শিল্পাঞ্চল থেকে বন্দর, রাজধানী থেকে সীমান্ত এবং দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে পণ্য দ্রুত ও কম খরচে পরিবহনের সক্ষমতা না বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন। এ বাস্তবতায় সড়ক, সেতু, উড়ালসড়ক ও মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন বড় অবকাঠামো প্রকল্পে চীনা প্রকৌশল ও নির্মাণপ্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বাংলাদেশে চীনের ভূমিকা শুধু অর্থায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন প্রকল্পে চীনা প্রতিষ্ঠান ঋণদাতা দেশের প্রতিষ্ঠান হিসেবে অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি ঠিকাদার, বিনিয়োগকারী, প্রকৌশল সেবাদাতা ও নির্মাণপ্রযুক্তি সরবরাহকারী হিসেবেও কাজ করছে। ফলে এসব প্রকল্পের মাধ্যমে একদিকে যেমন বাংলাদেশের পরিবহন সক্ষমতা বাড়ছে, অন্যদিকে চীনা প্রকৌশল, নির্মাণপ্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিরও ব্যবহার বাড়ছে।
সব প্রকল্পে চীনের ভূমিকা এক নয়। কোথাও চীনা প্রতিষ্ঠান মূল ঠিকাদার, কোথাও যৌথ উদ্যোগে, আবার কোথাও বড় কোনো বিদেশী ঠিকাদারের অধীনে উপঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে। প্রকল্পভেদে তাদের দায়িত্বও আলাদা—কোথাও ভূগর্ভস্থ টানেল ও স্টেশন নির্মাণ, কোথাও পাইল-পিয়ার ও পূর্বনির্মিত কাঠামো স্থাপন, আবার কোথাও মহাসড়ক, সেতু ও ড্রেনেজ অবকাঠামো নির্মাণ।
বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্প এমআরটি লাইন-১। বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর এবং নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত মোট ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এ প্রকল্পের বড় অংশ ভূগর্ভে নির্মিত হবে। অন্যদিকে হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত তৈরি করা হবে ঢাকার তৃতীয় মেট্রোরেল লাইন (এমআরটি লাইন-৫, নর্দার্ন রুট)। পাতালপথ ও উড়ালপথের সমন্বয়ে নির্মিতব্য এ মেট্রোরলের দৈর্ঘ্য ২০ কিলোমিটার। ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকার মাটির নিচে টানেল ও স্টেশন নির্মাণের কারণে প্রকল্প দুটি দেশের সবচেয়ে জটিল নগর পরিবহন অবকাঠামোর একটি।
এ দুই প্রকল্পে চীনের একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যুক্ত হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিএলের) কর্মকর্তারা। বর্তমানে প্রকল্প দুটির দরপত্র প্রক্রিয়া চলমান আছে।
দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল সাভার-আশুলিয়াকে রাজধানীর সঙ্গে দ্রুতগতির যোগাযোগে আনতে নির্মাণ করা হচ্ছে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। প্রায় ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এ উড়ালসড়ক বিমানবন্দর এলাকা থেকে আবদুল্লাহপুর, আশুলিয়া হয়ে ঢাকা ইপিজেড ও নবীনগরের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করবে।
এ প্রকল্পের প্রধান ঠিকাদার চীনের চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন বা সিএমসি। এর অধীনে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ, জিয়াংসু প্রভিন্সিয়াল ট্রান্সপোর্টেশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ এবং চায়না রেলওয়ে ষোড়শ ব্যুরো গ্রুপসহ একাধিক চীনা প্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজে যুক্ত রয়েছে।
পাইল ফাউন্ডেশন, পিয়ার, পিয়ার ক্যাপ, পূর্বনির্মিত টি-বিম, সেতুর ডেক ও বিভিন্ন সংযোগ অবকাঠামো নির্মাণে এসব প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। বড় শিল্পাঞ্চলকে দ্রুতগতির সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার কারণে প্রকল্পটি বহির্বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
সাভার-আশুলিয়ায় তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন রফতানিমুখী শিল্পের কারখানা রয়েছে। এখান থেকে পণ্য ঢাকা হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরসহ বিভিন্ন গন্তব্যে যায়। যানজটের কারণে পণ্য পরিবহনে দীর্ঘ সময় লাগলে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়ে। উড়ালসড়ক চালু হলে শিল্পাঞ্চল থেকে পণ্যবাহী যান দ্রুত বন্দরমুখী সড়কে পৌঁছতে পারবে, যা রফতানি সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের গুরুত্ব রাজধানী ও সিলেটের যোগাযোগের বাইরেও বিস্তৃত। প্রায় ২১০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ মহাসড়ক সিলেট, তামাবিল ও শেওলা স্থলবন্দরের মাধ্যমে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রকল্পের বিভিন্ন প্যাকেজে লংজিয়ান রোড অ্যান্ড ব্রিজ কোম্পানি লিমিটেড, চায়না রেলওয়ে ফার্স্ট গ্রুপ, চায়না কনস্ট্রাকশন সপ্তম ইঞ্জিনিয়ারিং ডিভিশন, সিনোহাইড্রো ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যুরো আট করপোরেশন লিমিটেড, হেনান হাইওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড (হেগো), ঝেংঝো সিটি হাইওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন লিমিটেড, সিচুয়ান রোড অ্যান্ড ব্রিজ গ্রুপ, চায়না শ্যাংডং ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল করপোরেশন গ্রুপ লিমিটেড এবং শ্যাংডং লুকিয়াও কোম্পানি লিমিটেডের মতো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। তাদের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে চার লেনের সড়ক নির্মাণ, মাটির কাজ, পেভমেন্ট, সেতু, কালভার্ট, উড়ালপথ ও ড্রেনেজ অবকাঠামো নির্মাণ। বিভিন্ন প্যাকেজে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানও চীনা ঠিকাদারদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে।
