রাষ্ট্রকে সম্পদশালী করার মূল মন্ত্র কোনো একক কর্মকাণ্ডের মধ্যে নিবিষ্ট করা যায় না। তার রাজনৈতিক ও সামাজিক মতাদর্শের ওপর রাষ্ট্রের প্রধান স্তম্ভ বা ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। চীনের অর্থনীতির মূল শক্তি উৎপাদনশীলতা; প্রতিটি কর্মক্ষম মানুষের কর্মদক্ষতা, কর্ম নৈতিকতা ও উৎপাদনশীলতা। পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকারীর প্রতি সরকারের নীতিসহায়তা এবং সরকারি বিনিয়োগকৃত শিল্পকে রোল মডেল ও সফলতার দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করা। একই শিল্পে প্রতিযোগিতা করে সরকারি ও প্রাইভেট বিনিয়োগকারীর প্রতিনিয়ত প্রবৃদ্ধি হয় এমন নজির কম। কিন্তু চীনারা এ উদাহরণ তৈরি করেছে। বৃহৎ শিল্পে সরকারি ব্যাপক বিনিয়োগ করে শিল্পের উৎপাদিত পণ্য বিশ্ববাজারে নেতৃত্ব দিচ্ছে। আবার একই খাতে ব্যাপক বেসরকারি বিনিয়োগকারী বিশ্ববাজারে সমানতালে প্রতিযোগিতা করছে। সারা বিশ্বের ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য তারা রফতানি করে। আমাদের দেশের মোট আমদানি পণ্যের প্রায় ২৫ শতাংশ আমদানি হয় চীন থেকে। আমাদের পোশাক শিল্পের কাঁচামাল থেকে শুরু করে সব শিল্পের যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক ও ইলেকট্রিক্যাল পণ্য, শিল্পের রাসায়নিক ও ফার্মার কাঁচামাল, প্লাস্টিক পণ্য ও কাঁচামাল, লোহা, কীটনাশক, সার, বীজ, কৃষিপণ্য, খেলনা শোপিস থেকে রান্নাঘরের ব্যবহার্য সবকিছুই আসে চীন থেকে। পক্ষান্তরে আমাদের রফতানির ৩ শতাংশেরও কম পণ্য চীন আমাদের থেকে কেনে।

এগ্রোকেমিক্যালের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের অনেক বড় বাণিজ্য আছে। চীনের চতুর্থ বৃহৎ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সিনোকেম লিমিটেড। ফরচুন গ্লোবাল ৫০০-এর তালিকাভুক্ত হিসেবে এটি বিশ্বময় স্বীকৃত ও জনপ্রিয় কোম্পানি। আমাদের দেশেও তারা বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার। বাংলাদেশে তাদের এক্সক্লুসিভ পার্টনারশিপ হিসেবে দীর্ঘ দুই দশক ধরে কাজ করছে ন্যাশনাল এগ্রিকেয়ার গ্রুপ-এনএসির সঙ্গে। তারা বাংলাদেশে পরিচালিত বৃহৎ বহুজাতিক কীটনাশক কোম্পানিকে আট বছর আগে বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছিল। ফলে বাংলাদেশে সরকারের নীতিসহায়তা থাকলে সিনোকেম ও এনএসি কোম্পানির কৃষি রসায়ন শিল্পে ব্যাপক বিনিয়োগ করতে পারে এবং সুযোগ দেয়া হলে কীটনাশক ও সার স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানি করা সম্ভব। একইভাবে হাইব্রিড ধানবীজ ও সবজিবীজ উৎপাদনে চাইনিজ কোম্পানির প্রাধান্য আছে। এনএসি কোম্পানির সঙ্গে চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বৃহৎ ধানবীজ কোম্পানি চং চিং ঝুলিইং লিমিটেডের যৌথ গবেষণা কার্যক্রম আছে। এনএসি কোম্পানির সবচেয়ে জনপ্রিয় হাইব্রিড ধানবীজ জনকরাজ ওই বিখ্যাত কোম্পানির উদ্ভাবিত জাত। এছাড়া রিয়েল এস্টেট খাতে এনএসির সঙ্গে চীনা-বাংলাদেশ ডেভেলপার লিমিটেডের জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানি আছে। আগামীতে আরো অনেক ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে ব্যাপক বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপন করে সরকারি বিনিয়োগ ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে বাংলাদেশকে একটি উৎপাদনমুখী ও রফতানিমুখী অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

চীনাদের সাফল্য অতুলনীয়। তাদের অর্থনৈতিক শক্তি ও সামরিক শক্তির সক্ষমতাকে অবজ্ঞা করার মতো রাষ্ট্র সংখ্যা নেই বললেই চলে। এত অল্প সময়ে এত প্রবৃদ্ধি, তাই প্রশ্ন জাগে, ১৯৭৮ সালেও যে দেশটি পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশের একটি ছিল। সেই দেশ কীভাবে বিশ্বের সমৃদ্ধিশালী অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হলো। ’৪৯ সালের বিপ্লব-পরবর্তী ’৫৯ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময়ে বিপর্যস্ত অর্থনীতি চাইনিজ জনগণের মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার বলে কিছু ছিল না। বিপন্ন প্রাণীর মতো মানুষের জীবন অসহায় দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল এবং সেই সময়ে সব উদ্ভিদ ও প্রাণীকে খাদ্য হিসেবে কমিউনিস্টরা গ্রহণ করেছে। চায়না ঘুরে দাঁড়িয়েছিল শুধু নেতৃত্বের পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে। আজকের চায়না রূপান্তরের মূল কর্মসূচি ১৯৮০ সালে। মূলত কৃষিভিত্তিক শিল্প, ব্যাপক বহুমুখী শিল্পায়ন, প্রযুক্তিও বিজ্ঞানের ব্যবহার এবং সামরিক শক্তির উন্নয়ন। শিক্ষা ব্যবস্থাপনাকে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের লব্ধ জ্ঞান জাতীয় উৎপাদনশীলতায় প্রভাব ফেলেছে। পণ্যের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত ট্রেড ও কমার্স সম্প্রসারিত হয়েছে। অর্থনীতির গতিশীলতা নতুন নতুন শিল্পায়নের উৎপাদনে অর্থনীতির আকৃতি পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে।

