গত পাঁচ দশকে দুই দেশের সম্পর্ক কূটনৈতিক বন্ধুত্বের গণ্ডি পেরিয়ে বাণিজ্য, অবকাঠামো, জ্বালানি, উৎপাদন শিল্প, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও জনগণের মধ্যকার যোগাযোগ বিস্তৃত একটি কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ নিয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ও চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ এ সম্পর্ককে আরো উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ফলে বিনিয়োগ, শিল্প সহযোগিতা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে যখন গভীর পরিবর্তন ঘটছে এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা পুনর্বিন্যস্ত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের সামনে এশিয়ার একটি নির্ভরযোগ্য উৎপাদন ও বিনিয়োগ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অসাধারণ সুযোগ এসেছে।
প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গেও বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান বাংলাদেশের মানুষ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। একইভাবে গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরে—বিশেষ করে অবকাঠামো, শিল্পায়ন, জ্বালানি, সেতু, বন্দর, টেলিযোগাযোগ ও উৎপাদন খাতে—চীনের অবদানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সর্বোত্তম পথ হচ্ছে সব বন্ধুপ্রতিম দেশের সঙ্গে গঠনমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে একটি স্বাধীন ও দূরদর্শী অর্থনৈতিক কৌশল অনুসরণ করা। কোনো দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব অন্য কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্কের প্রতিবন্ধক হওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে থাকতে হবে দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণ।
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য মিল হলো উভয় দেশেরই প্রধান শক্তি তাদের বৃহৎ জনগোষ্ঠী। অনেক সম্পদসমৃদ্ধ দেশের তুলনায় প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য সীমিত হলেও চীন প্রমাণ করেছে দক্ষ মানবসম্পদ, শিল্প উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনাই একটি দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদে পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এটি চীনের উন্নয়ন অভিজ্ঞতার অন্যতম মূল্যবান শিক্ষা।
আমি কয়েক বছর চীনে বসবাস ও ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ পেয়েছি। সে সময় দেশটির অভাবনীয় উন্নয়নের গতি খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছি। চীনের এ রূপান্তর কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সুশৃঙ্খল বাস্তবায়ন, অবকাঠামোতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ, রফতানিমুখী শিল্পায়ন, কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রতি অবিচল অঙ্গীকারের ফল।
বাংলাদেশও আজ এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যবর্তী কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান, তরুণ জনগোষ্ঠী, ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ বাজার, উন্নততর অবকাঠামো এবং সম্প্রসারণশীল উৎপাদন সক্ষমতা আমাদের সামনে বিপুল সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সময়োপযোগী সংস্কার বাস্তবায়ন করতে পারলে বাংলাদেশ এশিয়ার অন্যতম উৎপাদন, লজিস্টিকস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও প্রযুক্তি কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
তবে এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কয়েকটি সাহসী ও সুদূরপ্রসারী নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
প্রথমত, দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান ব্যবসার ব্যয় কমায়, বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ায় এবং রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের বিশ্বাস সুদৃঢ় করে।
দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগ পরিবেশকে আরো প্রতিযোগিতামূলক করতে বিধিবিধান সহজীকরণ, দ্রুত অনুমোদন, করনীতির পূর্বানুমেয়তা এবং দক্ষ সরকারি সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রণোদনা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, নীতির ধারাবাহিকতা ও নিশ্চয়তা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, ডিজিটাল কাস্টমস ব্যবস্থা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস, বন্দরের দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং সমন্বিত লজিস্টিকস নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আমদানি-রফতানি প্রক্রিয়াকে আরো আধুনিক করতে হবে। ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় ও সময় কমানো না গেলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা কঠিন হবে।
