বাংলাদেশ চীন থেকে আমদানি করে বিপুল পরিমাণ শিল্পের কাঁচামাল, মূলধনি যন্ত্র, বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্য, রাসায়নিক, টেক্সটাইল পণ্যসহ নানা ধরনের উপকরণ। বিপরীতে চীনে বাংলাদেশের রফতানি তুলনামূলকভাবে ছোট। ফলে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কের সবচেয়ে দৃশ্যমান চিত্র বড় বাণিজ্য ঘাটতি।
কিন্তু এ সম্পর্কের আরেকটি দিক আছে, যা কাস্টমসের হিসাব কিংবা আমদানি-রফতানির পরিসংখ্যানে সরাসরি ধরা পড়ে না। সেটি হলো ব্যবসায়ী থেকে ব্যবসায়ীর যোগাযোগ। পণ্য কেনাবেচার আগে যে সম্পর্ক তৈরি হয়, নতুন সরবরাহকারী খোঁজা, প্রযুক্তি দেখা, উৎপাদন সক্ষমতা যাচাই, পণ্যের নমুনা সংগ্রহ, দাম নিয়ে দরকষাকষি এবং ভবিষ্যৎ বাজারের ধারণা নেয়ার যে প্রক্রিয়া, তার বড় একটি আন্তর্জাতিক ঠিকানা চীনের ক্যান্টন ফেয়ার।
গুয়াংজুতে আয়োজিত চায়না ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট ফেয়ার, যা ক্যান্টন ফেয়ার নামে পরিচিত, চীনের অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আয়োজন। এর পরিসর এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এটি কেবল চীনা পণ্য প্রদর্শনের মেলা নয়, বরং বৈশ্বিক ক্রেতা ও চীনা উৎপাদকদের মধ্যে সরাসরি সংযোগের একটি বড় প্লাটফর্ম।
বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের উপস্থিতিও এখানে নতুন নয়। চীনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৩১তম ক্যান্টন ফেয়ারে বিশ্বের ২২৮টি দেশ ও অঞ্চল থেকে ৫ লাখ ৩৬ হাজার বিদেশী ক্রেতা নিবন্ধন ও অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেই মেলায় সবচেয়ে বেশি ক্রেতা পাঠানো শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় ছিল বাংলাদেশ। তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল পঞ্চম।
এ তথ্যটি কয়েক বছরের পুরনো হলেও বাংলাদেশের ব্যবসায়ী মহলে ক্যান্টন ফেয়ারের গুরুত্ব বোঝার জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। অর্থাৎ চীনের এ বৃহৎ বাণিজ্য আয়োজন বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের কাছে শুধু পরিচিত নয়, গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যবসায়িক গন্তব্যও।
সাম্প্রতিক ক্যান্টন ফেয়ারের পরিসর আরো বেড়েছে। ২০২৫ সালের ১৩৭তম ক্যান্টন ফেয়ারে ২ লাখ ৮৮ হাজার ৯৩৮ আন্তর্জাতিক ক্রেতা অংশ নেন। তাদের মধ্যে বেল্ট অ্যান্ড রোডভুক্ত দেশগুলোর ক্রেতা ছিলেন ১ লাখ ৮৭ হাজার ৪৫০ জন, যা মোট আন্তর্জাতিক ক্রেতার ৬৪ দশমিক ৯ শতাংশ। একই মেলায় মোট সম্ভাব্য রফতানি লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২৫ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার।
এখানেই বাংলাদেশের জন্য ক্যান্টন ফেয়ারের গুরুত্বের একটি বড় জায়গা তৈরি হয়। চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আমদানি উৎসগুলোর একটি। কিন্তু চীন শুধু বাংলাদেশের জন্য পণ্য বিক্রির বাজার নয়; এটি এমন একটি শিল্প অর্থনীতি, যেখানে একটি পণ্যের কাঁচামাল থেকে শুরু করে উৎপাদনযন্ত্র, যন্ত্রাংশ, প্রযুক্তি এবং চূড়ান্ত পণ্য পর্যন্ত বিস্তৃত সরবরাহ ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশের শিল্প উদ্যোক্তারা এ সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান ক্যান্টন ফেয়ারের মতো প্লাটফর্মে।
আমদানির বাজার থেকে ব্যবসায়িক যোগাযোগ
