এখন বড় পরিবর্তন বলতে যেহেতু বর্তমানে বাংলাদেশে কোনো নতুন ইন্ডাস্ট্রি হচ্ছে না এবং কোনো বিএমআরই (ভারসাম্য রক্ষা, আধুনিকায়ন, পুনর্বাসন ও সম্প্রসারণের কাজ) হচ্ছে না, অতএব মেশিনারি আমদানি যেটা হতো সেই অংশটা কমে যাবে। এখানে আপনার চায়না থেকে যে ব্যবধানটা, সেই অ্যামাউন্টের ভেতরে দুইটা পার্ট হয়। একটা ইকুইপমেন্ট আসে, আরেকটা আসে আপনার র-ম্যাটেরিয়াল। এখন আমরা মনে করছি আগামী দুই-তিন বছর মনে হয় না যে কোনো ইনভেস্টমেন্ট আসবে বা ক্যাপিটাল মেশিনারি আসবে। এ কারণে বছরে আমার ধারণা যে মিনিমাম ৩-৪ বিলিয়ন ডলার এখানে কমবে।
এভাবে ঘাটতি কমাটা আবার আমাদের শিল্পায়ন না হওয়ার দিকেও ইঙ্গিত দেয়। সেই জায়গা থেকে এ বিষয়টির আরো একটু ব্যাখ্যা দেবেন কি?
যেহেতু আপনার এখন গ্যাস-বিদ্যুৎ থাকবে না, দুই বছর পাওয়া যাবে না বলা হচ্ছে। আমাদের মন্ত্রী মহোদয় বলছেন যে আগামী দুই বছরে গ্যাস এবং বিদ্যুতের ডেভেলপমেন্ট হবে না এবং আপনি জানেন, যাদের কাছ থেকে গ্যাস দেয়ার জন্য টাকা নেয়া ছিল, সেগুলো বাতিল ঘোষণা করছে। তাহলে কনফার্ম যে আপনি আগামী দুই বছর কোনো ডেভেলপমেন্ট, বিএমআরই করতে পারবেন না।
এর জন্য বিএমআরই না করলে আপনার ক্যাপিটাল মেশিনারি ইম্পোর্ট হবে না। এটা মিনিমাম ৩-৪ বিলিয়ন ডলার হবে, যেটা বছরে আসে। এটা আমার মনে হয় আসবে না। এভাবে করে আমাদের যে ঘাটতি, সেটা একটু কমে আসতে পারে।
ইতিবাচকভাবে বাণিজ্য ঘাটতিটা কমিয়ে আনতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন কী হওয়া প্রয়োজন?
ঘাটতি কমিয়ে আনার জন্য একটা পরিকল্পনা করেছিলাম। চায়নাতে আমরা ২০টা আউটলেট চেয়েছিলাম। ওদের বলেছিলাম যে তোমরা আমাদের বাংলাদেশের জন্য ২০টা আউটলেট দাও ওখানে আমাদের পণ্য প্রদর্শিত হবে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ নামে এবং আমরা সেখানে বাংলাদেশের সব ধরনের পণ্য নিয়ে আস্তে আস্তে ঢুকব।
আমাদের টার্গেট হলো বছরে ১ বিলিয়ন ডলার। এভাবে আমাদের পণ্যগুলো চীনে প্রবেশ করাতে চাচ্ছি। যেহেতু চীন আমাদের ১০০টার ওপরে পণ্যের ডিউটি ফ্রি দিয়েছে, শুল্কমুক্ত। ওই সুযোগটা নেয়া হয়নি গত ছয় বছর, এটা তো দিয়েছে ২০২০-এ, ছয় বছর হয়ে গেল। আমরা চেষ্টা করতে চাই, দেখি কী করা যায়।
এটার জন্য চিন্তাভাবনা করে আমরা চীনা দূতাবাসে বলেছি যে তোমাদের বিভিন্ন সিটিতে এ পদক্ষেপ নিতে, যা আস্তে আস্তে নিতে হবে। পর্যায়ক্রমে কিছু কমানোর জন্য। আমরা ঢোকার পর আমাদের পণ্যগুলো যখন দেখবে গার্মেন্টসগুলো, আমরা তো সরাসরি এক্সপোর্ট করি না, এগুলো ভায়া মিডিয়া যায়, বিভিন্ন ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে নিয়ে।
বাংলাদেশ থেকে চীনে সরাসরি পোশাক রফতানি হয় না?
না, সরাসরি না। এটা যাচ্ছে ভায়া মিডিয়া। যেমন এইচঅ্যান্ডএম, জারা। তারা এখান থেকে নিয়ে চীনে তাদের আউটলেটে বিক্রি করছে, হিউজ পরিমাণ।
এইচঅ্যান্ডএম একটা সুইডিশ ব্র্যান্ড, হ্যাঁ? সুইডেনেও যেমন স্টোর আছে, আবার চায়নাতেও স্টোর আছে। কিন্তু চাইনিজ কোনো ব্র্যান্ড আছে? যাদের আমরা পোশাক সাপ্লাই দিই? বড় ব্র্যান্ড?
