বাংলাদেশের সিমেন্ট শিল্পের জন্য ক্লিংকার একটি অপরিহার্য কাঁচামাল। দেশে সিমেন্ট উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়লেও এ কাঁচামাল আমাদের আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ক্লিংকারের দাম, জাহাজ ভাড়া, বন্দর ব্যবস্থা কিংবা কোনো নির্দিষ্ট উৎস থেকে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব পড়ে দেশের নির্মাণ শিল্পেও।

এখন প্রশ্ন যদি আসে, ক্লিংকার আমরা কোথা থেকে কিনব? উত্তরটি কোনো দেশের রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে হওয়া উচিত নয়। বরং দেখতে হবে, কোথা থেকে পণ্যটি প্রতিযোগিতামূলক দামে, ভালো মানে, নির্ভরযোগ্যভাবে এবং সময়মতো পাওয়া যায়। পাকিস্তানও এক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় সরবরাহ উৎস হতে পারে।

আমি নিজেও করাচি থেকে বেশ কয়েকবার ক্লিংকার আমদানি করেছি। গত বছরও এনেছি। বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে ভালো পরিমাণ তুলার কাপড় ও সুতা আমদানি করছে। অর্থাৎ এ বাণিজ্য নতুন করে কল্পনা করতে হবে না। বাণিজ্যের ভিত্তি এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে। এখন প্রয়োজন সেটিকে আরো বিস্তৃত, ভারসাম্যপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি করা।

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্কের সঙ্গে ইতিহাস জড়িয়ে আছে। সেই ইতিহাসের নিজস্ব গুরুত্ব রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার ইতিহাস এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাতীয় অনুভূতিকে কোনোভাবেই অস্বীকার করার প্রশ্ন আসে না। কিন্তু একটি দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত কেবল অতীতের রাজনৈতিক সম্পর্ক দিয়ে পরিচালিত হতে পারে না। বাণিজ্যের একটা নিজস্ব যুক্তি আছে।

একটি দেশ কোথা থেকে তুলা কিনবে, কোথা থেকে ক্লিংকার কিনবে, কোন দেশ থেকে রাসায়নিক আনবে কিংবা কোন বাজারে ওষুধ, পাটপণ্য বা পোশাক বিক্রি করবে, এসব সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত পণ্যের দাম, মান, সরবরাহের নিশ্চয়তা, পরিবহন ব্যয়, বাজারের চাহিদা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থ। আর এ জায়গাতেই মূলত বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ককে নতুনভাবে দেখা প্রয়োজন।

পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যে সরাসরি কোনো কনটেইনার জাহাজসেবা ছিল না। দুই দেশের বাণিজ্যও পরিমাণে খুব বেশি নয়। তবে ২০২৪ সালের শেষ দিকে পাকিস্তানের করাচি বন্দরের সঙ্গে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার জাহাজসেবা চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়। এর আগে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে আসা পণ্যে তৃতীয় দেশের বন্দর ব্যবহার করতে হতো।

পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের যে বাণিজ্য রয়েছে, তাতে সরাসরি কনটেইনার জাহাজসেবা চলমান থাকবে কিনা সেটা দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের গতি-প্রকৃতিই ঠিক করবে। তবে ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে মনে করি, সরাসরি জাহাজসেবা ছিল পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক বাড়ানোর একটি বড় পদক্ষেপ। বাণিজ্যকে রাজনৈতিক সম্পর্কে বন্দি করে রাখা যেমন ঠিক নয়, তেমনি বাণিজ্যিক স্বার্থকে উপেক্ষা করে রাজনৈতিক বিবেচনায় একটি সম্ভাবনাময় বাজার বা সরবরাহ উৎসকে দূরে রাখাও অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিসংগত নয়। আমাদের নীতি হওয়া উচিত, বাণিজ্যের নিজস্ব জায়গা থাকবে।

বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি আমাদের একটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে শিখিয়েছে। কোনো একটি দেশ, অঞ্চল বা সরবরাহ উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ব্যবসার জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।

সরাসরি জাহাজ চলাচলের পাশাপাশি পাকিস্তান থেকে আমদানির ক্ষেত্রে শতভাগ পণ্য হাতে পরীক্ষা করার যে ব্যবস্থা ছিল, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশনার পর সেটিও তুলে নেয়া হয়। এরপর পাকিস্তান থেকে কাঁচামাল আমদানিও বেড়েছে।

