দক্ষিণ এশিয়ার বাজার ওয়ালটনের আন্তর্জাতিক ব্যবসার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভৌগোলিক নৈকট্য, মানুষের জীবনযাত্রা, আবহাওয়া, ক্রয়ক্ষমতা ও পণ্যের চাহিদার দিক থেকে এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের অনেক মিল রয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের শুরু থেকেই দক্ষিণ এশিয়াকে আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আসছি।

দক্ষিণ এশিয়ায় ওয়ালটন রেফ্রিজারেটরের প্রথম রফতানি গন্তব্য ছিল নেপাল। ২০১১ সালে সেখানে রেফ্রিজারেটর রফতানির মাধ্যমে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে ভারত, ভুটান, মালদ্বীপ ও শ্রীলংকার বাজারে ওয়ালটনের তৈরি পণ্য পৌঁছেছে। শুরুতে আমাদের লক্ষ্য ছিল এসব বাজার সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন, পণ্যের গুণগত মানের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি এবং স্থানীয় ক্রেতাদের চাহিদা বোঝা। পরবর্তী সময়ে শুধু রফতানি বাড়ানোর পরিবর্তে প্রতিটি দেশে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই বাজার তৈরির ওপর আমরা গুরুত্ব দিয়েছি।

একটি দেশে সফল কোনো পণ্য বা ব্যবসায়িক মডেল হুবহু অন্য দেশে প্রয়োগ করে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য পাওয়া কঠিন। প্রতিটি বাজারের আবহাওয়া, ভোক্তার আয়, পরিবারের আকার, খাদ্যাভ্যাস, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি, ডিজাইন ও ফিচারের পছন্দ এবং মূল্য সংবেদনশীলতা আলাদা। তাই ‘ওয়ান প্রডাক্ট ফর অল মার্কেটস’ কৌশলের পরিবর্তে আমরা বাজারভিত্তিক গবেষণা, পণ্য উন্নয়ন ও বিপণন কৌশল অনুসরণ করছি। এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে দেশ-বিদেশের অভিজ্ঞ ও মেধাবী প্রকৌশলীদের নিয়ে গঠিত আমাদের শক্তিশালী গবেষণা ও উদ্ভাবন (রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন) বিভাগ।

নেপাল আমাদের এ কৌশলের একটি ভালো উদাহরণ। দীর্ঘদিন সেখানে কাজ করার ফলে নেপালি ক্রেতাদের পছন্দ ও ব্যবহারিক প্রয়োজন সম্পর্কে আমাদের অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়িক অংশীদার ও ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করছি। সম্প্রতি নেপালের বাজারের জন্য বিশেষভাবে তৈরি ১৬৫ লিটারের সিঙ্গেল-ডোর মডেলসহ ১৮টি নতুন মডেলের রেফ্রিজারেটর উন্মোচন করা হয়েছে। নেপালে আমাদের লক্ষ্য শুধু রফতানি নয়, ওয়ালটনের একটি শক্তিশালী ও দীর্ঘমেয়াদি ব্র্যান্ড উপস্থিতি তৈরি করা।

15

ভারত আমাদের জন্য একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাময় এবং সবচেয়ে প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারগুলোর একটি। বিশাল জনগোষ্ঠী এবং রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, টেলিভিশন ও হোম অ্যাপ্লায়েন্সের বড় বাজার থাকায় দেশটিতে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা সেখানে ওইএম (অরিজিনাল ইকুইপমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার) বা কন্ট্রাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের মাধ্যমে পণ্য রফতানির পাশাপাশি নিজস্ব ‘ওয়ালটন’ ব্র্যান্ডের রেফ্রিজারেটর ও এয়ার কন্ডিশনার বাজারজাত শুরু করেছি। ভারতের অঞ্চলভেদে ক্রেতাদের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে পণ্যের ক্যাপাসিটি, ডিজাইন, ফিচার ও মূল্য নির্ধারণ করে কার্যক্রম সম্প্রসারণে আমরা জোর দিয়েছি।