না, চাইনিজ এখনো তারা আমাদের কাছে ওইভাবে আসেনি। আমাদের কিছু গবেষণায় দেখেছি যে চীনে বাংলাদেশ থেকে যে পণ্যগুলো যাচ্ছে বিভিন্ন নামে, যেমন লিভাইস, এইচঅ্যান্ডএম, তারপর বহু ব্র্যান্ডের, প্রায় ২০-২৫টা ব্র্যান্ডের ওখানে কাপড় যাচ্ছে। ওখানে ওরা দেখতে পাচ্ছে যে স্টিকারের ভেতরে লেখা আছে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’। তখন ওদের বাংলাদেশের প্রতি একটু আস্থা আসছে যে এ প্রডাক্টটা বাংলাদেশ থেকে আসছে। যদিও ব্র্যান্ডের নামে এসেছে কিন্তু আমরা যদি সরাসরি ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ কিনি, একই পণ্য হয়তো আমরা সস্তায় কিনতে পারব। তাদের আগ্রহ আছে এবং তারা গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার হিসেবে বাংলাদেশকে চেনে। আমাদের গার্মেন্টস যারা এখান থেকে চীনে এক্সপোর্ট করে, বিভিন্ন বায়িং হাউজের নামে বা ব্র্যান্ড নামে, এরা রাজি হচ্ছে না। তারা বলতে চাচ্ছে ‘আমি যদি এটা চীনে বিক্রি করি, তাহলে হয়তো যে কোম্পানির মালিক বা যারা আমার কাছ থেকে নিচ্ছে, তারা আমার কাছ থেকে নেবে না।’ এ ভয়ে তারা এগোচ্ছে না।
আমরা যেটা ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ নামে নেব, এটা আমরা বিভিন্ন ফ্যাক্টরি থেকে বানিয়ে নেব, নিয়ে ওখানে ডিসপ্লে করব। আমরা চেষ্টা করব এ রকম জায়গায় আমাদের এ ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ স্টলটা নিতে, যেটার কাছাকাছি অন্য ব্র্যান্ডের স্টলগুলো আছে। নিশ্চয়ই ওই স্টলে এলে আমারটা দেখতে পাবে। এ রকম আমাদের চিন্তাভাবনা। তাতে আমরা মনে করি যে আমাদের ১ বিলিয়ন ডলারের পোশাক এক বছরে এক্সপোর্ট করা কোনো ব্যাপারই হবে না।
আমরা সব ধরনের প্রডাক্ট নেব, শুধু যে গার্মেন্টস তা নয়। লেদারের প্রডাক্ট থাকবে, বেডশিট থাকবে, হোম টেক্সটাইল থাকবে, কাঠের পণ্য, সব ধরনের পণ্য আমরা ওখানে ডিসপ্লে করব এবং আস্তে আস্তে আমরা চাচ্ছি।
চীনে শতভাগ পণ্যকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়ার পরও রফতানি কেন এত কম? সমস্যা কি বাজারে প্রবেশাধিকারে, নাকি বাংলাদেশের সক্ষমতার ঘাটতিতে?
আমাদের হলো ভয়। আমাদের লোক মনে করছে চীনারা সব জিনিস বানায়, সবকিছু পাওয়া যায়, সে আমারটা কিনবে কেন? কিন্তু এরা বুঝতে পারছে না যে চীন কিন্তু এখন ৪০ শতাংশ গার্মেন্টস বন্ধ করে দিয়েছে। তারা এসব জিনিস চাচ্ছে না। যেগুলো বেশি ম্যানপাওয়ার বা ছোটখাটো জিনিস, সেগুলো থেকে তারা চলে গেছে সোলারে। তারা চলে গেছে ফাইটার বিমান, ট্যাংক, আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র বা এসব জিনিসে। অতএব তারা এগুলো বানাবে না।
তারা এজন্য সুযোগটা দিচ্ছে যে ‘আমি এত এক্সপোর্ট করছি, এটা অনেক বেশি। তো তাদের সঙ্গে একটু সহযোগিতা করে এতটা পণ্য দিয়ে দিই, তারা যদি ঢুকতে পারে, আমরা এগুলো আর বানাব না।’
কিন্তু আমরা সেই সাহসটাই করছি না। আমরা ভয় পাচ্ছি। মানে আমাদের ক্যাপাসিটির সমস্যা ওই মানসিকতায় যে আমি ভয় পাচ্ছি।
বাংলাদেশ এখন চীনের সরবরাহ চেইনে শুধু ক্রেতা না হয়ে উৎপাদক হিসেবে যুক্ত হতে চায়। কোন খাতে এ রূপান্তরের সবচেয়ে বড় সুযোগ দেখছেন?
