ফলে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কের পরিচিত আমদানিনির্ভর কাঠামোর পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে স্থানীয় উৎপাদন, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও মূল্য সংযোজনের আরেকটি স্তর।

হায়ার বাংলাদেশ লিমিটেডের কার্যক্রম এ পরিবর্তনের একটি উদাহরণ। হায়ার বাংলাদেশ লিমিটেড গাজীপুরে অবস্থিত একটি বহুজাতিক ইলেকট্রনিকস ও গৃহস্থালি পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে এয়ার কন্ডিশনার, ওয়াশিং মেশিন, টিভি, রেফ্রিজারেটর, ফ্রিজারসহ বিভিন্ন গৃহস্থালি পণ্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদন, আমদানি ও বাজারজাত করে আসছে।

হায়ার বাংলাদেশ লিমিটেড বৈশ্বিক হায়ার গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং হায়ার স্মার্ট হোম কোম্পানি, লিমিটেডের বৈশ্বিক কার্যক্রমের সঙ্গে সংযুক্ত। হায়ার স্মার্ট হোম ২০২৬ সালের ফরচুন গ্লোবাল ফাইভ হানড্রেড তালিকায় ৩৭৮তম অবস্থানে রয়েছে। এছাড়া ইউরোমনিটর ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, হায়ার টানা ১৭ বছর বিশ্বব্যাপী প্রধান হোম অ্যাপ্লায়েন্সেস ব্র্যান্ড হিসেবে বিক্রয় পরিমাণের ভিত্তিতে প্রথম অবস্থান ধরে রেখেছে। বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরুর পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় উৎপাদন সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি স্থানান্তর, স্থানীয় মূল্য সংযোজন এবং দেশীয় সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়নে অবদান রেখে আসছে।

এ পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রায় ১৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, ব্যবসায়িক কার্যক্রম আরম্ভের বছর ২০২১ সাল থেকে এ পর্যন্ত রাজস্ব খাতে আনুমানিক ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা জমা দিয়েছে।

হায়ার বাংলাদেশ লিমিটেডের সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং ডিরেক্টর আশরাফুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হায়ারের ব্যাকগ্রাউন্ড অনেক শক্তিশালী। একটি উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে হায়ার বাংলাদেশে “‍মেড ইন বাংলাদেশ” উদ্যোগকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা হ্রাস, স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দেশীয় সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়নে কাজ করছে। ভবিষ্যতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক উৎপাদন কেন্দ্র (লোকাল ম্যানুফ্যাকচারিং হাব) হিসেবে গড়ে তুলতেও প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে। একই সঙ্গে প্রযোজ্য মূল্য সংযোজন কর, আয়কর ও শুল্কসংক্রান্ত আইন-বিধি যথাযথভাবে পরিপালনের মাধ্যমে স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।’

হায়ার বাংলাদেশ লিমিটেড কাস্টমস এসআরও ১৬৭ ও ভ্যাট এসআরও ১৪৬ অনুযায়ী স্থানীয়ভাবে এয়ার কন্ডিশনার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রযোজ্য অব্যাহতি সুবিধা গ্রহণ করছে। এসআরও ১৬৭ অনুযায়ী নির্ধারিত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের মধ্যে ন্যূনতম তিনটি স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের শর্ত থাকলেও হায়ার বাংলাদেশ বর্তমানে পাঁচটি অংশই স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করছে।

পাশাপাশি এসআরও ১৪৬ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আধুনিক ও অত্যাধুনিক উৎপাদন মেশিনারিজ এবং পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন অবকাঠামো হায়ারের নিজস্ব কারখানায় স্থাপিত রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখযোগ্য স্থানীয় মূল্য সংযোজন ও উৎপাদন সক্ষমতা নিশ্চিত করছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও ভ্যাট কমিশনারেটের কারখানা পরিদর্শন, উৎপাদন লাইন ও মেশিনারিজ যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষার মাধ্যমে হায়ারের উৎপাদন কার্যক্রম ও এসআরও পরিপালন যাচাই করা হয়েছে। পরিদর্শন ও যাচাইয়ের ভিত্তিতেই প্রযোজ্য সুবিধা অনুমোদন করা হয়েছে এবং নিয়মিতভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই-বাছাই অব্যাহত রয়েছে বলে জানান আশরাফুল আলম।

কোম্পানির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, হায়ার বাংলাদেশ লিমিটেড এসআরও ১৯৫ অনুযায়ী স্থানীয়ভাবে ওয়াশিং মেশিন উৎপাদন করছে এবং এনবিআর ও ভ্যাট কমিশনারেটের পরিদর্শন ও যাচাইয়ের মাধ্যমে এ সুবিধা অনুমোদিত হয়েছে।