ভুটানের বাজার তুলনামূলক ছোট হলেও নির্বাচিত পণ্যের জন্য এটি একটি সম্ভাবনাময় বাজার। বিশেষ করে রেফ্রিজারেটর, টেলিভিশন ও হোম অ্যাপ্লায়েন্সের ভালো সুযোগ রয়েছে। কার্যকর ডিস্ট্রিবিউশন ও বিক্রয়োত্তর সেবার মাধ্যমে সেখানে ধীরে ধীরে ব্র্যান্ডের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো আমাদের লক্ষ্য।

শ্রীলংকাকেও আমরা পরবর্তী প্রবৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে দেখছি। সেখানে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে মানসম্পন্ন কনজিউমার ইলেকট্রনিকস ও হোম অ্যাপ্লায়েন্সের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, টেলিভিশন ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ দেখছি।

চারটি বাজারের সম্ভাবনার ধরন আলাদা। ভারত বিক্রির পরিমাণের দিক থেকে সবচেয়ে বড় সুযোগ, নেপাল আমাদের প্রতিষ্ঠিত ও দ্রুত সম্প্রসারণযোগ্য বাজার, শ্রীলংকা নতুন প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র এবং ভুটান নির্বাচিত পণ্যের গুরুত্বপূর্ণ বাজার।

পণ্যের ক্ষেত্রে রেফ্রিজারেটর আমাদের অন্যতম প্রধান শক্তি। বাংলাদেশে গড়ে তোলা বৃহৎ উৎপাদন সক্ষমতা, গবেষণা ও উদ্ভাবন, কম্প্রেসরসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ উৎপাদনের সক্ষমতা এবং বৈচিত্র্যময় মডেল তৈরির অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দিচ্ছে। এর পাশাপাশি এয়ার কন্ডিশনার, ভিআরএফ, কম্প্রেসর, টেলিভিশন, ওয়াশিং মেশিন, হোম ও কিচেন অ্যাপ্লায়েন্স এবং ইলেকট্রিক্যাল পণ্যেরও উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে।

আমাদের আন্তর্জাতিক ব্যবসার লক্ষ্য এখন শুধু ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্য রফতানি নয়; বরং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ থেকে ‘গ্লোবাল ব্র্যান্ড ফ্রম বাংলাদেশ’ হয়ে ওঠা। এজন্য বাজারভিত্তিক পণ্য উন্নয়ন, শক্তিশালী স্থানীয় ডিস্ট্রিবিউশন ও সার্ভিস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ওয়ালটন ব্র্যান্ডের দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণযোগ্যতা তৈরিতে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানও আমাদের জন্য বড় সুবিধা। কাছাকাছি বাজার হওয়ায় লিড টাইম কমানো, সরবরাহ ব্যবস্থা কার্যকর রাখা এবং বাজারের পরিবর্তনে দ্রুত সাড়া দেয়া সম্ভব। এ সুবিধার সঙ্গে আমাদের উৎপাদন সক্ষমতা, গবেষণা ও উদ্ভাবন এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্য যুক্ত করে দক্ষিণ এশিয়ায় আরো শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে চাই।

আমাদের লক্ষ্য স্বল্পমেয়াদে শুধু পণ্য বিক্রি নয়; স্থানীয় ক্রেতাদের আস্থা অর্জন, শক্তিশালী বিপণন ও বিক্রয়োত্তর সেবা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাজারে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান তৈরি করা। এরই মধ্যে বিশ্বের ৫৫টির বেশি দেশে ওয়ালটনের উপস্থিতি তৈরি হয়েছে। আমাদের পরবর্তী লক্ষ্য এ পরিধি আরো বাড়ানো এবং বিশ্বের ১০০টির বেশি দেশে বাংলাদেশে তৈরি প্রযুক্তিপণ্য পৌঁছে দেয়া। এর মধ্য দিয়ে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ প্রযুক্তিপণ্যের বৈশ্বিক বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি ওয়ালটনকে একটি শক্তিশালী ’বাংলাদেশী গ্লোবাল ব্র্যান্ড’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।