বাংলাদেশের সব খাতেই সুযোগ আছে। আপনি যদি বাংলাদেশ থেকে সরাসরি এক্সপোর্ট করেন, বাংলাদেশে উৎপন্ন করে সেই পণ্যটা আপনি বিদেশে নিয়ে যাবেন, এক্সপোর্ট করবেন, তাহলে আমাদের একটা সম্ভাবনা হবে।
আর যদি আপনি বাংলাদেশের মার্কেটে বিক্রি করতে চান, তাহলে আমাদের মিলগুলো বন্ধ হয়ে যাবে, ওদের সঙ্গে আমরা পারব না।
আমাদের মিলগুলো, আমি যদি টেক্সটাইল সম্বন্ধে বলি, মিলটা আমরা বাংলাদেশে যেভাবে চালাচ্ছি, এভাবে কস্টিংয়ে তাদের সঙ্গে পারব না। ওদের যে একটা কাপড় তৈরি করার খরচ, বাংলাদেশ থেকে তাদের ২৮ শতাংশ কস্ট কম। এখন ও যদি বাংলাদেশে বানিয়ে বা বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি করে ওপেন মার্কেটে, তাহলে আমাদেরগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। যার জন্য আমাদের টেকনোলজি ট্রান্সফার করতে হবে। ওরা কী সিস্টেমে ডাইং করে, কী সিস্টেমে কেমিক্যাল ইউজ করে, কী সিস্টেমে ম্যানপাওয়ার ও টেকনোলজি ব্যবহার করে, এগুলো আগে জানতে হবে। তাহলে আমরা ম্যানুফ্যাকচারার হতে পারব। ওনারা যদি আসে, আপনি ওয়েলকাম করছেন, কিন্তু ওনাদের সঙ্গে কন্ডিশন করেননি যে ওনারা প্রডাক্টটা কোথায় বিক্রি করবে? যদি বাংলাদেশে বিক্রি করে, তাহলে আমাদের সব শেষ। হ্যাঁ, যদি বাংলাদেশে বিক্রি করে, তাহলে আমাদের সব শেষ।
আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্কের চরিত্র বদলাতে হলে শুধু আমদানি নয়, বিনিয়োগ ও রফতানিনির্ভর অংশীদারত্বে যেতে—দুই পক্ষের কোন তিনটি পদক্ষেপ জরুরি?
একটা পদক্ষেপ হলো আমরা যে করিডোরের কথা চিন্তা করছি, একটা করিডোর থাকা দরকার, যেটা চীন থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশে আসবে। চীনের প্রধানমন্ত্রী আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন যে আমরা একটা করিডোর করতে চাই। এখানে স্থলপথে মালামাল আসবে, সমুদ্রভিত্তিক হবে না বলে খুব তাড়াতাড়ি আসবে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মালামাল পাওয়া যাবে এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাঠানো যাবে। উভয় পক্ষের লাভ হবে।
কিন্তু আমার দৃষ্টিতে এটা হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ ওখানে যে কাচিন বিদ্রোহী গ্রুপ আছে, তাদের এরিয়ার ওপর দিয়ে আসতে হবে। এখন চীন কি তাদের কনভিন্স করতে পারবে? যদি বিদ্রোহীদের কনভিন্স করে আনতে পারে, তাহলে এটা সাকসেসফুল হবে। অন্যথা আমি দেখি না।
দ্বিতীয়ত, চীনের সঙ্গে আমাদের এডুকেশনাল এবং নলেজ ট্রান্সফার করতে হবে। আমাদের লোক চীনের ভার্সিটিতে পড়বে, ওদের টিচাররা এসে আমাদের এখানে পড়াবেন। মানে নলেজ ট্রান্সফার এবং টেকনিক্যাল নো-হাউ ট্রান্সফার।
চাইনিজরা অনেকে ইংরেজি জানে না, তাই ভাষাগত শিক্ষার এক্সচেঞ্জ লাগবে। আমরা একটা ইউনিভার্সিটির সঙ্গে অলরেডি এমন একটা চুক্তি করিয়ে দিয়েছি।
আমাদের দেশের স্কুল-কলেজ থেকে যারা পড়াশোনা করে বের হচ্ছেন, তাদের অনেকের জ্ঞান তো আশাব্যঞ্জক নয়। তাদের ইন্টারভিউ নিলে আকাশ থেকে পড়তে হয়। তাই কারিগরি ও ভাষাগত এক্সচেঞ্জ খুব দরকার।
সবশেষে, চীনের সঙ্গে আমাদের অর্থনীতি আরো উন্নত করতে চাইলে চীনের একটা ব্যাংকের শাখা এখানে প্রয়োজন, যেটা এখনো আসেনি এবং চীনের মুদ্রা, আরএমবি ও বাংলাদেশী টাকার সরাসরি বিনিময় বা কারেন্সি এক্সচেঞ্জ চালু করতে হবে।










