ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ মুন্সিগঞ্জ এখন দ্রুত অবকাঠামোগত উন্নয়নের ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে। নদীবেষ্টিত এ জেলার মানুষ যেমন অতিথিপরায়ণ ও সামাজিকতায় অগ্রগণ্য, তেমনি সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এখানে ঘটছে ব্যাপক পরিবর্তন। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর ঢাকা-খুলনা ও ঢাকা-বরিশাল অঞ্চলের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগে এসেছে যুগান্তকারী অগ্রগতি। ঢাকা থেকে যাতায়াতে সময় কমেছে, বেড়েছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গা, ইছামতি ও ধলেশ্বরীর মতো নদীর বেষ্টনীর মধ্যে অবকাঠামোগত উন্নয়ন আরো প্রাণবন্ত করেছে মুন্সিগঞ্জকে।

অবকাঠামোগত এ উন্নয়নের প্রভাবে জেলায় ভূমি রূপান্তর ও ব্যবসার প্রবণতা বাড়ছে। নতুন নতুন প্রকল্প, কারখানা, মিল ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের নিকটবর্তী হওয়ায় শিল্প স্থাপনের জন্য উদ্যোক্তাদের কাছে দিন দিন আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে মুন্সিগঞ্জ। এছাড়া বিভিন্ন হাউজিং কোম্পানি তৈরি করছে বাসযোগ্য প্লট। এতে স্বল্প আয়ের মানুষও আবাসনের সুযোগ পাচ্ছে। আবাসন ও শিল্প-কারখানার এ সম্প্রসারণ জেলা অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। এ ধারাবাহিক উন্নয়ন যদি পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে চলে, তবে মুন্সিগঞ্জ অদূরভবিষ্যতে দেশের অন্যতম আধুনিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেলায় পরিণত হবে।

কৃষিভিত্তিক জেলা হিসেবে পরিচিত মুন্সিগঞ্জের অর্থনীতি একসময় হিমাগারে আলু সংরক্ষণকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। এখনো জেলার বিভিন্ন স্থানে কোল্ডস্টোরেজ রয়েছে, যেখানে প্রচুর আলু সংরক্ষণ করা হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন হয়েছে এখানকার অর্থনৈতিক ধারা। এখন গড়ে উঠেছে ছোটবড় রাইস মিল, অটো রাইস মিলসহ অসংখ্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প-কারখানা।

মুন্সিগঞ্জ প্রবাসী অধ্যুষিত একটি জেলা। রেমিট্যান্স প্রেরণের তালিকায় দেশের শীর্ষ জেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম। বিদেশ থেকে আসা প্রবাসী আয়ের ফলে জেলার মানুষের জীবনমান অনেক উন্নত হয়েছে। বর্তমানে এখানে কাঁচা বাড়ির সংখ্যা নগণ্য। অনেক পুরনো টিনের ঘর আজ ঐতিহ্য হয়ে টিকে আছে। সার্বিকভাবে এখানকার জীবনমান দেশের অন্যান্য জেলার তুলনায় অনেক ভালো। তবে সেবা খাতে এখনো কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও প্রকৃত সেবাপ্রত্যাশী জনগণ কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছে না। রেজিস্ট্রেশন খাতে অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। ফলে যারা সেবাগ্রহীতা তারা প্রকৃত সেবা পাচ্ছে না, আবার যারা দিচ্ছে তারাও প্রকৃত সেবা দিতে পারছে না। এর প্রধান কারণ আমাদের দেশের চাকরির নিয়ম-কানুনে নানা অসংগতি রয়েছে। এসব দূর করে যখন রেজিস্ট্রেশন বিভাগের সিস্টেমের পরিবর্তন ও ডিজিটালাইজেশন হবে তখন অনিয়ম বা জালিয়াতের যেসব বিষয় ওঠে সেগুলো প্রায় বন্ধ হয়ে যাবে।