বাংলাদেশের শিল্পায়নের বর্তমান কাঠামোতে চীনের ভূমিকা গভীর। পোশাক ও বস্ত্র শিল্পের জন্য সুতা, কাপড়, কৃত্রিম তন্তু ও বিভিন্ন আনুষঙ্গিক উপকরণের পাশাপাশি উৎপাদন যন্ত্রও চীন থেকে আসে। প্লাস্টিক, ইলেকট্রনিকস, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, নির্মাণ, কৃষি ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ, ওষুধসহ বিভিন্ন শিল্পেও চীনা যন্ত্রপাতি ও উপকরণের ব্যবহার রয়েছে।
ফলে বাংলাদেশের একজন উদ্যোক্তার জন্য চীনের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কের অর্থ শুধু একটি পণ্য আমদানি করা নয়। একই সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক থেকে নতুন মেশিন, নতুন প্রযুক্তি, উৎপাদন উপকরণ কিংবা ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক অংশীদার খুঁজে নেয়ার সুযোগও তৈরি হয়।
ক্যান্টন ফেয়ারের বর্তমান কাঠামোও সেই বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে বদলেছে। মেলায় এখন ১৩টি বড় পণ্যশ্রেণী ও ৫০টির বেশি প্রদর্শনী বিভাগ রয়েছে। ইলেকট্রনিকস ও গৃহস্থালি বৈদ্যুতিক পণ্য, উৎপাদন ও যন্ত্রপাতি, যানবাহন, হার্ডওয়্যার, গৃহস্থালি পণ্য, নির্মাণ ও আসবাব, খেলনা, পোশাক, হোম টেক্সটাইল, স্বাস্থ্য ও বিনোদনসহ বিস্তৃত পণ্য সেখানে প্রদর্শিত হয়।
অর্থাৎ একজন বাংলাদেশী ব্যবসায়ী পোশাকের কাঁচামাল খুঁজতে গিয়ে একই মেলায় উৎপাদন যন্ত্র, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কিংবা প্যাকেজিং প্রযুক্তির সরবরাহকারীর সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারেন। আবার যিনি মূলত যন্ত্রপাতি আমদানি করেন, তিনিও একই জায়গায় নতুন উৎপাদক ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পেতে পারেন।
এ বহুমুখী সরবরাহ কাঠামোই ক্যান্টন ফেয়ারকে বাংলাদেশের জন্য বিশেষ করে তুলছে।
বাংলাদেশ শুধু ক্রেতা, নাকি বিক্রেতাও?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের বড় অংশ যদি ক্যান্টন ফেয়ারে গিয়ে শুধু চীনা পণ্য কেনার জন্য সরবরাহকারী খোঁজেন, তাহলে মেলার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক মূলত আমদানিকেন্দ্রিকই থাকবে। কিন্তু একই প্লাটফর্মে যদি বাংলাদেশী পণ্য ও উৎপাদন সক্ষমতা তুলে ধরা যায়, তাহলে সম্পর্কের চরিত্র বদলানোর সুযোগ তৈরি হয়।
বাংলাদেশের রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোও (ইপিবি) ক্যান্টন ফেয়ারকে সেই সম্ভাবনার জায়গা হিসেবে দেখছে। ইপিবির পরিচালক (নীতি পরিকল্পনা বিভাগ) আবু মোখলেছ আলমগীর হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা মূলত চায়নাতে প্রায় ৮০০-এর মতো পণ্য এক্সপোর্ট করছি। সেখানে পেনিট্রেশন করার জন্য আমাদের কয়েকটি খাতের ভালো সুযোগ রয়েছে; বিশেষ করে আমাদের ইলেকট্রনিকস এবং লেদার ও লেদারগুডস সেক্টরে ভালো সুযোগ রয়েছে, কারণ চায়না আমাদের থেকে হিউজ ফিনিশড লেদার অলরেডি নিয়ে থাকে। এছাড়া আমাদের জুট এবং জুট গুডসেরও একটা খুব ভালো ডিমান্ড রয়েছে। আমাদের রফতানির ক্ষেত্রে জুট চ্যাপ্টারে—বিশেষ করে ডাইভার্সিফায়েড জুট প্রডাক্টসের জন্য ভালো সুযোগ তৈরি হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘ক্যান্টন ফেয়ার মূলত অনেকগুলো সেক্টর নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। এ ফেয়ারে ইলেকট্রনিকস প্রডাক্টস অনেক বেশি থাকে এবং বিভিন্ন সেক্টরের জন্য আলাদা ডিউরেশন বা সময়সীমা থাকে।’
বাংলাদেশী রফতানিকারকদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও ইপিবির একটি নির্দিষ্ট অগ্রাধিকার রয়েছে। আবু মোখলেছ আলমগীর হোসেন বলেন, ‘মেলায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে আমরা মূলত এক্সপোর্টারদের ফ্যাসিলিটেট করি। আমাদের সামনে যে প্যান্ডেল হবে, সেখানেও এ সেক্টরগুলোকেই ফোকাস করা হয়েছে এবং আমরা এগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে যাওয়ার জন্য ব্রিফ করছি।’
চীনের বাজারে কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের সম্ভাবনাও দেখছে ইপিবি। তিনি বলেন, ‘এছাড়া এগ্রি-প্রসেসড প্রডাক্টসেরও একটি ভালো ডিমান্ড রয়েছে, কারণ আমরা এরই মধ্যে চায়নাতে ফ্রুটসের মেলাগুলোতে অংশ নিয়েছি। আমাদের কোম্পানিগুলো এরই মধ্যে জিএসিতে (জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমস চায়না) জ্যাকফুডসের (জ্যাকফ্রুট) জন্য রেজিস্টার্ড হয়েছে, যা আমাদের জন্য বড় সুযোগ। পাশাপাশি ফিশও আমাদের দেশ থেকে ভালো পরিমাণে চায়নাতে যাচ্ছে।’
ক্যান্টন ফেয়ারের সম্ভাবনা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘ক্যান্টন ফেয়ার নিয়ে আমরা ভাবছি যে আগে উল্লেখ করা সেক্টরগুলোতে এখানে একটি বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। চীন ও বাংলাদেশের এক্সপোর্টের মধ্যে যে স্ট্র্যাটেজিক গ্যাপ রয়েছে, তা আমরা ফারদার পেনিট্রেশনের মাধ্যমে কমিয়ে আনতে পারি।’
অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্য ক্যান্টন ফেয়ারের গুরুত্ব শুধু চীন থেকে পণ্য কেনার সুযোগে সীমাবদ্ধ নয়। বরং চীনের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের প্রবেশ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এটিকে একটি সম্ভাবনাময় প্লাটফর্ম হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইপিবির এ দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ক্যান্টন ফেয়ারের বহুমুখী কাঠামোরও একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। মেলায় ইলেকট্রনিকস, চামড়া, পাট, পোশাক, হোম টেক্সটাইল, যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন ভোক্তা পণ্যের পাশাপাশি বিস্তৃত শিল্পপণ্য প্রদর্শিত হয়। ফলে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় রফতানি খাতগুলোকে একই আন্তর্জাতিক প্লাটফর্মে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়।
বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের অন্যান্য আন্তর্জাতিক মেলায় অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতাও ক্যান্টন ফেয়ারের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। ইপিবির পরিচালক বলেন, ‘এ মেলাটি অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং করবে। বাংলাদেশ থেকে যারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মেলাগুলোতে (যেমন জার্মানির অ্যাম্বিয়েন্তে বা টেক্সওয়ার্ল্ড) অংশ নেয়, বিশেষ করে অ্যাম্বিয়েন্তে ফেয়ারে যারা অংশ নেয়, তারা এ ক্যান্টন ফেয়ারের জন্যও আগ্রহী।’
তার ভাষায়, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়নে আমরা এরই মধ্যে ভালো মার্কেট ক্রিয়েট করতে সক্ষম হয়েছি। কোম্পানিগুলো যদি এ মেলাগুলোতে অংশ নেয়, তবে অন্যান্য খাতের পাশাপাশি আমাদের বায়োডিগ্রেডেবল বা ডাইভার্সিফায়েড জুট প্রডাক্টসের জন্য একটি ভালো ডিমান্ড তৈরি হবে, যা আমাদের এক্সপোর্ট ১ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে খুবই কাজে দেবে।’
এখানে ক্যান্টন ফেয়ারের ভূমিকা শুধু একটি বাজারে প্রবেশের সুযোগ হিসেবে নয়, বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর একটি সম্ভাব্য মাধ্যম হিসেবেও সামনে আসে। বিশেষ করে পাট ও পাটজাত পণ্যের ক্ষেত্রে নতুন ধরনের পণ্যের বাজার তৈরির সুযোগকে গুরুত্ব দিচ্ছে ইপিবি।
চীনের বাজারে বাংলাদেশের সুযোগ কতটা?
চীনের বাজার বাংলাদেশের জন্য বড় হলেও সেখানে প্রবেশের বাধা কম নয়। চীনের বিশাল উৎপাদন সক্ষমতার কারণে স্থানীয় বাজারে প্রতিযোগিতাও তীব্র। ফলে বাংলাদেশী পণ্য সেখানে পাঠাতে হলে শুধু কম দাম যথেষ্ট নয়। মান, সরবরাহের ধারাবাহিকতা, পণ্যের বৈচিত্র্য, সময়মতো সরবরাহ এবং চীনা ক্রেতার নির্দিষ্ট চাহিদা পূরণের সক্ষমতাও দরকার।
ক্যান্টন ফেয়ারের মতো মেলায় অংশগ্রহণের মূল্য এখানেই। এখানে একটি দেশের উদ্যোক্তা শুধু ক্রেতা খোঁজেন না, বাজারের চাহিদাটিও বোঝার সুযোগ পান। কোন পণ্য চলছে, কোন ধরনের প্যাকেজিং ব্যবহার হচ্ছে, কোন প্রযুক্তি নতুন করে আসছে, কোন মানদণ্ড গুরুত্ব পাচ্ছে, কী ধরনের পণ্য বেশি প্রদর্শিত হচ্ছে, কোন দেশ বা অঞ্চলের ক্রেতারা সক্রিয়, এসব তথ্য ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখতে পারে।
২০২৫ সালের ১৩৭তম ক্যান্টন ফেয়ারে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৪৫০ জন ক্রেতা বেল্ট অ্যান্ড রোডভুক্ত দেশগুলো থেকে এসেছিলেন। চীনের সরকারি হিসাবে, এ সংখ্যা মোট বিদেশী ক্রেতার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।
বাংলাদেশও বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগিতার অংশীদার। ফলে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের জন্য ক্যান্টন ফেয়ার শুধু চীনা বাজার নয়, এশিয়া, আফ্রিকা ও অন্যান্য উদীয়মান বাজারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও যোগাযোগের সম্ভাব্য জায়গা।
ক্যান্টন ফেয়ারের বাইরে আরেক মেলা
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক যোগাযোগ শুধু ক্যান্টন ফেয়ারে সীমাবদ্ধ নয়। ইপিবির পরিচালক আবু মোখলেছ আলমগীর হোসেনের বক্তব্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনের কথাও উঠে এসেছে। তিনি বলেন, ‘এর পাশাপাশি আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মেলা হলো চায়না ইন্ডাস্ট্রি ইম্পোর্ট এক্সপোর্ট। চীন মূলত তাদের সাপ্লাই চেইনকে ইন্টারাপ্ট-ফ্রি বা সচল রাখার জন্য এ ইম্পোর্ট-এক্সপোর্ট মেলার আয়োজন করে থাকে।’
বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়েও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তার ভাষায়, ‘আগামী নভেম্বরের মেলায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ হবে অত্যন্ত জোরালো; সেখানে অ্যাপারেল থেকে শুরু করে লেদার, জুট, সেমিকন্ডাক্টর এবং ইলেকট্রনিকস খাত অংশ নেবে।’
বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য এ ধরনের মেলার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘মূলত এসএমইদের প্রমোট করার জন্য আমরা এ মেলাগুলোকে ব্যবহার করি। বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ভবিষ্যতের জন্য ক্যান্টন ফেয়ার এবং চায়না ইম্পোর্ট এক্সপোর্ট, উভয় মেলাই অত্যন্ত ক্রুশিয়াল ভূমিকা পালন করবে।’
এ বক্তব্যে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্পর্কের আরেকটি দিক স্পষ্ট হয়। চীনের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি বাড়াতে হলে শুধু বড় রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান নয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদেরও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। ক্যান্টন ফেয়ার ও অন্যান্য বাণিজ্য মেলা সেই সংযোগ তৈরির একটি মাধ্যম হতে পারে।
বাণিজ্য ঘাটতির বিপরীতে নতুন সমীকরণ
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্পর্কের সবচেয়ে বড় অসামঞ্জস্য হলো আমদানি ও রফতানির ব্যবধান। এ ব্যবধান রাতারাতি কমার নয়। বাংলাদেশের শিল্প উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে চীন থেকে কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির আমদানিও বাড়তে পারে।
তাই ক্যান্টন ফেয়ারকে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর সরাসরি সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটিকে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক সক্ষমতা বাড়ানোর একটি মাধ্যম হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসংগত।
একই মেলায় বাংলাদেশের উদ্যোক্তা চীন থেকে এমন একটি যন্ত্র কিনতে পারেন, যা দেশে উৎপাদনশীলতা বাড়াবে। আবার একই উদ্যোক্তা চীনা কোনো ক্রেতার কাছে বাংলাদেশের তৈরি পণ্যও তুলে ধরতে পারেন। একটি সম্পর্কের এক প্রান্তে আমদানি, অন্য প্রান্তে রফতানি। মাঝখানে রয়েছে প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, যোগাযোগ ও ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব।
এ জায়গাতেই ক্যান্টন ফেয়ার বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ইপিবির হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ এরই মধ্যে চীনে প্রায় ৮০০ ধরনের পণ্য রফতানি করছে। এখন সেই পণ্যের বাজার আরো গভীরে প্রবেশ করানোর সুযোগ তৈরি করাই বড় চ্যালেঞ্জ। ইলেকট্রনিকস, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য এবং কৃষিপ্রক্রিয়াজাত পণ্যের মতো খাতে সম্ভাবনা কাজে লাগানো গেলে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কের বিদ্যমান ভারসাম্যহীনতায় কিছুটা পরিবর্তন আনা সম্ভব হতে পারে।
চীনের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে তাই ক্যান্টন ফেয়ারকে একটি যোগাযোগের দরজা হিসেবে দেখা যায়। তবে সেই দরজা দিয়ে প্রবেশের পর বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের মান, প্রতিযোগিতা, সরবরাহ সক্ষমতা ও বাজারের চাহিদার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাওয়াতে হবে।
বাংলাদেশের অংশগ্রহণের পরবর্তী প্রশ্ন
বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের জন্য এখন প্রশ্ন হওয়া উচিত, ক্যান্টন ফেয়ারে কতজন গেলেন, তার চেয়ে সেখানে গিয়ে কী অর্জন করা হলো।
যদি অংশগ্রহণের মূল উদ্দেশ্য হয় কম দামে চীনা পণ্য সংগ্রহ, তাহলে ক্যান্টন ফেয়ার বাংলাদেশের আমদানির দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করবে। কিন্তু যদি লক্ষ্য হয় নতুন বাজার, নতুন ক্রেতা, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং স্থানীয় উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো, তাহলে এর প্রভাব আরো বিস্তৃত হতে পারে।
বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের এককভাবে ক্রেতা খোঁজা কঠিন। একটি বড় আন্তর্জাতিক মেলা তাদের একই জায়গায় বহু দেশের ক্রেতা ও সরবরাহকারীর সামনে পৌঁছানোর সুযোগ দেয়।
বাংলাদেশের রফতানি খাতের সামনে এখন দুটি বড় প্রয়োজন। প্রথমত, প্রচলিত রফতানি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা। দ্বিতীয়ত, নতুন পণ্য ও নতুন বাজার তৈরি করা। ক্যান্টন ফেয়ারের মতো বড় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্লাটফর্ম সেই দুই ক্ষেত্রেই পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখতে পারে।
সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে অংশগ্রহণকে কেবল ব্যবসায়িক সফর হিসেবে দেখলে চলবে না। কোন খাতের কতটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে, কী পণ্য নিয়ে যাচ্ছে, কতটি ব্যবসায়িক যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে, কতটি সম্ভাব্য রফতানি আদেশ আসছে, কতটি প্রযুক্তি বা বিনিয়োগ চুক্তিতে রূপ নিচ্ছে, তার হিসাবও প্রয়োজন।
কারণ শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার সাফল্য শুধু দর্শনার্থীর সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। মাপতে হয় মেলার দরজা দিয়ে কতটা ব্যবসা দেশে ঢুকল এবং বাংলাদেশের কতটা পণ্য সেই দরজা দিয়ে বিশ্ববাজারে বেরিয়ে গেল।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতায় ক্যান্টন ফেয়ার সেই দরজাগুলোর একটি। এতদিন চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য আলোচনায় বড় জায়গা দখল করেছে আমদানি। ভবিষ্যতের আলোচনায় যদি রফতানি, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক অংশীদারত্বের জায়গা বাড়াতে হয়, তাহলে ক্যান্টন ফেয়ারের মতো প্লাটফর্মকে নতুন করে দেখা প্রয়োজন।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের আরেক ঠিকানা তাই ক্যান্টন ফেয়ার। তবে সেটি শুধু চীনা পণ্য কেনার ঠিকানা হলে সম্পর্কের পুরনো সমীকরণই আরো শক্ত হবে। আর যদি একই ঠিকানা থেকে বাংলাদেশের পণ্য, প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগের নতুন পথ তৈরি করা যায়, তাহলেই এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব নতুন মাত্রা পাবে।