বাণিজ্যকে মানুষের প্রয়োজন ও সুবিধাকে প্রাধান্য দিতে হবে। স্রষ্টা পৃথিবীর সম্পদ ও উৎপাদন সক্ষমতা সব দেশে সমানভাবে দেননি। কোথাও কৃষিপণ্য বেশি উৎপাদন হয়, কোথাও জ্বালানি, কোথাও শিল্পের কাঁচামাল, কোথাও তৈরি হয় বিশেষ কোনো শিল্পপণ্য। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল দর্শনই হলো, যে দেশে যে পণ্য প্রতিযোগিতামূলকভাবে উৎপাদিত হয়, তা অন্য দেশের মানুষের প্রয়োজন মেটাতে কাজে লাগানো।

যুদ্ধ হতে পারে। রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। কোনো বন্দরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হতে পারে। কোনো দেশ রফতানিতে বিধিনিষেধ দিতে পারে। আন্তর্জাতিক জাহাজ ভাড়া হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে। কোনো একটি পণ্যের উৎপাদন কমে যেতে পারে। তখন যেসব দেশের একাধিক সরবরাহ উৎস থাকে, তারাই তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে থাকে। বাংলাদেশের শিল্পের জন্যও একই বিষয় প্রযোজ্য।

আমরা যদি তুলা, সুতা, রাসায়নিক, খাদ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল কিংবা ক্লিংকারের মতো পণ্যের জন্য একাধিক প্রতিযোগিতামূলক উৎস তৈরি রাখি, তাহলে আমদানিকারকের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়বে। কোনো একটি উৎসে সমস্যা হলে অন্য উৎস থেকে পণ্য আনার সুযোগ থাকবে। পাকিস্তান সেই বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থার একটি অংশ হতে পারে। এটি বাংলাদেশের ব্যবসায়িক স্বার্থের প্রশ্ন।

পাকিস্তান যদি কোনো সময়ে ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম কিংবা অন্য উৎসের তুলনায় ভালো দামে ক্লিংকার দিতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের আমদানিকারকদের সেই উৎস বিবেচনা করার সুযোগ থাকা উচিত। একই পণ্য বিভিন্ন দেশ থেকে পাওয়া গেলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ে। আর প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত ক্রেতার জন্যই ভালো।

চট্টগ্রাম ও করাচির মধ্যে সরাসরি সমুদ্রযোগাযোগ সত্যিকার অর্থে কার্যকর করা গেলে শিল্পপণ্যের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বাড়বে। এছাড়া বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তৈরি পোশাক রফতানিকারক দেশ। আমাদের পোশাক ও বস্ত্র শিল্পের জন্য বিপুল পরিমাণ তুলা, সুতা, কাপড় ও অন্যান্য কাঁচামাল প্রয়োজন। অন্যদিকে পাকিস্তানের অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি তার তুলা ও বস্ত্র শিল্প। এ দুই দেশের শিল্প কাঠামোর মধ্যে একটি স্বাভাবিক পরিপূরক সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশে দেশটির বড় রফতানি পণ্যের মধ্যে তুলাযুক্ত ভারী বোনা কাপড়, তুলার সুতা এবং অন্যান্য তুলার কাপড়ও রয়েছে।

বাংলাদেশ-পাকিস্তান বাণিজ্যে এখন সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো ভারসাম্যহীনতা। বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে যে পরিমাণ পণ্য আমদানি করছে, তার তুলনায় পাকিস্তানে বাংলাদেশের রফতানি অনেক কম। এ ব্যবধানকে শুধু সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না। এটিকে সুযোগ হিসেবেও দেখতে হবে। কারণ এর অর্থ হলো, পাকিস্তানের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি বাড়ানোর জন্য বড় জায়গা এখনো খালি রয়েছে।

এ অবস্থায় আমাদের একই সঙ্গে প্রশ্ন করতে হবে, পাকিস্তানের বাজারে আমরা কী বিক্রি করতে পারি? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হবে।

পাট ও পাটজাত পণ্য, ওষুধ, কৃত্রিম তন্তু, রাসায়নিক, জুতা ও চামড়াজাত পণ্য, পোশাকের বিভিন্ন উপকরণ, প্লাস্টিক পণ্য, হালকা প্রকৌশল পণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা রয়েছে। আমাদের দেখতে হবে পাকিস্তান কোন পণ্য কত পরিমাণে আমদানি করে। সেই পণ্য বর্তমানে কোন দেশগুলো সরবরাহ করছে। বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যয় কত। পাকিস্তানের বাজারে শুল্ক কত। অশুল্ক বাধা কী। পরিবহন ব্যয় কত। আর বাংলাদেশ কতটা প্রতিযোগিতা করতে পারবে।

