তবে উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় রফতানি অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক মানের প্যাকেজিং, উদ্ভিদ সংগনিরোধ (ফাইটোস্যানিটারি) ব্যবস্থা, শীতল সরবরাহ ব্যবস্থা ও পরিবহন ব্যয় এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

চীনের বাজারে বাংলাদেশের আম প্রবেশের আনুষ্ঠানিক পথ তৈরি হয় ২০২৪ সালে। ওই বছরেরর ১০ জুলাই চীনে ফ্রেশ আম রফতানির বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্বাক্ষর হয়। এরপর ২৬ জুলাই চীনের জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমস (জিএসিসি) বাংলাদেশ থেকে নির্দিষ্ট ফাইটোস্যানিটারি শর্ত পূরণ করা তাজা আম আমদানির অনুমোদন দেয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের মে মাসে চীনে প্রথম বাণিজ্যিক চালানে আম রফতানি শুরু করে বাংলাদেশ। প্রথম চালানে তিন টন আম পৌঁছায় এবং সেখানে ফাইটোস্যানিটারি সনদ, প্যাকেজিং ও ফলের গুণমান পরীক্ষা করে চালানটি ছাড় করা হয়। তবে বাজারে প্রবেশের পরও রফতানির পরিমাণ এখনো খুবই সীমিত।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২৫ সালে চীনে আম রফতানি হয়েছে মাত্র ৫ দশমিক ২২ টন। ২০২৬ সালের চলতি মৌসুমে জুলাই পর্যন্ত রফতানি হয়েছে প্রায় ৭০০ কেজি।

অন্যদিকে দেশে আমের উৎপাদন সক্ষমতা যথেষ্ট। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে আম উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২৬ দশমিক ৭০ লাখ টন, বিপরীতে বিভিন্ন দেশে রফতানি হয়েছে ২ হাজার ১৯৪ টন।

চীনে আম রফতানি ধীরগতির পেছনে বেশকিছু কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশ ও চীনের আমের মৌসুম কাছাকাছি সময়ে। সেখানকার স্থানীয় আমের দাম তুলনামূলক সস্তা। ফলে বাংলাদেশী আমকে ‘নিস মার্কেট’ হিসেবে বিক্রি করতে হচ্ছে। এছাড়া পরিবহন ব্যয়, চীনের ফাইসোস্যানিটারি ও নিবন্ধন, উদ্ভিদ সংগনিরোধ এবং জিএসিসিতে নিবন্ধনসহ একাধিক কমপ্লায়েন্স পূরণ করতে হয়। ফলে আমের রফতানি সেই অর্থে বাড়েনি।

চীনের বাজারে অনুমোদন পাওয়ার পর এখন পর্যন্ত আম রফতানি করেছে শুধু ‘মেরিডিয়ান গ্রুপ’।

চীনের বাজারে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে কাঁঠাল নিয়েও। গত ২৭ জুলাই নির্ধারিত ফাইটোস্যানিটারি শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বাংলাদেশ থেকে তাজা কাঁঠাল আমদানির অনুমোদন দিয়েছে চীনের জিএসিসি। এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় কাঁঠাল রফতানির বিষয়ে একটি এমওইউ হয় দুই দেশের মধ্যে। চীনের বাজারে বাংলাদেশের তাজা কাঁঠাল রফতানির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন মিললেও জুড়ে দিয়েছে নানা শর্ত। সেগুলো পূরণ করাই বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা। চীনের শর্তানুযায়ী, শুধু ভালো মানের কাঁঠাল উৎপাদন করলেই হবে না, বাগান নির্বাচন থেকে শুরু করে ফলের ব্যাগিং, কীটপতঙ্গ দমন, কীটনাশক ব্যবহারের হিসাব সংরক্ষণ, প্যাকিং, লেবেলিং, ফাইটোস্যানিটারি পরীক্ষা এবং পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ চীনের বাজারে কাঁঠাল পাঠানোর সক্ষমতা এখন নির্ভর করবে বাংলাদেশের কৃষক ও রফতানিকারকদের পাশাপাশি কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্র এবং বেসরকারি খাতের সমন্বিত প্রস্তুতির ওপর। আম ও কাঁঠালের অনুমোদন মিললেও পেয়ারা নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে। এর আগে চীনই আম-কাঁঠালের পাশাপাশি পেয়ারা আমদানির আগ্রহ প্রকাশ করেছিল।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এএইচএম সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কোন দেশে কী পণ্য পাঠালে আমার লাভ হবে সেটি আগে ঠিক করতে হবে। এরপর সেটির উৎপাদনে গ্লোবাল গ্যাপ বা সংশ্লিষ্ট দেশের গ্যাপ (উত্তম কৃষিচর্চায় সংশ্লিষ্ট দেশের পলিসি) মেনে উৎপাদন করতে হবে। তাহলে সেই দেশের বাজারে আমাদের পণ্য জায়গা করে নিতে পারবে। অন্যথায় কমপ্লায়েন্স তৈরি হবে। আর ভোক্তাদের পণ্য নিয়ে অভিযোগ থাকলে তখন বাজার হারিয়ে যাবে। তাই রফতানির জন্য পণ্যের গুণগত মান ঠিক রাখা জরুরি।’

কৃষিজ পণ্যের রফতানি বাজার ধরতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ঢাকার গাবতলীতে ওয়ান-স্টপ সেবা চালুর উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। সেখানে ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট (ভিএইচটি) সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। ভিএইচটিতে পণ্য শোধনাগার, প্যাকিং এবং কোয়ারেন্টাইন সম্পন্ন করে সরাসরি বিমানবন্দরে পাঠাতে পারবেন রফতানিকারকরা। এছাড়া বিমানবন্দরে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত স্বল্পমেয়াদি সংরক্ষণ সুবিধা স্থাপনের উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে, যা আমসহ দ্রুত পচনশীল ফল রফতানিতে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছে কৃষি মন্ত্রণালয়।

সার্বিক বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিভিন্ন দেশে ফল রফতানি বাড়াতে আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি। চীনের সঙ্গে আমাদের আলোচনা চলছে। কী কী ফল রফতানি করা যায়, সেটি কীভাবে এবং প্রতি বছর কতটুকু রফতানি করতে পারি—এটি নিয়ে আমরা একটা ফ্রেমওয়ার্ক দাঁড় করানোর চেষ্টা করছি। আশা করছি শিগগিরই একটা রেজাল্ট দেয়া যাবে।’

আম রফতানির এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রা অর্জিত হয়নি। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মার্কেট তো একদিনে তৈরি হয় না। এটি তৈরি হতে একটু সময় লাগে। এখানে কোনো বাধা আছে বলে মনে করি না। রফতানি বাড়াতে হলে গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস (গ্যাপ) লাগে। এ ধরনের কিছু বাগান আমাদের তৈরি হচ্ছে, আমাদের সহযোগিতা ও পরামর্শে কৃষক উদ্যোক্তারা চেষ্টা করছেন। এখান থেকে যে ফল উৎপাদন হয় সেগুলো আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী হয়। সেগুলোর প্যাকেজিং, রক্ষণাবেক্ষণ থেকে শুরু করে সবকিছু আরেকটু ভালো হয়। এখানে আমাদের পরিধিটা আরেকটু বৃদ্ধি করতে হবে। গ্যাপের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী আমাদের কোয়ালিটিটা আরো উন্নত করার চেষ্টা করছি। এটা ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে আমাদের আন্তর্জাতিক বাজারে আরো গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। তখন আমসহ অন্যান্য ফলমূল রফতানিও বাড়ানো সম্ভব হবে।