চতুর্থত, বিদেশী বিনিয়োগকারী, পেশাজীবী ও তাদের পরিবারের জন্য নিরাপদ, স্বাগতপূর্ণ ও আন্তর্জাতিক মানের পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। উন্নত নগরসেবা, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা এবং উপযুক্ত বিনোদন ও আবাসন সুবিধা একটি দেশের বিনিয়োগ সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পঞ্চমত, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মৌলিক শর্ত। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীরা স্বল্পমেয়াদি সুবিধার চেয়ে স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তাকে বেশি গুরুত্ব দেন।
ষষ্ঠত, নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। সরকার বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তনের কারণে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, জ্বালানি, শিল্প ও বিনিয়োগ নীতিতে আকস্মিক পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে। জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন পরিকল্পনায় বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন।
সপ্তমত, কারিগরি, বৃত্তিমূলক ও শিল্পভিত্তিক শিক্ষার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে। ভবিষ্যতে শুধু শ্রমশক্তির আকার দিয়ে প্রতিযোগিতা করা যাবে না; উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং পরিবর্তিত শিল্পের চাহিদার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতাই হবে মূল শক্তি। এর পাশাপাশি গবেষণা ও উদ্ভাবনকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থার মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা গড়ে তুলে গবেষণার ফলাফলকে বাণিজ্যিক উদ্ভাবনে রূপান্তর করতে হবে। পরিকল্পিত শিল্পনীতি ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং রফতানি বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে হবে। কারণ বৃহৎ শিল্পের পাশাপাশি শক্তিশালী এসএমই খাতই কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্ভাবন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি।
বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে। স্থিতিশীল বিনিয়োগনীতি, প্রতিযোগিতামূলক অর্থায়ন, আধুনিক গ্রিড ও জ্বালানি সঞ্চয় ব্যবস্থা এবং সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ও অন্যান্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তির স্থানীয় উৎপাদন বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও শিল্প প্রতিযোগিতা—দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক বাণিজ্যে পণ্যের মূল্য ও মানের পাশাপাশি তার কার্বন নিঃসরণের মাত্রাও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী পরিচ্ছন্ন জ্বালানি শুধু পরিবেশগত প্রয়োজন নয়; এটি বাংলাদেশের রফতানি সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও অপরিহার্য শর্ত।
একই সঙ্গে ডিজিটাল প্রশাসনের পরিধি বাড়িয়ে সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা, গতি ও দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। অধিকাংশ অনুমোদন, নিবন্ধন, কর ও শুল্কসংক্রান্ত প্রক্রিয়া একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনা গেলে প্রশাসনিক বিলম্ব ও অনিয়ম উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
চীনের উন্নয়ন অভিজ্ঞতা আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই সমৃদ্ধি আসে না। অবকাঠামো তখনই অর্থনৈতিক রূপান্তরের চালিকাশক্তি হয়, যখন এর সঙ্গে শিল্পায়ন, দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সুশাসন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় ঘটে।
বাংলাদেশের জন্য বর্তমান সময়টি সম্ভবত একটি নির্ধারক মুহূর্ত। বৈশ্বিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সরবরাহ ব্যবস্থা বহুমুখী করছে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা নতুন ও সম্ভাবনাময় বাজার খুঁজছেন। পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে পরিণত হচ্ছে। এসব পরিবর্তন থেকে লাভবান হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অনেক উপাদানই বাংলাদেশের রয়েছে।
এখন প্রশ্নটি আর এমন নয় যে বাংলাদেশের সম্ভাবনা আছে কিনা। প্রকৃত প্রশ্ন হলো সেই সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের সাহস, সক্ষমতা ও সম্মিলিত সদিচ্ছা আমাদের আছে কিনা।
বাংলাদেশ যদি চীনসহ বিশ্বের বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্বকে জাতীয় স্বার্থে কাজে লাগাতে পারে এবং এর সঙ্গে সুশাসন, নীতির ধারাবাহিকতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের সমন্বয় ঘটাতে পারে, তবে দেশটি শুধু বর্তমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই ধরে রাখবে না—আগামী কয়েক দশকের মধ্যে এশিয়ার অন্যতম গতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারবে।
ইতিহাস সবসময় সুযোগ দেয় না। বাংলাদেশের সামনে যে সুযোগ এখন এসেছে, তা আমাদের আত্মবিশ্বাস, প্রজ্ঞা, দূরদৃষ্টি ও দৃঢ়তার সঙ্গে কাজে লাগাতে হবে।