এ বিশ্লেষণ পণ্যভিত্তিক হতে হবে। একটি সাধারণ ‘পাকিস্তানে রফতানি বাড়াতে হবে’ নীতি যথেষ্ট নয়। বরং ১০, ২০ বা ৩০টি নির্দিষ্ট পণ্য চিহ্নিত করে প্রতিটির জন্য আলাদা বাজার কৌশল তৈরি করা প্রয়োজন।

ব্যবসার পথে বাধা কমলে ব্যবসা সাড়া দেয়। তাই এখন পরবর্তী কাজ হলো এ সংযোগকে আরো কার্যকর করা। সরাসরি জাহাজ চলাচল শক্তিশালী হবে তখনই, যখন এ পথ শুধু একমুখী থাকবে না। পাকিস্তান থেকে সুতা, ক্লিংকার, রাসায়নিক বা খাদ্যপণ্য চট্টগ্রামে আসছে। কিন্তু ফিরতি জাহাজে কী যাচ্ছে?

বাংলাদেশের রফতানি বহুমুখীকরণ এখন জাতীয় অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের রফতানি সক্ষমতা ধরে রাখতে উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবন, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি সহায়তা প্রয়োজন। অর্থাৎ আমাদের সামনে শুধু নতুন বাজারের প্রশ্ন নয়, প্রতিযোগিতা সক্ষমতার প্রশ্নও রয়েছে। পণ্যভিত্তিক বাজার গবেষণার পাশাপাশি পাকিস্তানের আমদানিকারক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশ বহু বছর ধরে কিছু নির্দিষ্ট বাজারে তৈরি পোশাক রফতানি করে সফল হয়েছে। এ সাফল্য অবশ্যই ধরে রাখতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে নতুন বাজার ও নতুন পণ্য খুঁজে বের করতে হবে। পাকিস্তান সেই নতুন বাজারগুলোর একটি হতে পারে।

এখানে আমাদের বড় সুযোগ হলো পাকিস্তানের বিশাল জনসংখ্যা এবং শিল্পভিত্তিক অর্থনীতি। শুধু ভোক্তা বাজার নয়, পাকিস্তানের শিল্পের জন্যও বাংলাদেশ সরবরাহকারী হতে পারে। আমরা যদি পাকিস্তানের কোনো শিল্পের একটি নির্দিষ্ট কাঁচামাল বা উপকরণ প্রতিযোগিতামূলক দামে দিতে পারি, তাহলে একবারের চালানের বদলে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি হতে পারে। একটি কারখানা যদি নিয়মিত বাংলাদেশ থেকে কোনো পণ্য নেয়, সেটিই প্রকৃত রফতানি বাজার তৈরি করে।

এটি অসম্ভব কোনো লক্ষ্য নয়, যদি আমরা পণ্যভিত্তিক বাজার গবেষণা, বাণিজ্যিক কূটনীতি, সরাসরি ব্যবসায়িক যোগাযোগ এবং প্রতিযোগিতামূলক সমুদ্র পরিবহনকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে পারি।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বন্দর হিসেবে চট্টগ্রামের সামনে এখানে একটি বড় সুযোগ রয়েছে।

চট্টগ্রাম শুধু বাংলাদেশের আমদানি-রফতানির প্রধান প্রবেশদ্বার নয়, এটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে নতুন বাণিজ্যিক যোগাযোগ তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হতে পারে। করাচি ও চট্টগ্রামের সরাসরি সমুদ্র যোগাযোগকে আমরা যদি নিয়মিত, নির্ভরযোগ্য ও দ্বিমুখী পণ্য পরিবহনের পথে পরিণত করতে পারি, তাহলে এর সুফল শুধু বাংলাদেশ-পাকিস্তান বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য নতুন রফতানি কার্গো তৈরি হবে।

চট্টগ্রাম-করাচি সরাসরি সমুদ্রপথকে শুধু দুই বন্দরের মধ্যে যোগাযোগ হিসেবে না দেখে দুই দেশের অর্থনীতিকে আরো কাছাকাছি আনার একটি সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে। এ সুযোগকে রাজনৈতিক দূরত্ব দিয়ে আটকে রাখা নয়, বরং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে বাণিজ্যের নিজস্ব যুক্তিকে কাজে লাগানোই হবে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত।

আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি বাণিজ্যিক সম্পর্ক, যেখানে আমদানিতে বাংলাদেশ পাবে প্রতিযোগিতামূলক ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ উৎস, আর রফতানিতে পাকিস্তান হয়ে উঠবে বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় নতুন বাজার। দুই দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস তার নিজস্ব জায়গায় থাকবে, কিন্তু ব্যবসার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে হবে বর্তমান ও ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায়। এভাবেই বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের একটি শক্তিশালী, ভারসাম্যপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব।