আমরা চীন থেকে আমদানিনির্ভর দেশ। চীনের সঙ্গে আমাদের ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট ট্রেড ডেফিসিটটা অনেক বেশি। চীন থেকে আমরা বেসিক প্রডাক্ট থেকে হাই-এন্ড, টেকনোলজি-বেইজড প্রডাক্ট পর্যন্ত বাংলাদেশে এনে থাকি। এর ফলে আমরা যে সুবিধাটা পাই, সার্বিকভাবে শুধু ইমপোর্টের ফলে যে আমরা কম দামে পাই, সেটাও বিষয় না। আমাদের জন্য এটা অনেক কনভিনিয়েন্স বেশির ভাগ সময়। কারণ, আমাদের আশপাশে অনেক দেশে এ ধরনের প্রডাক্ট প্রডিউসও হয় না। কিন্তু আমরা সেই সুবিধাটা নিতে পারছি চীন থেকে।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যেটা দেখেছি যে যেই এক্সপোর্ট জোন নিয়ে সবসময় আমরা কথা বলি, বিশেষ করে আমাদের রেডিমেড গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ—সেখানেও কিন্তু বাংলাদেশের প্রচুর পরিমাণ ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে চীনের এস্টাবলিশমেন্ট আছে এবং আমাদের অনেক ব্যবসায়ী বা অ্যালাইড বিজনেসগুলোর সঙ্গে চীনের কন্ট্রিবিউশন বা আমাদের কারো কারো কোলাবরেটিভ প্রজেক্ট রয়েছে। ফলে আমরা যে ভলিউমটা এক্সপোর্ট করি, সেখানেও কিন্তু ভালোভাবে সুবিধা নিতে পারি।

এর কারণ হচ্ছে চীন থেকে আমরা কম খরচে কাঁচামাল পাই এবং সেগুলো দিয়ে এখানে ফিনিশড প্রডাক্ট তৈরি করে পরবর্তী সময়ে এক্সপোর্ট করি। সেই এক্সপোর্ট থেকে আমাদের ইনকাম হয়।

তবে চীনকে আমরা যেটা বলছি, ট্রেড ব্যালান্স করার জন্য তারাও যেন আমাদের কাছ থেকে ইমপোর্ট করে, এ বাস্কেটটা যেন একটু বড় করে। আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেখেছি যে আমাদের কিছু ফল যেমন ম্যাংগো থেকে শুরু করে কয়েকটা ফ্রুটস উনারা নেবেন বলে কমিটমেন্ট করেছেন এবং কিছুটা হয়েছে, আবার কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তাহলে আমাদের এখান থেকেও এ বাস্কেটটা আরো বড় করতে হবে।

কিন্তু যেটা সম্ভাবনার জায়গা তা হচ্ছে চীনকে কিন্তু এখন একটা ডেডিকেটেড ইপিজেড দেয়া হচ্ছে। আমরা অচিরেই দেখব, যে রকম কোরিয়ান ইপিজেড রয়েছে চট্টগ্রামে, চীনেরও একটা ডেডিকেটেড ইপিজেড আছে।

চীনের ওই ইপিজেডটা যখন হবে এক্সপোর্ট প্রমোশন জোনটা কিন্তু ফোকাস হবে এবং ইম্পর্ট্যান্ট ইন্ডাস্ট্রিগুলো আরো এস্টাবলিশ হবে। সেখানে আমাদের জব ক্রিয়েশন হবে। আমাদের এক্সপোর্ট বাস্কেটে তাদের কোম্পানি এবং আমাদের দেশের কোম্পানি মিলিয়ে, আমাদের র ম্যাটেরিয়াল সাপ্লাই যদি আমরা কোনো জায়গায় দিতে পারি, তবে এ ক্ষেত্রে আমরা অনেক বেনিফিট নিতে পারব।

এর বাইরেও কিন্তু বাংলাদেশে চীনের প্রায় ৬৪০-এর বেশি কোম্পানি রয়েছে। এ কোম্পানিগুলো হিউজ এমপ্লয়েবিলিটি ক্রিয়েট করেছে বাংলাদেশীদের জন্য এবং আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য বা লোকাল মার্কেট অথবা বাইরে নেয়ার জন্য যেসব প্রডাক্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস দরকার—সেই ক্ষেত্রে কিন্তু আমরা সাপোর্ট পাই।

তাহলে চীনের সঙ্গে আমাদের এ ট্রেড অ্যান্ড বিজনেসের রিলেশনশিপটা মজবুত করলে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে যেই সম্ভাবনাগুলো আমাদের রয়েছে, তার চেয়ে বেশি সম্ভাবনা চীনের সঙ্গে রয়েছে।

আমাদের স্ট্রাকচারে যে বড় প্রজেক্টগুলো আছে এগুলোতে চীন, জাপান, কোরিয়া এ রকম নানা দেশের বড় বড় প্রজেক্ট করার ক্ষমতা আছে, তারা করছে। এর মধ্যে চীন অন্যতম। সুতরাং সেই জায়গাটাকে আরো স্কেলআপ করে আমাদের কিন্তু অনেক সম্ভাবনার জায়গা রয়েছে।

আরেকটা বিষয় হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করে চীনের সঙ্গে আমরা কী করতে পারি? যেটা আমাদের ইনোভেশন ও ক্রিয়েটিভিটির কথা চিন্তা করা।

আমি মনে করি যে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাসঙ্গিকতায় যদি বলি, আমরা কিন্তু চীনের স্পেস সেন্টারের জন্য একটা ন্যানো স্যাটেলাইট তৈরি করব বলে এমওইউ সই করব অচিরেই। এটা অলমোস্ট ডান। আমাদের ফ্যাকাল্টি সবাই ট্রেনিং নিয়ে এসেছে।

তাতে দেখা যাচ্ছে তারা কিন্তু আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে খুব একটা আন্ডারমাইন্ড করছে না। তারা বরং বলছে, এখানেও কিছু নলেজ-বেইজ আছে, যাদেরকে তারা ব্যবহার করতে পারে এবং আমি মনে করি, এর মধ্য দিয়ে আমাদের কিন্তু বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান অর্জন করার সুযোগ আছে।

চীন বাংলাদেশের তরুণ শিক্ষার্থীদের অথবা একদম পটেনশিয়াল গ্র্যাজুয়েটদের অনেক স্কলারশিপ দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, যাতে করে তারা আধুনিক মানের ও প্রযুক্তিগত শিক্ষা পায়। বাংলাদেশের অলরেডি কিন্তু একটা সিগনিফিক্যান্ট নাম্বার অব স্টুডেন্ট চীনে যায়-আসে। আমাদের দেশের তরুণ ছাত্র-ছাত্রীরা সেই সুবিধা নিতে পারছে।

এছাড়া বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রতিনিয়ত আমাদের নানা প্রশ্নের মুখোমুখি করছে। বিশেষ করে আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে আমরা বিভিন্ন সংকটে পড়ি। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আমাদের কয়েকটি প্রকল্পের আওতায় ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হচ্ছে—কী ধরনের করিডোর তৈরি হলে কম খরচে পণ্য আনা এবং সহজে রফতানি-আমদানি করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে আমরা কাজ করছি।

এক ধরনের ট্রান্সপোর্টেশন এবং ট্রান্সশিপমেন্ট, লজিস্টিক, সাপ্লাই চেইন গড়ে তোলা যায় কিনা তা বিবেচনা করা দরকার। কারণ আমরা ১৮ থেকে ১৯ কোটির জনগোষ্ঠীর একটা দেশ। এদেশে নানা ধরনের সংকট আসতে পারে। খাদ্য ও আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় বস্তু ইত্যাদি। এগুলোর জন্য পার্শ্ববর্তী দেশসহ আরো কয়েকটা দেশ আছে, যারা কিছু জায়গায় আমাদের হেল্প করতে পারে।

তবে চীনও ইকুয়ালি গুরুত্বপূর্ণ। যেমন আমাদের চাল দরকার হয় আর এই ক্ষেত্রে তাদের অনেক ক্যাপাসিটি আছে। তবে আমার মনে হয়, অনেক আনএক্সপ্লোরড জায়গা রয়েছে, যেটা আমরা এখন পর্যন্ত এক্সপ্লোর করতে পারিনি।

মোবিলিটি অব দ্য হিউম্যান রিসোর্সেস বিটুইন চায়না অ্যান্ড বাংলাদেশ শুড বি দেয়ার। কারণ আমরা ক্লিয়ারলি দেখছি, চীন আগে পার ফ্যামিলিতে একটা করে বাচ্চা নেয়ার পলিসি নিয়েছিল, এখন কিন্তু তাদের এ ডেমোগ্রাফিক জায়গায় উল্টোটা হয়েছে। কারণ তাদের হিউম্যান রিসোর্সের শর্টেজ হচ্ছে।

চাইনিজ ইন্ডাস্ট্রিতে লেবার ফোর্স, টেকনোলজিক্যাল জ্ঞানের—ওদের লোকের অভাব নেই। কিন্তু সে জায়গায় তাদের গ্রোথের কিন্তু কমতি আসবে। ফলে বাংলাদেশ ক্লিয়ারলি একটা মার্কেট নেয়ার জায়গায় যেতে পারবে।

