তারা ফ্রিল্যান্সার হিসেবে বিভিন্ন মার্কেটপ্লেসে আইটি, আইওটি, ডেটা অ্যানালিস্ট, ডিজিটাল মার্কেটিংসহ ওয়েব ডেভেলপমেন্ট সুবিধা দিয়ে থাকে। বর্তমানে অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট, এআই এক্সটেনশনও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেছে। চাহিদা বাড়ছে ডিজিটাল ডিজাইন, ওয়েব ডিজাইনেও। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দাপটের সময় গোটা বিশ্বই অনেকটা আঁতকে রয়েছে। কিন্তু পেশাদার পর্যায়ে সম্পূর্ণ এআই-নির্ভর সেবা যে কার্যকর নয় তা অনেকেই বুঝতে পেরেছেন। তাই আইটি খাতে কিছু নির্দিষ্ট ধরনের কাজ (কন্টেন্ট রাইটিং, ডেটা এন্ট্রি, ফ্যাক্ট চেকার) এখন এআই দিয়েই করা যাচ্ছে। কিন্তু অন্য অনেক আইটি সেবার চাহিদা এখনো তুঙ্গে। কিন্তু বাংলাদেশে আইটি সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে ফ্রিল্যান্সার বা আইটি স্টার্টআপগুলোর জন্য জনপ্রিয় অনেক বাজারই প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে। এমন সময়ে ফ্রিল্যান্সার ও আইটি খাতের জন্য ব্যয়সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য একটি বাজার ইউরোপের দেশগুলো।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতিতে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিযোগিতা বেড়েই চলেছে। অধিকাংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বড় প্রতিষ্ঠানই এখন এ দুই দেশের ডেভেলপমেন্টের আওতায়। এদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো তৈরির পাশাপাশি নিজস্ব ইকোসিস্টেম গড়ার জন্য বিপুল পরিমাণ খরচ করতে হয়। খরচ কমানোর জন্যই অনেক দেশ বা প্রতিষ্ঠান এখনো আউটসোর্স করায়। সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপে এ ধরনের পরিষেবার চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে। ইউরোপীয় সংস্থাগুলো প্রযুক্তি সেবার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য খরচ সাশ্রয় খুঁজছে। বাংলাদেশে একজন দক্ষ সফটওয়্যার ডেভেলপারের মাসিক পারিশ্রমিক আনুমানিক ৫০-৮০ হাজার টাকা। একই দক্ষতার একজন জার্মান বা ব্রিটিশ ডেভেলপার মাসে ৬ হাজার ইউরো বা তার বেশি আয় করেন। এর মানে, একটি তিন সদস্যের বাংলাদেশী একটি দল বছরে ৩০ লাখ টাকা খরচে কাজ করতে পারে। একই কাজ ইউরোপে করতে লাগত ২ কোটি টাকারও বেশি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের আইটি শিল্প এখন পেশাদারত্বের উচ্চ মান বজায় রাখছে। সার্ভিস ইঞ্জিন, বিজিআইটি, ব্রেইন স্টেশন ২৩ ও সিফালো বাংলাদেশের মতো স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক মানের সফটওয়্যার সমাধান তৈরি করছে এবং ইউরোপীয় বাজারে বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর বাজার কেন আমাদের আইটি খাতের জন্য সুবিধাজনক বাজার সেটাও পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে বোঝা জরুরি। বাংলাদেশের মোট আইটি ও সফটওয়্যার রফতানির আনুমানিক ১৫-২০ শতাংশ আসে ইউরোপীয় অঞ্চল (যুক্তরাজ্যসহ) থেকে। যুক্তরাজ্য, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক ও নরওয়ে আমাদের আইটি খাতের প্রধান রফতানি বাজার হয়ে উঠেছে। এসব দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আমাদের দেশ থেকে অনেক শিক্ষার্থী আইটি, আইওটি, ডেটা অ্যানালিটিকসসহ নানা বিষয়ে গবেষণা ও উচ্চ শিক্ষা নিতেও যাচ্ছেন। উচ্চ শিক্ষা শেষে তারা বিভিন্ন ইউরোপীয় আইটি প্রজেক্ট এমনকি প্রতিষ্ঠানেও চাকরি নিচ্ছেন। সে অর্থ তারা দেশে পাঠাচ্ছেন। এমনকি অনেকে দেশে তাদের নিজস্ব আইটি স্টার্টআপ চালু করছেন। ইউরোপের বাজারে কাস্টম সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ওয়েব ও মোবাইল অ্যাপ ডেভ, এসইও, গ্রাফিক ডিজাইন, ব্যাক-অফিস সাপোর্ট এবং কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্স টেস্টিং এখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ আইটি পণ্য। আমাদের দেশের তরুণ ফ্রিল্যান্সাররা এসব দক্ষতা বাড়ানোয় বাড়তি মনোযোগ দিয়ে থাকেন। তাই এসব খাতে তুলনামূলক কম সুবিধা নিয়েও তারা পেশাদার পরিচয় ধরে রাখছেন।

