বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের উৎপাদন ব্যবস্থায় বিদেশী কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা দীর্ঘদিনের। তুলা, সুতা, কাপড়সহ বিভিন্ন ধরনের বস্ত্রপণ্য আমদানি করে সেগুলোকে রফতানিযোগ্য পণ্যে রূপান্তর করছে দেশের পোশাক ও বস্ত্র কারখানাগুলো। এ সরবরাহ ব্যবস্থায় পাকিস্তানের ভূমিকা সামগ্রিক বাণিজ্যের তুলনায় ছোট হলেও নির্দিষ্ট কিছু পণ্যে বেশ দৃশ্যমান। বিশেষ করে তুলার সুতা, ডেনিম ও অন্যান্য তুলাজাত কাপড় বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য পাকিস্তান থেকে আসা গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে মোট আমদানি পরিশোধের পরিমাণ ছিল ৭৫ কোটি ৫৩ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৬২ কোটি ৭৮ লাখ ডলার। এক বছরের ব্যবধানে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের আমদানি বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশই ছিল বস্ত্র ও বস্ত্রজাত পণ্যের। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাকিস্তান থেকে এ খাতে আমদানি পরিশোধ হয়েছে ৫৮ কোটি ৫৭ লাখ ডলার, যা দেশটি থেকে বাংলাদেশের মোট আমদানি পরিশোধের প্রায় ৭৭ দশমিক ৫ শতাংশ। আগের অর্থবছরে এ খাতে আমদানি ছিল ৪৯ কোটি ৯৯ লাখ ডলার।

বাংলাদেশের জন্য পাকিস্তানের বস্ত্রপণ্যের গুরুত্ব বুঝতে হলে পোশাক শিল্পের সামগ্রিক কাঁচামাল আমদানির চিত্রও দেখা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তৈরি পোশাকসংশ্লিষ্ট পণ্য আমদানিতে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৪৪ কোটি ডলার। এর মধ্যে কাঁচা তুলা আমদানিতে ৩৪৫ কোটি ৫৭ লাখ ডলার, সুতায় ৩৬১ কোটি ৮৭ লাখ ডলার এবং বস্ত্র ও বস্ত্রজাত পণ্য আমদানিতে ৮৯৫ কোটি ৯১ লাখ ডলার ব্যয় হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের পোশাক রফতানির সক্ষমতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থার একটি সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

পাকিস্তানের বস্ত্র শিল্পের উৎপাদন কাঠামোর সঙ্গে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের এ চাহিদার একটি স্বাভাবিক যোগসূত্র রয়েছে। পাকিস্তানের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশটির মোট রফতানির প্রায় ৫৬ শতাংশ এসেছে বস্ত্র ও পোশাক খাত থেকে। এ খাতের রফতানি আয় ছিল প্রায় ১ হাজার ৭৯০ কোটি ডলার। অর্থাৎ পাকিস্তানের রফতানি কাঠামোর কেন্দ্রেই রয়েছে বস্ত্র শিল্প, আর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প সেই শিল্পের উৎপাদিত কাঁচামালের অন্যতম ক্রেতা।

9.1

বাংলাদেশে পাকিস্তানের বস্ত্রপণ্য রফতানির প্রবণতায়ও এর প্রতিফলন রয়েছে। পাকিস্তান বস্ত্র পরিষদের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে বস্ত্র রফতানি হয়েছে প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ ডলারের। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় ১৭ কোটি ৯০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। পরিষদের ভাষ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান থেকে মূলত কাঁচামাল, বিশেষ করে তুলার সুতা ও তুলার কাপড় আমদানি করে বাংলাদেশ।

এ বাণিজ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পণ্যগুলোর একটি ডেনিম কাপড়। পাকিস্তান বস্ত্র পরিষদের পণ্যভিত্তিক তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২০০ গ্রামের বেশি ওজনের তুলাজাত বোনা ডেনিম কাপড় বাংলাদেশে রফতানি হয়েছে প্রায় ৮ কোটি ৮৬ লাখ ডলারের। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে একই পণ্যের রফতানি বেড়ে প্রায় ৯ কোটি ৯০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। এক বছরে এ পণ্যের রফতানি বেড়েছে প্রায় ১১ দশমিক ৭ শতাংশ।

এছাড়া তুলা ও কৃত্রিম তন্তুর মিশ্রণে তৈরি ডেনিম কাপড়ের রফতানিও ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রায় ১ কোটি ৮৬ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ২ কোটি ৫ লাখ ডলারে উঠেছে।

পাকিস্তানের কয়েকটি বড় ডেনিম উৎপাদক ও রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান এ সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে রয়েছে আর্টিস্টিক মিলিনার্স, নাভিনা ডেনিম মিলস, রাজবি টেক্সটাইলস ও সুরতি এন্টারপ্রাইজেস। এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যবস্থা শুধু কাপড় তৈরিতে সীমাবদ্ধ নয়। সুতা উৎপাদন, কাপড় বোনা, রঙ করা, প্রক্রিয়াজাত থেকে শুরু করে ডেনিম উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপেই তাদের কার্যক্রম রয়েছে।