চায়না আমাদের একটা পটেনশিয়াল প্লেস, যেখানে আমরা স্কিলড লেবার ফোর্স প্লেস করতে পারব। এ জ্ঞান যদি বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম অর্জন করতে পারে, আমাদের দেশের ইকোসিস্টেম চেঞ্জ হয়ে যাবে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফ্লোর চেঞ্জ হবে, যেখানে তারা এ জ্ঞান নিয়ে এসে ইন্ডাস্ট্রিগুলো উন্নত করতে পারবে। অথবা চাইনিজ ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে আমাদের দেশের তরুণ ছাত্র-ছাত্রীরা কাজ করতে পারবে।

ফলে আমি দেখছি হিউম্যান মোবিলিটি ইজ দেয়ার, মানে একটা খুবই দরকারি এবং টেকনোলজি ট্রান্সফার খুবই দরকার। চীন থেকে টেকনোলজি ট্রান্সফার করে এ রকম বেশ কয়েকটা ইন্ডাস্ট্রি আছে বাংলাদেশের। ইলেকট্রনিক, অ্যাপ্লায়েন্সেসের পাশাপাশি চীনের সাপোর্টে কিন্তু আমাদের দেশের ইন্ডাস্ট্রিগুলো অনেক বড় হয়ে গেছে।

যদি সেলফোনের কথা বলি, চীনসহ অন্যান্য দেশেরও কিন্তু এ দেশে অনেকগুলো স্মার্টফোন প্রোডাকশন প্লান্ট হয়েছে। আমরা বোধহয় ১৩তমটাতে যাব।

আমি যা দেখছি, আমাদের স্কিলড লেবার ফোর্সের জন্য চাকরির ক্ষেত্র ক্রিয়েট হবে। আমাদের এ সরকার যে প্রায়োরিটি দিচ্ছে, আমরা অচিরেই চিপস তৈরির জায়গায় যাব, সেমিকন্ডাক্টরে যাব এবং এ টেকনোলজি ফ্রন্টে আরো কিছু বিষয়ে এগিয়ে যাব।

আমার মনে হচ্ছে, এ জায়গাতে যদি একটা লেবার ফোর্স তৈরি করতে হয়, স্কিলড ফোর্সও তৈরি করতে হয়, বাংলাদেশ ও চায়নার মধ্যে যে রিলেশনশিপটা থাকা উচিত। চায়না অলরেডি বলেছে তারা স্কিলে আমাদের সাহায্য করবে।

এ মুহূর্তে আমরা যখন কথা বলছি, তখন আমাদের শিক্ষামন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা কিন্তু চায়নাতে স্কিল নিয়ে কথা বলছেন।

আমি যেটা লক্ষ্য করছি, বর্তমান সরকার কিন্তু অ্যালাইন করার চেষ্টা করছে এবং আমি মনে করি এ ধারাবাহিকতা রাখতে হবে। প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠানকে আইডেন্টিফাই করে, সেক্টরকে আইডেন্টিফাই করে তার সঙ্গে কী স্কিল দিলে আমাদের দেশের হিউম্যান রিসোর্স আরেকটু এনরিচ হবে, আমরা সেই মার্কেটপ্লেসে ঢুকতে পারব তা বুঝে কাজ করতে হবে।

আরেকটা হচ্ছে, আমাদের ব্লু ইকোনমি। আমাদের বিশাল সমুদ্রের একটা জায়গা আছে। সেখানে কিন্তু আমাদের এখনো অনাবিষ্কৃত অনেক জিনিস রয়ে গেছে। আমরা যখন সমুদ্রের কথা বিবেচনা করি তখন শুধু সমুদ্রের নিচে গ্যাস-তেল আছে কিনা, এটাই চিন্তা করি।

ওখানে একটা বিরাট বড় ফিশিং জোন আছে, যেটা একটা বিরাট বড় মার্কেট প্রডাক্ট হতে পারে এবং প্রসেস করা শিপ ও শিপ বিল্ডিংয়েরও দরকার আছে।

আমার মনে হচ্ছে আমরা এই ব্লু ইকোনমিতেও চিন্তা করতে পারি যে আমাদের এই ব্লু ওশানের যেই রিসোর্সটা আছে, সেই রিসোর্সকে কাজে লাগিয়ে চায়নার সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতার মাধ্যমে অথবা আমাদের ব্যবসাগুলো যদি ওইভাবে প্রসার করি, তাহলে কিন্তু দুই পক্ষই উইনার হবে।

সেই সম্ভাবনাটার দিকটাই আমি দেখছি। আশা করি, আমরা যেই দেশের সঙ্গে যেই পটেনশিয়াল তাদের যেখানে আছে, সেই জায়গাটাতে যদি দৃষ্টি দিতে পারি এবং যদি স্ট্র্যাটেজিক্যালি আমরা সেগুলোকে নেগোশিয়েট করে রাষ্ট্রের জন্য যেটা ভালো হবে সেটা করতে পারি, তাহলে দেশ এগিয়ে যাবে।