দেশের এভিয়েশন খাত কেমন দেখছেন? বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের মোটা দাগের সংকট কোনগুলোকে মনে করেন?

আমার মতে এভিয়েশন খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ব্যবস্থাপনা ও মনোভাব। ধরুন, এখন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান বা ব্যবস্থাপকরা বিমান বা সেনাবাহিনী থেকে আসেন। তাদের অভিজ্ঞতা পুরোপুরি ভিন্ন থাকে। অথচ মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উন্নত বিমানবন্দরগুলোর দিকে তাকালে সেখানে প্রচুর বিদেশী বিশেষজ্ঞ দেখা যায়। আমাদের দেশে অবশ্য বাইরে থেকে কেউ এসে আবার মানিয়ে নিতে বা টিকে থাকতে পারেন না। আমাদের সামাজিক অবকাঠামোয় বড় সমস্যা রয়ে গেছে।

এভিয়েশন খাতকে ঢেলে সাজাতে হলে অবশ্যই পেশাদার ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়া উচিত, যাদের এ খাত সম্পর্কে বাস্তবিক ভালো ধারণা আছে এবং নিয়মিত দেশ-বিদেশের এভিয়েশন খাতের হালনাগাদ তথ্য রাখেন। শুধু নতুন নতুন প্লেন কিনলেই বা সুন্দর বিল্ডিং তৈরি করলেই হবে না। একজন ভালো ব্যবসায়ীও চেয়ারম্যান হিসেবে ভালো কাজ করতে পারেন। তবে যাকে চেয়ারম্যান করা হবে, তাকে পর্যাপ্ত ক্ষমতা দিতে হবে। গভর্নিং বোর্ডকে শক্তিশালী হতে হবে এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সরকারের পূর্ণ সহায়তা থাকতে হবে। আগে আমাদের নিজেদের ভেতরের কাঠামো ঠিক করতে হবে।

এছাড়া অনেক ভালো ভালো বিশেষজ্ঞ রাখারও সুযোগ আছে। প্রয়োজনে দেশের বাইরে থেকে লোক নিয়ে এসে নিয়োগ দেয়া দরকার। যদিও বর্তমান সরকার অনেক কিছু নতুনভাবে করার চেষ্টা করছে। এভিয়েশন খাতকে ট্র্যাকে ফেরাতে তারা কী পদক্ষেপ নেবে, তা এখনই বলা মুশকিল।

এভিয়েশন খাতের অন্যতম সংকট এয়ারপোর্টের অবকাঠামোগত সুবিধা। কিন্তু আমরা তৃতীয় টার্মিনাল তৈরি করেও প্রায় তিন বছর ধরে ব্যবহার করতে পারছি না। এ ব্যর্থতাকে কীভাবে দেখেন?

একটি এয়ারপোর্টকে ‘‌হাব’ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে অনেক শর্ত পূরণ করতে হয়। আমাদের বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ২০টির মতো প্লেন আছে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসেরও অনেক এয়ারক্রাফট আসছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব এয়ারক্রাফট থাকবে কোথায়? পর্যাপ্ত হ্যাঙ্গার এবং এয়ারপোর্টে যে পরিমাণ জায়গা দরকার, ভবিষ্যতে তার একটা বড় সংকট আসবে। আমাদের রানওয়েও মাত্র একটা। এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (এটিসি) আলাদা এবং উন্নত রানওয়ের ব্যবস্থা করা দরকার। বর্তমান সেটআপে নতুন রানওয়ে করার মতো সুযোগ বা জায়গা খুব একটা নেই।

তার মানে কি আমাদের নতুন এয়ারপোর্ট করার কথা ভাবতে হবে?

নতুন এয়ারপোর্ট না করে বর্তমান এয়ারপোর্টের পরিধি বাড়ানোর এখনো সুযোগ আছে। কিন্তু নীতিনির্ধারকদের সে দূরদর্শিতা থাকতে হবে। সক্ষমতা তৈরি করতে হবে এবং সরকারকে কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আপনি সিঙ্গাপুরের দিকে তাকান, এটি পৃথিবীর অন্যতম সেরা ও বড় এয়ারপোর্ট। সেখানে মাথার ওপর একের পর এক প্লেন উড়ছে। আমাদের এখানেও সে রকম সেবা দেয়ার সুযোগ আছে। নতুন অবকাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। এয়ারপোর্টকে হাব বানাতে গেলে এক নম্বরে লাগবে দ্বিতীয় রানওয়ে, দুই নম্বরে প্রদেয় সেবার মান বাড়িয়ে অপ্রয়োজনীয় লোকবল কমাতে হবে।

এভিয়েশন খাতকে আরো সম্প্রসারিত ও সমৃদ্ধ করতে ব্যাংকগুলো কীভাবে এগিয়ে আসতে পারে?

অর্থায়ন কোনো সমস্যা নয়, আগে ব্যবস্থাপনা ঠিক হওয়া দরকার। আমরা ঋণ দিতে ও বিনিয়োগ করতে শতভাগ আগ্রহী। কিন্তু ঋণ দেয়ার পর সেটিকে কীভাবে সুন্দর ও লাভজনকভাবে ব্যবহার করা যায়, সেটিই মূল প্রশ্ন।

সরকার পর্যটন খাতকে চাঙ্গা করার জন্য নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। পর্যটনের সঙ্গে এভিয়েশনও গভীরভাবে যুক্ত। অন্যদিকে আমাদের অর্থনীতি বর্তমানে চাপের মধ্যে আছে, যা এভিয়েশন খাতের ওপরও প্রভাব ফেলছে। এ পরিস্থিতিতে কীভাবে ভারসাম্যে আনা যায়? এক্ষেত্রে আপনার পরামর্শ কী?

আগে আমাদের দেশে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ ও নেদারল্যান্ডের ‌কেএলএমের প্লেন আসত। পরে কেএলএম চলে গেল। কেএলএম বা ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের মতো আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনস এখানে আসা মানে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হওয়া। কিন্তু তারা চলে গেছে। তাই আমাদের এমন পরিবেশ তৈরি করা উচিত, যেন বিদেশী এয়ারলাইনসগুলো মনে করে এখানে এলে ভালো ব্যবসা করা সম্ভব।

নতুন সরকার নিশ্চয়ই ভালো কিছুর চেষ্টা করবে। তবে পরিবর্তনগুলো কতটা কার্যকর হবে তা সময় বলবে। অনেক নতুন মুখ এসেছে, বোর্ড নতুন করে গঠন করা হচ্ছে। হয়তো আমরা সঠিক পথেই যাচ্ছি। তবে বোর্ডের মাধ্যমে বা নীতিগতভাবে যেসব সিদ্ধান্ত নেয়া হবে, সেগুলো প্রয়োগ করার মতো শক্তিশালী এনফোর্সিং ফোর্স বা প্রয়োগিক ক্ষমতা দরকার।