মহাসড়কটি উন্নত হলে তামাবিল ও শেওলা স্থলবন্দরকেন্দ্রিক পণ্য পরিবহনে গতি আসতে পারে। ভারতের আসাম, মেঘালয় ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে এসব অঞ্চলের পণ্য বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে যাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়তে পারে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে রাজধানীর অন্যতম বড় উড়ালসড়ক প্রকল্প। এর বিমানবন্দর থেকে ফার্মগেট অংশ এরই মধ্যে যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে। বাকি অংশ চালু হলে রাজধানীর ভেতরের সড়কে চাপ কমিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ তৈরি হবে।
এ প্রকল্পে চীনের ঠিকাদার শ্যাংডং ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল করপোরেশন গ্রুপ লিমিটেড এবং সিনো-হাইড্রো করপোরেশন লিমিটেডের সম্পৃক্ততা রয়েছে। বিনিয়োগ, নির্মাণ ও পরিচালনার বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করছে।
এ প্রকল্পের পিয়ার, ভায়াডাক্ট, রÅvম্পসহ বিভিন্ন উড়াল কাঠামো নির্মাণে চীনা প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রকল্পটির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হলে উত্তর ও পশ্চিম দিক থেকে আসা যানবাহন রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এড়িয়ে দ্রুত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পৌঁছতে পারবে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম। ফলে রাজধানী ও শিল্পাঞ্চল থেকে চট্টগ্রামমুখী পণ্য পরিবহনে সময় কমানো গেলে আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
যমুনা নদীতে নতুন রেলওয়ে সেতু চালু হওয়ার পর পুরনো সেতুর ওপর থাকা রেল লেনকে সড়ক লেনে রূপান্তরের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিদ্যমান অবকাঠামোর ব্যবহার বাড়িয়ে সেতুর সড়ক সক্ষমতা বৃদ্ধিই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
এ কাজের সঙ্গে চীনের চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি এবং চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন যুক্ত রয়েছে। পুরনো রেল লেনের কাঠামো সংস্কার, ডেক উন্নয়ন ও সড়ক ব্যবহারের উপযোগী করার বিভিন্ন কারিগরি কাজ তাদের সম্পৃক্ততায় হচ্ছে।
যমুনা সেতু দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলকে পূর্বাঞ্চল ও রাজধানীর সঙ্গে যুক্ত করেছে। ফলে এ অংশে সড়ক সক্ষমতা বাড়লে উত্তরাঞ্চল থেকে কৃষিপণ্য, শিল্পপণ্য ও অন্যান্য পণ্য দ্রুত রাজধানী ও দেশের পূর্বাঞ্চলে পরিবহনের সুযোগ তৈরি হবে।
এসব প্রকল্পে চীনা প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রকৌশল ও নির্মাণপ্রযুক্তির ব্যবহার। বড় পাইল ফাউন্ডেশন, পূর্বনির্মিত কাঠামো, টানেল নির্মাণ, উড়ালসড়ক ও সেতু নির্মাণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে স্থানীয় প্রকৌশলী ও নির্মাণকর্মীদেরও নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ হচ্ছে।
বাংলাদেশের রফতানিমুখী শিল্পের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয়। কারখানা থেকে বন্দর পর্যন্ত যোগাযোগ যত দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য হবে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও তত বাড়বে।
এ বিবেচনায় ঢাকা-আশুলিয়া ও ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে শিল্পাঞ্চলকে বন্দরমুখী করিডোরের সঙ্গে যুক্ত করবে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক স্থলবন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্যের সুযোগ বাড়াবে। আর যমুনা সেতুর সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ উত্তরাঞ্চলের পণ্য পরিবহনে গতি আনতে পারে।
তবে শুধু সড়ক নির্মাণ করলেই বহির্বাণিজ্য বাড়বে না। বন্দরের সক্ষমতা, কাস্টমস কার্যক্রম, সীমান্তে পণ্য খালাসের সময় এবং সড়ক, রেল ও নৌপথের সমন্বিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পগুলোর নির্মাণ ব্যয়, ঋণের শর্ত, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ও অর্থনৈতিক সুফলও বিবেচনায় রাখতে হবে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের পরিবহন অবকাঠামোয় চীনের উপস্থিতি এখন ঋণ বা ঠিকাদারির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পাতাল রেলের টানেল থেকে উড়ালসড়ক, চার লেনের মহাসড়ক থেকে সেতু সংস্কার—বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীনা প্রকৌশল, প্রযুক্তি ও নির্মাণ অভিজ্ঞতা ব্যবহার হচ্ছে। এসব প্রকল্প সময়মতো ও সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে শিল্পাঞ্চল, রাজধানী, স্থলবন্দর ও সমুদ্রবন্দরের মধ্যে যোগাযোগ আরো কার্যকর হবে। এতে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় কমার পাশাপাশি আঞ্চলিক বাণিজ্য ও বহির্বাণিজ্য সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।