ব্যাংকিং, পুলিশ, প্রশাসন, কাস্টমস, ভ্যাটসহ প্রায় সব খাতে এরই মধ্যে ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়া চালু হয়েছে; রেজিস্ট্রেশন বিভাগ এখনো পিছিয়ে। রেজিস্ট্রেশন খাতের ডিজিটালাইজেশন কার্যকর হলে সেবার মান বাড়বে এবং অভিযোগও অনেকাংশে কমে আসবে। এরই মধ্যে একটি পরিকল্পনা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সেটি বাস্তবায়ন হলে মুন্সিগঞ্জবাসীও উন্নত মানের সেবার আওতায় আসতে পারবে। তবে আমার অফিসের সেবার বিষয়ে এলে বলব, এখানে সেবা সবার জন্য।

রেজিস্ট্রেশন সেক্টরে ২২ বছর ধরে চাকরি করছি। এখানে নানা বৈষম্য রয়েছে। কর্মপরিবেশ বলতে কিছুই নেই। অথচ সেটি হওয়ার কথা ছিল বন্ধুত্বসূলভ। কিন্তু রেজিস্ট্রি অফিসকে মানুষ আতঙ্কের জায়গা মনে করে। ভেতরে কেউ আসতে চায় না। তাই এখানে আইন-কানুন, বিধি-বিধানের কিছু পরিবর্তন দরকার; যাতে মানুষ সহজলভ্যভাবে সেবা নিতে পারে। কর্মকর্তারাও যাতে সহজভাবে সেবা দিতে পারেন সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। সেবাগ্রহীতা ও সেবাদাতার মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ ও বিনয়ের সম্পর্ক গড়ে ‍উঠলে এ দপ্তর নিয়ে যেসব বদনাম আছে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। একটা কথা প্রচলিত আছে, জমিদারের অলস ছেলেরা নাকি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে চাকরি করে। এ অপবাদ ও কলঙ্ক থেকে বের হয়ে আসতে হবে। আবারো বলছি, এসব ঘোচাতে হলে এ সেক্টরের ডিজিটালাইজেশন করতে হবে। আশা করছি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এটি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নেবে।

মুন্সিগঞ্জ জেলা সম্পর্কে আমার ভাবনা বলতে গেলে প্রথমেই আসবে ভালোবাসা। কোনো কিছুকে ভালো না বাসলে সেবা দেয়া যায় না। আমি যেখানে যাই, সে জায়গাকে প্রথমে ভালোবাসি, এরপর সেখানাকার মানুষকে শ্রদ্ধা করি। সে জায়গার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকেও ভালোবাসতে হবে। এজন্য আমি চাই, ‍মুন্সিগঞ্জ আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে আরো উন্নত হোক। পাশাপাশি এখানকার ভূমি, প্রশাসনগুলো যেন সুষম বণ্টন হয়। রেজিস্ট্রেশন বিভাগ যেন তাদের রেকর্ড স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার মাধ্যমে পেশ করতে পারে এবং এখানকার মানুষ যেন আইন-শৃঙ্খলা থেকে শুরু করে সব বিভাগের যথাযথ সেবা পায় সে প্রত্যাশা করি।

মানুষের যেমন দরকার আবাসন, তেমনি কাজেরও সুযোগ তৈরি করতে হবে। এজন্য দরকার শিল্প-কারখানা। বাংলাদেশকে বলা হয় কৃষিপ্রধান দেশ। আমাদের মানচিত্রেও সবুজকে তুলে ধরা হয়েছে। কৃষি জমি কমে গেলে খাদ্যের সংকট দেখা দেবে। বিদেশ থেকে আমদানি বাড়বে। এটি যেন করতে না হয় সেজন্য দুই ফসলি জমিকে তিন ফসলি করা; হাইব্রিড ফসলের চাষ বাড়ছে। কৃষি অফিসগুলো এসব নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু কৃষি জমি যদি কমে যায়, সেগুলো যদি ভরাট হয়ে যায় তাহলে অধিক জনসংখ্যার এ দেশে খাদ্য সংকট দেখা দেয়ার শঙ্কা রয়েছে। সেজন্য কৃষি জমি নষ্ট না করে সেগুলো কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়, আর কারখানাগুলো ইন্ডাস্ট্রি জোনে পরিকল্পনামতো করা যায়, সেটি নিয়ে ভাবতে হবে। মোটকথা, প্রতিটা জিনিসেরই একটি নীতিমালা থাকা দরকার।