দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিপথে বেসরকারি শিল্প খাত আজ যে অবস্থানে পৌঁছেছে, তার প্রাথমিক ভিত্তি স্থাপনে যেসব ব্যক্তিত্ব অনন্য অবদান রেখেছেন, তাদের অন্যতম ছিলেন আনোয়ার হোসেন। শুধু একজন সফল ব্যবসায়ীই নন, বরং তিনি ছিলেন এক দূরদর্শী উদ্যোক্তা। নতুন প্রজন্মের জন্য উন্মোচন করে দিয়েছিলেন বেসরকারি খাতের সম্ভাবনার দ্বার।
স্বাধীনতার পর যখন দেশ পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জে ব্যস্ত, তখন আনোয়ার হোসেন বেসরকারি শিল্পকে এগিয়ে নেয়ার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। তার হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় আনোয়ার গ্রুপ, যা ধীরে ধীরে দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠীতে পরিণত হয়। শিল্পের পাশাপাশি আর্থিক খাতেও তিনি ছিলেন সমানভাবে অগ্রগামী। স্বাধীন বাংলাদেশে বেসরকারি ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় উদ্যোক্তাদের অন্যতম একজন ছিলেন আনোয়ার হোসেন। এর মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয় এবং ব্যাংক খাতে সুগম হয় প্রতিযোগিতা ও বিকাশের পথ।
দীর্ঘ কর্মময় জীবনের শেষে ২০১২ সালে আনোয়ার হোসেন ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ধীরে ধীরে স্মৃতিশক্তি হারাতে থাকেন। প্রায় এক দশক ধরে চিকিৎসাধীন থাকার পর ২০২১ সালের ১৭ আগস্ট রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আজ তার চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী।
দেশের বেসরকারি শিল্প জগতের অন্যতম পথিকৃৎ আনোয়ার হোসেন নিজ উদ্যোগ ও চেষ্টায় গড়ে তুলেছিলেন দুই ডজনের বেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের অধীনে বস্ত্র, পাট, সিমেন্ট, ইস্পাত, আবাসন, পলিমার, আসবাব, অটোমোবাইল, ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ নানা খাতে বিস্তৃত ছিল তার ব্যবসা।
আনোয়ার হোসেনের স্ত্রীর নাম বিবি আমেনা। এ দম্পতির চার মেয়ে ও তিন ছেলে। মেয়েরা হচ্ছেন শাহীন বেগম, সেলিনা বেগম মালা, হাসিনা বেগম রুমা ও শাহনাজ বেগম মুন্নী। আর তিন ছেলে মানোয়ার হোসেন, হোসেন মেহমুদ ও হোসেন খালেদ।
ঢাকার পশ্চিমাঞ্চলে মুসলমানদের মধ্যে চারজন সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর একজন ছিলেন আনোয়ার হোসেনের বাবা রহিম বখ্স। পরিবার নিয়ে তিনি পুরান ঢাকার আমলীগোলায় (লালবাগ) বাস করতেন। ১৯৪৫ সালে রহিম বখ্স মারা যাওয়ার সময় আনোয়ার হোসেনের বয়স ছিল মাত্র সাত বছর।
১৯৫৩ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে নিজের ব্যবসা শুরু করেন আনোয়ার হোসেন। সে সময় অন্যের দোকানে কাজ করে জমানো ৯০ টাকা, মায়ের কাছ থেকে পাওয়া ২০০ রুপার মুদ্রা বিক্রি করে পাওয়া ৩৯০ টাকাই ছিল তার ব্যবসার পুঁজি। এ টাকা দিয়ে তিনি ১৯৫৩ সালে চকবাজারে ২২০ নম্বর দোকান নেন। নাম দেন আনোয়ার ক্লথ স্টোর।
পরবর্তী সময়ে তিনি নিজের বাড়িতেই ১৯৫৬ সালে শাড়ির ছাপাখানা চালু করেন। ১৯৬৮ সালে একটি সিল্ক মিল কিনে চালু করেন আনোয়ার সিল্ক মিলস। শুরু হয় বিখ্যাত মালা শাড়ির পথচলা। এ শাড়ি এতটাই বিখ্যাত ছিল যে বিয়েতে নববধূর সাজে তা আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি আনোয়ার হোসেনকে। একে একে গড়ে তোলেন ২৬টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান হয় ১৪ হাজার মানুষের। তারই ধারাবাহিকতায় সন্তানরাও এগিয়ে নিয়েছেন পারিবারিক ব্যবসা, বাড়িয়েছেন প্রসার, গড়েছেন নতুন প্রতিষ্ঠানও।
১৯৩৮ সালে জন্ম নেয়া আনোয়ার হোসেনের পারিবারিক ব্যবসার ইতিহাস পাওয়া যায় ১৮৩৪ সাল থেকেই। অর্থাৎ তার জন্মের ১০৪ বছর আগে থেকেই সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করে আসছিল পরিবারটি। দাদা লাট মিয়া ঢাকার চকবাজারে একটি ভিটা ইজারা (এখনো এসব দলিল সংরক্ষিত আছে) নিয়ে শিং দিয়ে চিরুনি ও বোতাম তৈরি করতেন। আনোয়ার হোসেনের বাবা রহিম বখ্স পরবর্তী সময়ে এ ব্যবসা বড় করতে থাকেন। শিংয়ের চিরুনির পাশাপাশি কাপড়সহ আরো কিছু পণ্যের ব্যবসাও শুরু করেন।
১৯৭৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আনোয়ার হোসেনসহ ৪০ ব্যবসায়ীর একটি প্রতিনিধি দল। ওই বৈঠকে তারা দেশে বেসরকারি ব্যাংক চালুর বিষয়ে জিয়াউর রহমানকে রাজি করান। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৩ সালে কয়েকজন মিলে প্রতিষ্ঠা করেন দি সিটি ব্যাংক। আনোয়ার হোসেন ব্যাংকটির চারবার চেয়ারম্যান ছিলেন।
আনোয়ার হোসেন এক সময় রাজনীতিতেও যুক্ত হন। তবে তিন বছর ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরকারের পতনের পর রাজনীতি থেকে অনেকটাই নিজেকে সরিয়ে নেন।








