অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর অনেকগুলো মৌলিক সংস্কারের দাবি উঠেছিল। সরকার এজন্য বেশ কয়েকটি কমিশন গঠন করে। কিন্তু এখন পর্যন্ত মৌলিক কোনো সংস্কার করা সম্ভবপর হয়ে উঠছে না কেন?

মৌলিক সংস্কার করতে গেলে সরকারের কিছু ক্ষমতা প্রয়োজন হয়। কিন্তু সে ধরনের ক্ষমতা এ সরকারের নেই। যেমন সংবিধান সংস্কার একটি অনির্বাচিত সরকার করতে পারে না। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দিয়ে তা করতে হবে। তারা ছাড়া অন্য কেউ চাইলে সেটি হবে না; হচ্ছেও না। আর তা নির্বাচন ছাড়া সম্ভব না। এছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুলিশসহ অনেক সংস্কার আছে—সেগুলোও এ সরকারের পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব না। এ সরকারের অন্যতম কাজ হলো নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার করে নির্বাচন দেয়া।

অভ্যুত্থানের পর পরই জুলাইয়ের স্পিরিটকে ধারণ করে রাষ্ট্র গঠন প্রসঙ্গে নানা পক্ষ কথা বলেছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ‘নেশন বিল্ডিং’ কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?

জুলাই অভ্যুত্থানে বাংলাদেশ থেকে একটি নিকৃষ্ট ফ্যাসিস্ট সরকারের উৎখাত হয়েছে। কিন্তু আমি আগেই বলেছি এটি কোনো সামাজিক বিপ্লব নয়—যেখানে একটি শ্রেণীর জায়গায় আরেকটি শ্রেণী ক্ষমতায় আসে। এ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উৎপাদন ও মালিকানার সম্পর্কের কিছুই পরিবর্তন হয়নি। এমনকি ব্যবসায়ীদের কর্তৃত্ব অক্ষুণ্ন রয়েছে। এ সরকার যেভাবেই প্রতিষ্ঠিত হোক, তারা শাসক শ্রেণীর বৃত্তের মধ্যে কাজ করছে। ব্যবসায়ী শ্রেণীর স্বার্থে এ সরকারকে এখন অনেক কিছু করতে হচ্ছে। একমাত্র ব্যাংকিং সেক্টরকে নিয়ন্ত্রণ এবং মূল্যবৃদ্ধি আয়ত্তের মধ্যে রাখা ছাড়া এ সরকারের তেমন উল্লেখযোগ্য কাজ নেই। কাজেই একটি রাষ্ট্রকে নতুনভাবে গঠন করার কোনো ভিত্তিও এখানে নেই।

বাংলাদেশের এখন যে অবস্থা তাতে কোনো নির্বাচিত সরকার এলেও এ শাসক শ্রেণীর বৃত্তের মধ্যে থাকতে হবে। কাজেই একটি নির্বাচিত সরকার এলে তারা যে খুব গণতান্ত্রিক বা বিপ্লবী সরকার হয়ে যাবে এমন কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে আওয়ামী লীগ (নিষিদ্ধ ঘোষিত) যেভাবে ফ্যাসিজম করতে পেরেছে তা করতে পারবে বলে মনে হয় না। কারণ জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ইতিবাচক একটি ফল হলো জনগণের মানসিকতার পরিবর্তন হয়েছে। তারা আর নির্যাতন সহ্য করবে না। বিএনপির লোকেরা বিষয়টি ভালোভাবে বুঝেছে। যার জন্য তারা বারংবার বলছে—‘আওয়ামী লীগের (নিষিদ্ধ ঘোষিত) মতো কাজ করলে আমরা উৎখাত হয়ে যাব।’

বায়ান্ন, ঊনসত্তর এবং নব্বইয়ের ছাত্র আন্দোলনের চরিত্রের সঙ্গে চব্বিশের ছাত্র আন্দোলনের কোনো পার্থক্য দেখতে পেয়েছেন?

এ অঞ্চলে অনেক ছাত্ররাজনীতি হয়েছে। এসব আন্দোলনের পর যেসব ছাত্রনেতা বেরিয়ে এসেছে তাদের চরিত্র ছিল বামপন্থী। কখনই দক্ষিণপন্থী ছিল না। এবারই প্রথমবারের মতো দেখা যাচ্ছে সবচেয়ে প্রকাণ্ড আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের চরিত্র দক্ষিণপন্থী। এটি খুব বিস্ময়কর হলেও বাস্তব।

এছাড়া ৫ আগস্টের পর যেসব পরিবর্তন হয়েছে, তার মধ্যে বামপন্থী প্রভাব বলতে কিছু নেই। সাধারণভাবে বলা চলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন দক্ষিণপন্থী রাজনীতির বিপুল প্রাধান্য। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ সবগুলোই দক্ষিণপন্থী। বামপন্থী দলগুলোর উপস্থিতি সামান্য। এটিই বর্তমান রাজনীতির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যে সংকট দেখা দিয়েছে। এটি কেন হলো?

দেশে যে রাজনৈতিক দলগুলো কাজ করে তাদের মধ্যে ঐক্য থাকতে হবে এমন তো কোনো কথা নেই। বিভিন্ন দলের বিভিন্ন মত এবং কার্যকলাপ থাকে। এখনো সে রকমই হচ্ছে। নির্বাচনের সময় জোট হয় সেটি আলাদা বিষয়।

এখানে ঐক্য কেন হতে হবে? বরং এখন দরকার একটি নির্বাচন দিয়ে দেয়া। নিয়ন্ত্রণের অভাবে দেশে অনেক রকম সমস্যা হচ্ছে। এটা বন্ধ করার একমাত্র উপায় হচ্ছে নির্বাচন দিয়ে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। যত দিন যাচ্ছে ততই শাসন ব্যবস্থার ওপরে সরকারের নিয়ন্ত্রণ আলগা হয়ে যাচ্ছে। ফলে ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন না দিলে সামনের দিনে নৈরাজ্য বেড়ে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। কিন্তু এ সরকারের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে তারা যতদূর সম্ভব টেনে শাসনকাল বাড়াতে চাচ্ছে, এটি ক্ষতিকর।

বিরাজমান পরিস্থিতিতে বামপন্থী রাজনীতির উত্থান ঘটতে পারে কি?

এখানে শোষণ আছে। দুটি শ্রেণীর মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে, যা বামপন্থী রাজনৈতিক দলের রাজনীতির শর্ত তৈরি করে। রাজনীতির চড়াই-উতরাই থাকে। ষাটের দশকে বামপন্থীদের চড়াই অবস্থা ছিল। স্বাধীনতার পর উতরাই দেখা দেয়। যার জন্য বামপন্থী রাজনীতি এখন নিচের দিকে পড়ে আছে। কিন্তু এক অবস্থা তো চিরদিন থাকে না। বামপন্থীদের এখন তেমন কোনো তৎপরতা নেই। কিন্তু ভবিষ্যতে এ অবস্থা থাকবে না। কাজেই বামপন্থী দলগুলো সম্ভাবনাময়। তবে এ সম্ভাবনা কখন বাস্তব রূপ লাভ করবে তা এ মুহূর্তে বলা চলে না।