৪৫ বছরে চায়না এখন সারা বিশ্বে নানাবিধ পণ্য উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আমাদের দেশ ৫৫ বছরে এখনো দরিদ্র দেশের তালিকায় থেকে গেল। কৃষি আমাদের প্রধান অর্থনৈতিক সম্পদ হওয়ার পরও স্বয়ংসম্পূর্ণ করা সম্ভব হলো না। গুরুত্বপূর্ণ কৃষি উপকরণ আমদানিনির্ভর রয়ে গেল। আমাদের কৃষি উৎপাদনের প্রায় সব উপকরণ, প্রস্তুতকৃত পণ্য ও কাঁচামাল আমদানিনির্ভর। সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ যন্ত্রপাতিসহ অন্যান্য অতি সাধারণ ও আধুনিক যন্ত্রপাতি আমদানি করে আনতে হয়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অকার্যকর মানব কারখানা হিসেবে রয়ে গেছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষি রাসায়নিক উৎপাদনের ফর্মুলা দিতে পারে না। কীটনাশকের ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের যে সহজ উৎপাদন প্রযুক্তি আছে তা ভারত ও চায়নার দখলে দিয়ে রেখেছি আমরা। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎপাদিত কোনো প্রযুক্তি আমাদের শিল্পায়নের কাজে লাগেনি। মেডিকেল ইউনিভার্সিটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভাবিত কোনো পেটেন্ট ওষুধ বা কোনো প্রযুক্তি আমাদের শিল্প বিপ্লবে যুক্ত হয়নি। দেশের সরকারি পদস্থ কর্মকর্তারা বিনিয়োগকারী জনগণের কাছে এসে না দাঁড়িয়ে জটিল আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সমাধান খুঁজতে যায়নি। উৎপাদনমুখ অর্থনৈতিক কর ব্যবস্থার সংস্কার না করে আমদানিমুখী কর আহরণ পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে। আমাদের স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নের উদ্দেশ্যে ব্যাপক বেসরকারি বিনিয়োগ কর্মসূচি হাতে না নিয়ে সরকারি ব্যবস্থায় বিনিয়োগ ও আমদানি বেছে নেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় কোনো শিল্প বা আমদানি ব্যবস্থা রোল

মডেল হয়েছে এমন নজির আমরা দেখতে পারিনি। উল্লেখ করার মতো তেমন শিল্প বা সেবা বা নীতিমালার কোনো দৃষ্টান্ত সীমিত। আমাদের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যক্রম ঠিক করতে হবে। মার্কেট ওরিয়েন্টেড ও বাস্তবমুখী শিক্ষা কারিকুলাম সংস্কার জরুরি। গবেষণা ও উদ্ভাবনের মূল ও প্রাথমিক স্থান বানাতে হবে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে। যাতে পাস করা কোনো গ্র্যাজুয়েট রাষ্ট্রের উৎপাদনশীলতা অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে ও রাষ্ট্র নির্মাণে সামাজিক দায়বদ্ধতা বুঝতে পারে। আমাদের দেশের কাঁচামাল অথবা আমদানি করা কাঁচামাল দিয়ে আমদানির বিকল্প পণ্য দেশে উৎপাদন করে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানি করা যায় এমন কাজে সরকারকে প্রকৃত অর্থে সহযোগিতা করতে হবে। শিল্পের সম্ভাব্য কাঁচামাল উৎপাদনে প্রণোদনা দিয়ে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করার শিল্পে সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। কৃষি, শিল্প ও সেবা খাত আমাদের অর্থনীতির প্রধান জোগানদাতা। আমাদের ওইসব খাতে প্রবৃদ্ধি আনতে হলে সরকারকে শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ খাতে সহায়তা দিয়ে প্রয়োজনে আইন সংস্কার করে অর্থনীতি দ্বার করতে হবে। তা না হলে আমাদের দেশটি একটি আমদানিনির্ভর গরিব দেশের চক্র থেকে আর বের হয়ে আসতে পারবে না।

একটি দেশের উন্নয়ন নির্ভর করে সেই দেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শন যথাযথ করে দেশের আইন সংস্কার করা। দেশের সব স্তরের মানুষের উন্নয়নের লক্ষ্যে আইনের শাসন, সামাজিক ও অর্থনীতির ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। বেসরকারি বা

সরকারি সংস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার করে উৎপাদনমুখী ও রফতানিমুখী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। চীন তা প্রমাণ করেছে—দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার করা, কঠোর পরিশ্রম, উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি ও উৎপাদনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে আর্ন্তজাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ করেছে। এসব কর্মকাণ্ডের সমন্বয়ে পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশ চায়না এখন উৎপাদনশীলতায় ও রফতানিতে বিশ্বসেরা। আমাদের সামনেও একই সুযোগ রয়েছে।