বাংলাদেশের আইটি সেবা রফতানিও দুই বছরে দুই অংকের হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪-২৫ আর্থিক বছরে আমাদের আইটি রফতানি ছিল ৬৩০ মিলিয়ন ডলার, যা এর আগের বছর থেকে ১৩ শতাংশ বেশি। এ সংখ্যা আগামী পাঁচ বছরে বার্ষিক ১২ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইউরোপীয় ক্রেতারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং সাইবার নিরাপত্তার মতো উন্নত প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন। বাংলাদেশের আইটি পেশাদাররা এ ক্ষেত্রগুলোতে ক্রমে দক্ষতা অর্জন করছেন। বেশির ভাগ ইউরোপীয় প্রকল্পে সফলতার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা এখন আমাদের একটি প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অনলাইন শ্রম সরবরাহে দ্বিতীয় বৃহত্তম সরবরাহকারী। প্রথম স্থানে রয়েছে ভারত। এ দেশে ৬৫০ হাজারের বেশি সক্রিয় ফ্রিল্যান্সার বিশ্বব্যাপী ক্লায়েন্টদের সেবা দিচ্ছেন এবং বার্ষিক ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিদেশী মুদ্রা অর্জন করছেন। একজন অভিজ্ঞ বাংলাদেশী ফ্রিল্যান্সার মাসে অন্তত ৫০০-৭০০ ডলার আয় করছেন, যা স্থানীয় করপোরেট চাকরির চেয়ে পাঁচ থেকে সাত গুণ বেশি।

ইউরোপীয় বাজারে বিশেষত গ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট এবং ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের চাহিদা অত্যধিক। বাংলাদেশী ডিজাইনার এবং ডেভেলপাররা এ সেবাগুলো প্রদান করে ইউরোপীয় উদ্যোক্তা এবং ছোট ব্যবসায়ীদের সহায়তা করছেন। একজন অভিজ্ঞ বাংলাদেশী গ্রাফিক ডিজাইনার প্রতি প্রকল্পে ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা আয় করছেন। একই মানের কাজ ইউরোপে প্রায় দশ গুণ বেশি দামে বিক্রি হয়।

ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশ শুধু ভারত নয়, ফিলিপাইন ও ইউক্রেনের মতো দেশের সঙ্গেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। ভারত আইটি সেবায় বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশ, যার বার্ষিক রফতানি ২০ হাজার কোটি ডলারের বেশি। তবে বাংলাদেশের সুবিধা হলো খরচ এবং নমনীয়তা। ছোট থেকে মাঝারি প্রকল্পের ক্ষেত্রে আমাদের দল দ্রুত এবং সাশ্রয়ী সমাধান প্রদান করে। ফিলিপাইনের আইটি-বিপিএম খাত বার্ষিক ৩ হাজার ৮০০ কোটি ডলার আয় করলেও তাদের খরচ এবং ভাষাগত সুবিধার কারণে তারা প্রধানত আমেরিকা বাজারে শক্তিশালী। বাংলাদেশ ও ইউক্রেন উভয়ই ইউরোপে ক্রমবর্ধমান শক্তি। তবে ভৌগোলিক এবং সময় অঞ্চলের কারণে বাংলাদেশ অনেক ইউরোপীয় ক্লায়েন্টের জন্য আরো সুবিধাজনক সময়ে কাজ করতে পারে এবং ওভারহেড খরচ কম রেখে মানসম্পন্ন কাজ দিতে পারে।

তাও কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। বাংলাদেশের আইটি খাত সম্পূর্ণ সম্ভাবনা ব্যবহার করতে পারছে না। তথ্য অবকাঠামো, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেমের সমস্যা আমাদের বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করছে। সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ ২০৪১ পরিকল্পনা এবং সম্প্রতি চালু করা ফ্রিল্যান্সার আইডি প্রোগ্রাম ইতিবাচক পদক্ষেপ। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশ আইটি রফতানিতে ১ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে যদি এ খাতে সঠিক বিনিয়োগ ও নীতিগত সহায়তা অব্যাহত থাকে।

ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের আইটি, ফ্রিল্যান্সিং এবং সৃজনশীল অর্থনীতির সম্ভাবনা অপরিসীম। দক্ষ জনশক্তি, প্রতিযোগিতামূলক খরচ এবং ক্রমবর্ধমান পেশাদারত্ব আমাদের এ অঞ্চলে একটি শক্তিশালী অবস্থান দিয়েছে। কিন্তু এখনো আমাদের আইটি সেবা প্রাথমিক অবস্থায় রয়েছে। কারণ ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। আবার ইউরোপের আইটি মার্কেটপ্লেসের উপযুক্ত ব্র্যান্ডিং বাংলাদেশে নেই। ইউরোপের আইটি নীতিমালা দেশীয় স্টার্টআপের জন্য মেনে চলাও অনেক ব্যয়বহুল। তার ওপর নির্ভরযোগ্য অনেকগুলো পেমেন্ট গেটওয়ে দেশে নেই। তাই অনেক ক্লায়েন্ট পেমেন্টের অনিশ্চয়তার কারণে অর্ডার ক্যানসেল করেন। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করার জন্য নীতিনির্ধারণী সুবিধা দিতে হবে। সরকার বাজেটে ফ্রিল্যান্সারদের ওপর শূন্য কর ধার্য করেছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন নানা সুবিধা দিতে শুরু করেছে। কিন্তু এটিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গুরুত্ব দিয়ে সুবিধা ও সেবা সম্প্রসারণের সুযোগ বাড়াতে হবে। ইউরোপের আইটি বাজারে বাংলাদেশের শক্ত অবস্থান তৈরি হলে ধীরে ধীরে অন্য বাজারেও প্রবেশের সুযোগ বাড়বে।

লেখক: প্রযুক্তিবিদ, অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়