বাজারের চাহিদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সম্পূর্ণ প্রস্তুত ইউনিট (সিবিইউ) ওয়াশিং মেশিন, ফ্রিজার/রেফ্রিজারেটর এবং পরিবর্তনশীল রেফ্রিজারেন্ট প্রবাহ ব্যবস্থা (ভিআরএফ) ও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এসি আমদানি করা হয়। এসব আমদানিতে প্রযোজ্য কাস্টমস ডিউটি, ভ্যাট, এইআইটি ও অন্যান্য শুল্ক-কর যথাযথভাবে পরিশোধ করা হয়। স্থানীয় উৎপাদন সিবিইউ আমদানি সম্পূর্ণ পৃথক কার্যক্রম এবং উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য আইন ও কাস্টমস বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়।

আশরাফুল আলম

আশরাফুল আলম: সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং ডিরেক্টর, হায়ার বাংলাদেশ লিমিটেড

বাংলাদেশে স্থানীয় উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাজারের বৈশিষ্ট্যও বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে। আশরাফুল আলম বলেন, ‘বাজারভেদে কিছু প্রডাক্ট লাইন ও মডেলে ভিন্নতা থাকে। যেমন চীনের কিছু ফ্রিজ বাংলাদেশে চললেও স্থানীয় চাহিদার পার্থক্যের কারণে সব মডেল এখানে সমানভাবে মানানসই হয় না। সে বিষয়গুলো মাথায় রেখেই মূলত বাংলাদেশের বাজারকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে ম্যানুফ্যাকচারিং করা হয়।’

এসির বাজারকে স্থানীয় উৎপাদনের অন্যতম সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে প্রতিষ্ঠানটি। আশরাফুল আলম আরো যোগ করেন, ‘বাংলাদেশে এসির বাজার অনেক সম্ভাবনাময় হলেও এর সুনির্দিষ্ট ব্যাপ্তি বা পেনিট্রেশন এখনো বেশ কম। জাপানে প্রায় ৯৯ শতাংশ এবং চীনে প্রায় ৭০ শতাংশ পরিবারে এসি ব্যবহৃত হলেও ভারত ও বাংলাদেশে এ হার যথাক্রমে ৬-৭ শতাংশ এবং প্রায় ৪ শতাংশ। ফলে দেশের বিশাল এ বাজারকে কেন্দ্র করে একটি টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ার বড় সুযোগ রয়েছে।

স্থানীয় উৎপাদনের সঙ্গে প্রযুক্তি স্থানান্তর ও মূল্য সংযোজনের বিষয়টিও যুক্ত। পাঁচ-ছয় বছর বা তারও আগে যে এসির দাম ১ লাখ টাকার ওপরে ছিল কিংবা যে ওয়াশিং মেশিনের দাম ছিল প্রায় ৮০ হাজার টাকা, সেগুলো এখন মানুষের অনেক বেশি নাগালের মধ্যে চলে এসেছে। স্থানীয় উৎপাদনের মাধ্যমেই এ মূল্য সমন্বয় করা সম্ভব হয়েছে।’

চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের সৌহার্দ্যপূর্ণ ও পারস্পরিক সহযোগিতামূলক ব্যবসায়িক সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় হায়ার বাংলাদেশ স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি, দেশীয় সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে।

হায়ারের স্থানীয় উৎপাদন ক্রমাগত সম্প্রসারিত হলেও বাজারের চাহিদা ও পণ্যের বৈচিত্র্য বিবেচনায় কিছু নির্দিষ্ট পণ্য ও মডেল এখনো আমদানি করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন পণ্য বাংলাদেশে সংযোজন ও উৎপাদন করা হচ্ছে। ফলে হায়ারের কার্যক্রমে আমদানি ও স্থানীয় উৎপাদন পরস্পরের বিকল্প নয়, বরং পরিপূরক। এ সমন্বিত কার্যক্রম চীন-বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করছে।

বাংলাদেশ সরকারের শিল্পায়ন ও স্থানীয় উৎপাদন সম্প্রসারণের লক্ষ্যকে সমর্থন করে হায়ার বাংলাদেশ লিমিটেড দেশের প্রচলিত আইন, কাস্টমস ও ভ্যাট বিধিমালা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি নীতিমালা সম্পূর্ণভাবে পরিপালন করে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। উৎপাদন, স্থানীয় মূল্য সংযোজন ও আমদানি প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত বিধিবিধান ও নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করে থাকে।

সর্বোপরি বলা যায়, ভবিষ্যতের চীন-বাংলাদেশ বাণিজ্য শুধু আমদানিনির্ভর না হয়ে বাংলাদেশে উৎপাদন, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও স্থানীয় মূল্য সংযোজন বৃদ্ধির মাধ্যমে আরো গভীর অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।