বাংলাদেশের অটোমোবাইল বাজারের বড় একটি অংশ এখনো আমদানিনির্ভর। তবে শুধু সম্পূর্ণ তৈরি গাড়ি আমদানির মধ্যেই এ বাণিজ্য সীমিত নেই। ভারত, জাপান, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড থেকে যানবাহন ও যন্ত্রাংশ আমদানির পাশাপাশি দেশে মোটরসাইকেল, অটোরিকশা ও বাণিজ্যিক যানবাহনের সংযোজনও হচ্ছে। প্রায় পাঁচ দশক ধরে এ বাজারে কাজ করা উত্তরা মোটরস লিমিটেডের কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অটোমোবাইল খাতের সঙ্গে এসব দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের একটি চিত্র পাওয়া যায়।
১৯৭৭ সালে অটোমোবাইল ব্যবসায় প্রবেশ করে উত্তরা মোটরস। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ভারতের এএমডব্লিউ, বাজাজ অটো, ফোর্স মোটরস, মারুতি সুজুকি ও এসএমএল মাহিন্দ্রার প্রতিনিধিত্ব করছে। একই সঙ্গে জাপানের ইসুজু মোটরস ও সুজুকি মোটর করপোরেশন, পাকিস্তানের পাক সুজুকি, ইন্দোনেশিয়ার পিটি ইন্দোমোবিল সুজুকি ইন্টারন্যাশনাল এবং থাইল্যান্ডের ইসুজু মোটরসের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে।
এসব সম্পর্কের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন ও যন্ত্রাংশ বাংলাদেশে আসে। যাত্রীবাহী গাড়ি, এসইউভি ও পিকআপ ট্রাকের কিছু মডেল সম্পূর্ণ তৈরি বা অবস্থায় আমদানি করা হয়। মোটরসাইকেল, অটোরিকশা ও বাণিজ্যিক যানবাহনের ক্ষেত্রে আমদানি করা যন্ত্রাংশ স্থানীয়ভাবে সংযোজনের কার্যক্রমও রয়েছে। ফলে অটোমোবাইল আমদানির সঙ্গে দেশের স্থানীয় সংযোজন ও সেবা খাতও যুক্ত হয়েছে।
ভারতের সঙ্গে এ বাণিজ্যিক সম্পর্কের শুরু কয়েক দশক আগে। ১৯৭৮ সালে উত্তরা মোটরসের সিস্টার কনসার্ন মেনোকা মোটরসের মাধ্যমে ভারতে তৈরি বাজাজ অটোরিকশা ও স্কুটারের স্থানীয় সংযোজন শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ফোর-স্ট্রোক সিএনজিচালিত অটোরিকশার ব্যবহার শহর ও আধা-শহরাঞ্চলে বাড়তে থাকে। বাজাজের বিভিন্ন মডেলের মোটরসাইকেলও দেশের বাজারে ব্যাপকভাবে ব্যবহার হচ্ছে। এর সঙ্গে রাইড-শেয়ারিং, কুরিয়ার ও পণ্য পরিবহনের মতো খাতের সম্প্রসারণও হয়েছে।
জাপানের সঙ্গে অটোমোবাইল বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৮১ সাল থেকে ইসুজুর পিকআপ, ট্রাক ও বাস বাংলাদেশে সরবরাহ করা হচ্ছে। বাণিজ্যিক পরিবহন ও পণ্য সরবরাহের পাশাপাশি পোশাক শিল্প ও কৃষিপণ্য পরিবহনেও এসব যানবাহন ব্যবহার হচ্ছে। ১৯৮৫ সালে সুজুকি মোটর করপোরেশনের সঙ্গে পরিবেশক চুক্তির পর জাপানি ব্র্যান্ডের যাত্রীবাহী গাড়িও বাংলাদেশের বাজারে আসে।অটোমোবাইল আমদানির পাশাপাশি স্থানীয় সংযোজনের কারণে এ খাতে দেশীয় প্রকৌশলী, কারিগরি কর্মী, পরিবেশক ও সেবা প্রদানকারীদের একটি বাজার তৈরি হয়েছে। গাজীপুর ও সাভারে উত্তরা মোটরসের অ্যাসেম্বলিং কার্যক্রম রয়েছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্রাঞ্চ, ওয়ার্কশপ ও ডিলারশিপের মাধ্যমে যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণ ও যন্ত্রাংশ সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে আমদানীকৃত যানবাহনের সঙ্গে স্থানীয় সেবা ও যন্ত্রাংশের বাজারও বিস্তৃত হয়েছে।
অটোমোবাইল খাতে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় অংশ এখনো তৈরি যানবাহন ও যন্ত্রাংশ আমদানিকেন্দ্রিক। এ অবস্থায় স্থানীয় যন্ত্রাংশ উৎপাদন, সংযোজনের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের সুযোগ বাড়ানো গেলে আমদানিনির্ভরতার পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের অংশগ্রহণও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ভারতের মতো আঞ্চলিক উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সরবরাহ চেইনে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
উত্তরা মোটরসের মতো স্থানীয় পরিবেশক ও সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্ক এ ক্ষেত্রে একটি বিদ্যমান বাণিজ্যিক কাঠামো তৈরি করেছে। তবে সেটিকে স্থানীয় উৎপাদন ও যন্ত্রাংশ শিল্পে কতটা সম্প্রসারণ করা যাবে, তা নির্ভর করবে বিনিয়োগ, নীতিসহায়তা, দক্ষ জনবল, স্থানীয় সরবরাহকারী তৈরি এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সুবিধা কাজে লাগানোর ওপর। বাংলাদেশের অটোমোবাইল বাজারের পরবর্তী পর্যায়ের চ্যালেঞ্জ তাই শুধু বেশি গাড়ি আমদানি নয়; বরং আমদানির সঙ্গে স্থানীয় সংযোজন, যন্ত্রাংশ উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কতটা বাড়ানো যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অটোমোবাইল উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যমান বাণিজ্যিক সম্পর্ক এ পরিবর্তনের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
আঞ্চলিক বাণিজ্যে উত্তরা মোটরসের অবদান নিয়ে চেয়ারম্যান মতিউর রহমান বলেন, ‘আমরা ১৯৭২ থেকে দেশের অটোমোবাইল খাতে কাজ করে আসছি। শুরুর দিকে কেবল স্পেয়ার পার্টস আমদানি করলেও ১৯৮০ সাল থেকে মোটরসাইকেল এবং ১৯৮৫-৯০ সালের দিকে মোটরসাইকেল অ্যাসেম্বলিং শুরু করি। একই সময়ে আমরা জাপান থেকে সুজুকি এবং ভারত থেকে স্বরাজ মাজদার লাইট কমার্শিয়াল ভেহিকেল আমদানি ও বাজারজাতকরণ শুরু করি। বর্তমানে সাভারের জিরানী বাজারে আমাদের রয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় মোটরসাইকেল ফ্যাক্টরি, যার মাসিক উৎপাদন ক্ষমতা ২৫ হাজার ইউনিট হলেও বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটে বিক্রি ও উৎপাদন সাময়িকভাবে কমে গেছে।’
তিনি আরো জানান, ‘২০০১-২০০২ সালের দিকে নিজস্ব অ্যাসেম্বলি প্ল্যান্ট স্থাপন করি। তখন থেকেই কোনো ধরনের সরকারি সাহায্য বা আর্থিক সুবিধা ছাড়া, সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে, নিজস্ব ইঞ্জিনিয়ারিং ও বিনিয়োগে পেন্ট শপ ও ওয়েল শপ তৈরি করে একটি ট্রাকের ড্রাইভার কেবিন সম্পূর্ণ স্থানীয় ফ্যাক্টরিতে ম্যানুফ্যাকচারিং করা শুরু করি। আমরা তো ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ লিখে আমাদের গাড়িতে দেই। বাংলাদেশে অন্যান্য যারা ব্র্যান্ড আছে, তারা এখনো ওইভাবে শুধু অ্যাসেম্বলিং করছে; কিন্তু এই ড্রাইভার কেবিন ম্যানুফ্যাকচারিং কেউ এখন পর্যন্ত করেনি। এটা আমাদের জন্য একটা অ্যাচিভমেন্ট।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও পলিসির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে উত্তরা মোটরসের চেয়ারম্যান মতিউর রহমান বলেন, ‘আমরা মিরসরাইয়ের স্পেশাল ইকোনমিক জোনে ৫০ একর জায়গা নিয়েছি। সেখানে আমরা আমাদের অটোমোবাইল হাব করব। এছাড়া এখন তো ইভির (ইলেকট্রিক ভেহিকেল) যুগ, আমরা ওটা নিয়ে কাজ করছি। তবে একটা দেশে একটা পলিসি যদি আট-দশ বছর ভ্যালিড না থাকে, তাহলে এটার বেনিফিট পাওয়া যায় না। আঞ্চলিক সাপ্লাই চেইনে শক্তিশালী অবস্থানে যেতে হলে আমাদের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের উন্নয়ন এবং অন্তত ৮-১০ বছরের জন্য স্থিতিশীল সরকারি নীতি প্রয়োজন।’