আর্টিস্টিক মিলিনার্স পাকিস্তানের অন্যতম বড় সমন্বিত ডেনিম উৎপাদক। প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ব্যবস্থা সুতা উৎপাদন থেকে কাপড় বোনা, পোশাক তৈরি ও শেষ ধাপের প্রক্রিয়াজাত পর্যন্ত বিস্তৃত। পাকিস্তান বস্ত্র পরিষদের তথ্যানুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটিতে ১১ হাজারের বেশি কর্মী রয়েছে। বাণিজ্যিক চালানভিত্তিক তথ্যেও বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির ডেনিম কাপড় পাঠানোর একাধিক চালানের তথ্য পাওয়া যায়।

নাভিনা ডেনিম মিলসও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সরবরাহকারী। করাচিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি ২০০৩ সালে যাত্রা শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ব্যবস্থা সুতা উৎপাদন থেকে শুরু করে ডেনিম কাপড় তৈরি পর্যন্ত বিস্তৃত। তাদের আন্তর্জাতিক বিক্রয় যোগাযোগের তালিকায় বাংলাদেশের বাজারও রয়েছে। বাংলাদেশে ডেনিম কাপড় সরবরাহের একাধিক বাণিজ্যিক চালানের তথ্যও পাওয়া যায়।

রাজবি টেক্সটাইলসও পাকিস্তানের অন্যতম ডেনিম কাপড় উৎপাদক। প্রতিষ্ঠানটির কাপড় উৎপাদন ইউনিট ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডেনিমসহ বিভিন্ন ধরনের কাপড় উৎপাদন করে প্রতিষ্ঠানটি। বাংলাদেশে তাদের ডেনিম কাপড় পাঠানোর একাধিক চালানের তথ্য পাওয়া যায়।

এ তালিকায় রয়েছে সুরতি এন্টারপ্রাইজেসও। পাকিস্তানের পাশাপাশি বাংলাদেশেও প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন কার্যক্রম রয়েছে। কুমিল্লা রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় সুরতি টেক্সটাইলস বাংলাদেশ লিমিটেড নামে শতভাগ রফতানিমুখী পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে তারা। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে সুরতি এন্টারপ্রাইজেসের ডেনিম কাপড় পাঠানোর একাধিক বাণিজ্যিক চালানের তথ্যও পাওয়া যায়।

তবে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে আসা বস্ত্রপণ্যের প্রকৃত গুরুত্ব শুধু আমদানির অংক দিয়ে বোঝা যায় না। এসব পণ্যের বড় অংশ সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রির জন্য নয়, বরং বাংলাদেশের রফতানিমুখী পোশাক উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হয়। পাকিস্তান থেকে আসা তুলার সুতা, ডেনিম ও অন্যান্য কাপড় বাংলাদেশের কারখানায় প্রবেশ করে পোশাক তৈরির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। পরে সেই পোশাকই ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি হচ্ছে।

9.2

ছবি: রাজবি টেক্সটাইলস

ফলে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কের এ অংশটি অনেকটা উৎপাদন শৃঙ্খলনির্ভর। পাকিস্তান তুলা ও তুলাভিত্তিক বস্ত্র উৎপাদনে তার দীর্ঘদিনের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে কাঁচামাল সরবরাহ করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ সেই কাঁচামাল ব্যবহার করে তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রফতানি করছে। অর্থাৎ পাকিস্তান থেকে আসা একটি ডেনিম কাপড়ের চূড়ান্ত বাজার হয়তো বাংলাদেশ নয়, বরং এখানকার তৈরি পোশাকের মাধ্যমে সেটি পৌঁছাচ্ছে তৃতীয় কোনো দেশে।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প যত বেশি বৈচিত্র্যময় ও উচ্চ মূল্যের পণ্যের দিকে যাচ্ছে, ততই নির্ভরযোগ্য কাঁচামাল সরবরাহের গুরুত্ব বাড়ছে। সেই জায়গায় পাকিস্তানের তুলাভিত্তিক বস্ত্র শিল্প বাংলাদেশের জন্য একটি বিকল্প সরবরাহ উৎস তৈরি করেছে। বিশেষ করে ডেনিম কাপড়ের ক্ষেত্রে দুই দেশের শিল্পের মধ্যে এ সংযোগ এখন শুধু আমদানি-রফতানির হিসাব নয়, বরং একটি আন্তঃদেশীয় উৎপাদন শৃঙ্খলের অংশ।

তাই পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্পর্ক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে মোট আমদানি-রফতানির অংকের পাশাপাশি কোন পণ্য বাংলাদেশের কোন শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। সেই বিচারে পাকিস্তানের বস্ত্র ও ডেনিম শিল্প বাংলাদেশের পোশাক রফতানি ব্যবস্থার একটি দৃশ্যমান সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে।