি তথ্য ও কোম্পানিগুলোর নিজস্ব বাজার তথ্য বিশ্লেষণে স্কয়ার, ইনসেপ্টা, এসকেএফ, বীকন, এসিএমই ও অপসোনিনকে এ অঞ্চলে বাজার তৈরি করা উল্লেখযোগ্য ছয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে পাওয়া যায়।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ২৩৮ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের ওষুধ ও ফার্মাসিউটিক্যালস পণ্য রফতানি হয়েছে। আগের অর্থবছরে এ রফতানি ছিল ২১৩ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার। বর্তমানে বিশ্বের ১৩০টিরও বেশি দেশে বাংলাদেশী ওষুধের বাজার রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে দৃশ্যমান বাজার শ্রীলংকা। বাংলাদেশ হাইকমিশন, কলম্বোর তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ থেকে শ্রীলংকায় মোট ৮৩ দশমিক ৭৯ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি হয়। এর মধ্যে ফার্মাসিউটিক্যালস পণ্যের রফতানি ছিল ২৮ দশমিক ২৩ মিলিয়ন ডলার। ২০২২ সালে এ পরিমাণ ছিল ২১ দশমিক ৯৭ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ দুই বছরে শ্রীলংকায় বাংলাদেশী ওষুধের রফতানি বেড়েছে প্রায় ২৮ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও শ্রীলংকা বাংলাদেশের ওষুধ রফতানির শীর্ষ গন্তব্য ছিল। এ সময়ে দেশটিতে মোট রফতানি হওয়া পণ্যের ৪০ দশমিক ১ শতাংশ ছিল ফার্মাসিউটিক্যালস পণ্য।

তবে এ বাজারে প্রতিযোগিতাও তীব্র। বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল4ডা. মো. জাকির হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সার্কভুক্ত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে ভারত।’

তার ভাষায়, ‘দক্ষিণ এশিয়ার যে কয়টা দেশ, সার্ক বলতে আমি সার্কই বোঝাচ্ছি। আর মূলত যদি দক্ষিণ এশিয়ার সার্ককে বোঝান আপনি, তার ভেতরে প্রধান দেশ তো হচ্ছে ভারত। তাদের ওষুধ খাত যথেষ্ট শক্তিশালী। পৃথিবীর ওষুধের কারখানা যদি বলা যায়, তাহলে পৃথিবীর ওষুধের কারখানায় এক নম্বরে তারা এবং দুই নম্বরে আয়ারল্যান্ড, তার পরে আমরা আসছি। এখানে আমাদের যে সাত-আটটা দেশ আছে, তার ভেতরে তাদের অবস্থান হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী, সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক। সো এটা একটা বিষয়। দুই নম্বর হচ্ছে, ধরেন পাকিস্তানের ওষুধ শিল্পও মোটামুটি ভালোই শক্তিশালী। তারা কিছু আমদানি করে, কিন্তু আমদানিনির্ভর বলা যায় না।’

শ্রীলংকার বাজার সম্পর্কে ডা. মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘তার পরে যদি ধরেন, শ্রীলংকা আমদানিনির্ভর। কিন্তু ওখানকার নিয়মটা হচ্ছে মূলত ওরা সরকারিভাবে কেনে, তারপর এটা হাসপাতালগুলোয় সরবরাহ করে। আমরা সরকারকে দিচ্ছি, মানে ওইখানে দুটোই আছে। সরকার দরপত্র করে কিনে নেয়। ওই দরপত্রে আমরা যখন অংশগ্রহণ করি, এখন আমরা ভারতীয়দের সঙ্গে পারাটা একটু কঠিন। কারণ আমরা কাঁচামাল মূলত ভারত ও চীন থেকে আনি। সো ওরা আমাদের এমনভাবে দাম দেয় যে দরপত্রে আমরা ওদের সঙ্গে খুব একটা পাই না। তার পরও দুই-একবার যে পাই না তা নয়, পাই। তাছাড়া স্থানীয় বাজারেও চলে। ধরেন হয়তোবা ৬০-৭০ শতাংশ সরকারি সরবরাহ, আর বাকি অংশে আমরা প্রতিযোগিতা করি। কিন্তু আমাদের অংশ আস্তে আস্তে বাড়ছে। শ্রীলংকা বাড়তে থাকা বাজার।’

দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে দীর্ঘদিনের উপস্থিতি রয়েছে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের। ১৯৯৫ সাল থেকে ওষুধ রফতানি করা প্রতিষ্ঠানটির এশীয় বাজারের তালিকায় ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলংকা রয়েছে।

ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস বর্তমানে বিতরণ অংশীদারদের মাধ্যমে ১০২টি দেশে পণ্য বাজারজাত করছে। এশিয়ায় ভুটান, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলংকায় তাদের উপস্থিতি রয়েছে।

এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালসেরও ৭০টি দেশে উপস্থিতি রয়েছে। নেপাল, শ্রীলংকা, ভুটান, ভারত ও মালদ্বীপসহ এশিয়ার একাধিক দেশে রফতানি করছে প্রতিষ্ঠানটি। বীকন ফার্মাসিউটিক্যালসের দক্ষিণ এশীয় বাজারে রয়েছে নেপাল, শ্রীলংকা ও মালদ্বীপ। বিশেষায়িত ক্যান্সার, হেপাটাইটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস ও ডায়াবেটিসের ওষুধেও আন্তর্জাতিক বাজারে গুরুত্ব দিচ্ছে তারা।

এসিএমই ল্যাবরেটরিজের আন্তর্জাতিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৫ সালে ভুটানে একটি ছোট চালানের মাধ্যমে। পরবর্তী সময়ে এশিয়ার পাশাপাশি কঠোর নিয়ন্ত্রক বাজারেও প্রবেশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। আর অপসোনিন ফার্মার এশিয়ার বাজারকেন্দ্রিক রফতানি কার্যক্রম বর্তমানে প্রায় ২৫টি দেশে বিস্তৃত। দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রীলংকা ও ভুটান রয়েছে তাদের বাজারের তালিকায়।

বাংলাদেশ থেকে রফতানিতে শীর্ষ ওষুধ কোম্পানিগুলোর বাজার বিস্তার সম্পর্কে জাকির হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি এমন রফতানির যাদেরই আপনি দেখেন, স্কয়ার, ইনসেপ্টা, সিনকো স্কয়ার বা যারাই ওষুধ রফতানি করে, এরা সবাই এ দেশগুলোতেই বেশি করে।’

নেপাল ও ভুটানের মতো ছোট বাজারেও বাংলাদেশী ওষুধের উপস্থিতি রয়েছে। তবে বাজারের আকার এবং ভারতের প্রভাব বড় সীমাবদ্ধতা। জাকির হোসেন বলেন, ‘আর আপনার নেপাল, ভুটান ছোট দেশ। একবার সরকার বলল দুই বছরের ওষুধ দিয়ে দেবে, আমরা ঔষধ শিল্প সমিতি থেকে জোগাড় করে দিলাম, ওদের মোটামুটি দুই বছরের ওষুধ হয়ে গেছে। ওদের বাজারের আকার খুব বড় না। নেপাল মানে মোটামুটি আছে, কিন্তু সেখানে আপনার বাংলাদেশ রফতানি করে। যেহেতু নেপালের মুদ্রাসহ পুরো বাজারটা ভারতনির্ভর, যার কারণে ওইখানে আপনার স্থলপথে চলে যায়, আমি রফতানি করব যেভাবে, স্থলপথের মধ্যে যদি আমি রাজশাহী যেভাবে ওষুধ পাঠাই, সেভাবে চলে যায়, তাহলে আর আমি বাজার করতে পারব না।’

দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে কাছাকাছি বাজারগুলোর মধ্যে মিয়ানমার ও আফগানিস্তানকেও সম্ভাবনাময় মনে করছেন তিনি। মিয়ানমার সম্পর্কে জাকির হোসেন বলেন, ‘মিয়ানমার ভালো বাজার, ওরা আমাদের বাজারের ভেতরে শীর্ষ দেশ, তার ভেতরে শ্রীলংকা, মিয়ানমারকে নিয়ে এরা আছে। মিয়ানমার আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার দেশ, ওইখানেও ওদের উৎপাদন, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন খুব একটা নেই। ওই আমাদের ওপরে তাদের নির্ভর করতে হয়।’

আফগানিস্তানের বাজার সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আর উত্তর কোরিয়ায় আমাদের যদিও... মানে আমার আফগানিস্তান আছে। আফগানিস্তানের সমস্যা যেটা আপনি দেখতেই পাচ্ছেন, যেহেতু সরকার স্বীকৃত না, পণ্য পাঠানোর সমস্যা আছে, আমাদের অর্থ পরিশোধের সমস্যা আছে। তার পরেও আফগানিস্তান বিভিন্ন উপায়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। ওদের প্রতিনিধি দল এসেছিল এবং পাকিস্তান করছে কী, ওরা ঝগড়াঝাঁটি করে ঠিকই, কিন্তু তাদের পণ্যবাহী বিমান ওষুধ নিয়ে আফগানিস্তানে দিয়ে আসে।’

কার্গো যোগাযোগ চালু করা গেলে বাজারটি আরো সম্ভাবনাময় হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন তিনি। জাকির হোসেন বলেন, ‘এটা যদি আমরা, মনে করেন পণ্যবাহী বিমানও চালু করতে পারতাম, তাহলেও কিন্তু আফগানিস্তানে আমাদের ওষুধের চাহিদা আছে, প্লাস ওরা আমাদের ওপরে নির্ভর করে। বাট এর মাঝখানে একটা চালান দিতে গিয়ে যে ইরানে বন্দর আব্বাস দিয়ে নিয়ে যেত, এখন যেহেতু ইরানে যুদ্ধ চলছে, যার কারণে করাচি দিয়েও নিতে পারে না, বন্দর আব্বাস দিয়েও নিতে পারে না; মাঝে মাঝে তাদের তুরস্ক হয়ে নিয়ে যেতে হয়। আফগানিস্তান, ওদের আমাদের ওষুধের ওপরে তাদের মানে নির্ভরতা বা আস্থা অনেক বেশি।’

সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান মূল্যায়ন করতে গিয়ে জাকির হোসেন তিনটি বাজারকে তুলনামূলকভাবে সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘যদি আপনি সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার কথা বলেন, তাহলে এখানে শ্রীলংকা, মিয়ানমার ও আফগানিস্তান এ তিন দেশে বাংলাদেশের অবস্থানও ভালো, তাদের আস্থাও আছে, আমাদের ব্র্যান্ডের পরিচিতি আছে, আমাদের অংশীদাররা আছে। আর ভারত, পাকিস্তান বা ভুটান, নেপাল, এদের হিসাব করে আর আসলে লাভ নেই। কারণ এখানে ভারতীয় আধিপত্য।’

নেপালে বাংলাদেশের প্রধান রফতানি পণ্যের তালিকায় ফার্মাসিউটিক্যালস রয়েছে বলে দেশটির বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্য বলছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে দুই দেশের মোট বাণিজ্য ছিল প্রায় ৪৯ মিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে বাংলাদেশের রফতানি ছিল ৪৪ দশমিক ৩৩ মিলিয়ন ডলার। ভুটানের ক্ষেত্রেও ওষুধ বাংলাদেশের প্রধান রফতানি পণ্যের একটি। দুই দেশের অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি ২০২২ সালের জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ায় এসব পণ্যের জন্য বাজার সম্প্রসারণের সুযোগও তৈরি হয়েছে।

সার্বিক প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের বিস্তার এখন আর বিচ্ছিন্ন কিছু রফতানি চালানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। স্কয়ার, ইনসেপ্টা, এসকেএফ, বীকন, এসিএমই ও অপসোনিনসহ দেশের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো একাধিক বাজারে নিজেদের ব্র্যান্ড ও বিতরণ নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। তবে ভারতের শক্তিশালী প্রতিযোগিতা, কাঁচামাল আমদানিনির্ভরতা, সরকারি দরপত্রে মূল্য প্রতিযোগিতা এবং ছোট বাজারগুলোর সীমিত আকার এ বিস্তারের পথে বড় চ্যালেঞ্জ।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক স্বীকৃতি, বিশেষায়িত ওষুধ উৎপাদন সক্ষমতা, স্থানীয় অংশীদার এবং বিদ্যমান ব্র্যান্ড পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার পাশাপাশি আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোয়ও বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৩৮ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের ওষুধ রফতানি সেই সম্ভাবনার ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন বিদ্যমান বাজারে অবস্থান শক্ত করার পাশাপাশি নতুন বাজারে প্রবেশ এবং মূল্য প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বাড়ানোই হবে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ।