বাংলাদেশে কমার্শিয়াল এসির ব্যবহার শুরু হয় ১৯৯০ দশকে। মূলত আন্তর্জাতিক হোটেল, অভিজাত শপিং মল, এবং সরকারি স্থাপনায় এসব এসি ব্যবহার করা হতো। ২০০০ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে এ বাজারের সম্প্রসারণ ঘটতে থাকে। এ সময়কালে বাংলাদেশের অর্থনীতি যত এগিয়েছে, ততই বেসরকারি খাতে যেমন ব্যাংক, হাসপাতাল, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও মাঝারি থেকে বড় আকারের স্থাপনায় কমার্শিয়াল এসির চাহিদা বাড়তে থাকে। যদিও দেশে এখনো কমার্শিয়াল এসির বেশির ভাগ আমদানি হয়। ক্যারিয়ার, গ্রী, এলজি, মিৎসুবিশি, ডাইকিন, প্যানাসনিক, মিডিয়া ইত্যাদি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডই কমার্শিয়াল এসির মূল সরবরাহকারী। তবে এক দশক আগেও পুরোপুরি আমদানিনির্ভর এ খাতে শুরু হয়েছে দেশীয় উৎপাদন। সরকারের নীতিসহায়তা পেলে আগামী কয়েক বছরে এ খাতে আরো প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব বলে মনে করেন উদ্যোক্তা ও বাজারসংশ্লিষ্টরা। দেশীয় পর্যায়ে ওয়ালটন কমার্শিয়াল এসি উৎপাদন করে। ওয়ালটন সম্প্রতি কমার্শিয়াল এসি রফতানিও শুরু করেছে। এছাড়া গ্রী, ভিশন ও মিডিয়ার মতো কোম্পানিগুলো স্থানীয়ভাবে কমার্শিয়াল এসি সংযোজন করছে।

চাহিদার ধরন অনুযায়ী বাজারে প্রায় আট-নয় ধরনের এসি পাওয়া গেলেও ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী এসিকে মোটাদাগে দুটি ভাগে বিভক্ত করা যায়—আবাসিক (রেসিডেন্সিয়াল), বাণিজ্যিক (কমার্শিয়াল)। রেসিডেনসিয়াল এসির চাহিদার অনেকটা এখন দেশীয় কোম্পানিগুলো পূরণ করছে। কিন্তু কমার্শিয়াল এসির ক্ষেত্রে চিত্রটি একেবারে উল্টো। এ এসির প্রায় ৯০ শতাংশ আসে বিদেশ থেকে আর দেশে উৎপাদন হয় বাকি ১০ শতাংশ।

কমার্শিয়াল এসি ব্যবহার হয় সাধারণত বড় অফিস ভবন, শপিং মল, হোটেল, হাসপাতাল, কারখানা ও অন্য বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলোয়, যেখানে বড় পরিসরে কুলিং প্রয়োজন হয়। এটি একাধিক কক্ষ বা পুরো ভবনের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বায়ুপ্রবাহ কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম।

কমার্শিয়াল এসিতে সাধারণত ভিআরএফ (ভেরিয়েবেল রেফ্রিজারেন্ট ফ্লো) প্রযুক্তি ব্যবহার হলেও স্থাপনার আকারভেদে অনেক সময় চিলারও ব্যবহার হয়।

বাংলাদেশে কমার্শিয়াল এসির বাজার নিয়ে পরিসংখ্যান বা তথ্যের ঘাটতি দেখা যায়। ফলে কমার্শিয়াল এসির বাজারের প্রকৃত আকার কত তা নিয়ে মতভেদ আছে। বাজারসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ খাতের বাজার বার্ষিক প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার। দুয়েক বছরের মধ্যেই এ বাজার প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে অভিমত তাদের। পরিমাপের হিসাবে চাহিদা রয়েছে প্রায় দেড় থেকে আড়াই লাখ টন কমার্শিয়াল এসির। প্রতি বছর এ খাতে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ১৫-২০ শতাংশ হারে। এসব এসির ৯০ শতাংশই বর্তমানে আমদানিনির্ভর। এর মধ্যে প্রায় পুরোটাই সংযোজন করা হয়। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয় বাকি ১০ শতাংশ।

তবে সিক্সডব্লিউ রিসার্চের ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪-৩০ সালের পূর্বাভাস সময়কালে বাংলাদেশের এসির বাজারের সমন্বিত বার্ষিক প্রবৃদ্ধি (সিএজিআর) ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ হবে।

স্থানীয়ভাবে কমার্শিয়াল এসি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ওয়ালটন সম্প্রতি এ পণ্য রফতানিও শুরু করেছে। প্রতিষ্ঠানটির চিফ বিজনেস অফিসার (ওয়ালটন এয়ার কন্ডিশনার) মো. তানভীর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌কমার্শিয়াল এসির ক্ষেত্রে এখনো বিদেশী কোম্পানিগুলোর দাপট বেশি। এর পেছনের মূল কারণ বর্তমান আমদানিনীতি। সম্পূর্ণ তৈরীকৃত (সিবিও) কমার্শিয়াল এসি আমদানির ক্ষেত্রে বর্তমানে আমদানিকারকরা বেশি সুবিধা পায়। ফলে দেশে উৎপাদনের চেয়ে আমদানিতেই ব্যবসায়ীদের আগ্রহ বেশি।’

আমদানিনীতিকে দেশে উৎপাদনের জন্য বড় বাধা দাবি করে মো. তানভীর রহমান বলেন, ‘‌সম্পূর্ণ তৈরীকৃত (সিবিও) কমার্শিয়াল এসির আমদানিতে মাত্র ১ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। অন্যদিকে দেশে উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে ১৫-২৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হয়। ফলে কমার্শিয়াল এসির ক্ষেত্রে উৎপাদনের চেয়ে আমদানি লাভজনক হওয়ায় দেশে এ শিল্পে বিনিয়োগ আসছে না। কমার্শিয়াল এসির ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদকদের সরকার নীতিসহায়তা দিলে এ শিল্প খাতের বিকাশ হবে। এ খাতে বিনিয়োগ আসবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘‌সরকারি বা বেসরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিদেশী ব্র্যান্ডগুলো অগ্রাধিকার বা সুবিধা পায়। সরকারি ক্রয়নীতিতে বিদেশী ব্র্যান্ডের এসিকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে, যা এ খাতের বিকাশে অন্যতম অন্তরায়। সরকারি বা বেসরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে দেশীয় ব্র্যান্ডের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা হলে কমার্শিয়াল এসি খাত আরো বিকশিত হবে।’

বর্তমান অর্থনৈতিক টানাপড়েনে কমার্শিয়াল এসি খাতে কিছুটা মন্দা যাচ্ছে বলে জানান আমদানিনির্ভর প্রতিষ্ঠান এয়ারকন্ডিশন ওয়ার্ল্ডের ইলেকট্রনিকসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আকরাম হোসেন ববি। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘‌২০২৩ সালে প্রায় ৫৫ হাজার টন কমার্শিয়াল এসি বিক্রি হয়েছিল। তবে অর্থনৈতিক টানাপড়েনে দেশের বিভিন্ন প্রকল্প বন্ধ বা স্থগিত হয়ে রয়েছে। এর সঙ্গে কমার্শিয়াল এসি আমদানিতেও শুল্কহার বেড়েছে কয়েক গুণ। ফলে ২০২৪ সালে কমার্শিয়াল এসির বিক্রি নেমেছে ৩০ হাজার টনে। এতে গত বছর বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্ভর খাতটির বাজার থমকে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘‌যেকোনো শিল্পকে এগিয়ে নিতে সরকারের নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ খাতের বিকাশে সরকারের উচিত প্রতি বছর পরিবর্তনের বদলে টেকসই নীতি প্রণয়ন করা। দীর্ঘমেয়াদি নীতি নিয়ে এগোতে হবে সরকারের। এক বছর মেয়াদি নীতি করলে দেশী-বিদেশী কোনো বিনিয়োগকারী এখানে আগ্রহ দেখাবেন না। অন্তত তিন-পাঁচ বছর মেয়াদি নীতি প্রণয়ন করলে এর সুফল সবাই ভোগ করতে পারবে।’

কমার্শিয়াল এসি ব্যবহারের আরেকটি স্থাপনা হিমাগার। দেশে সংরক্ষণের অভাবে ২৫-৩০ শতাংশ ফলজ দ্রব্য মাঠেই নষ্ট হয়ে যায়। এসব বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি দেয়া দরকার বলে মনে করেন বাংলাদেশ রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ারকন্ডিশনিং মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (ব্রামা) সভাপতি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘‌সরকার কোল্ড চেইন ইন্ডাস্ট্রির দিকে নজর দিলে কৃষিপণ্য রফতানির প্রচুর সুযোগ তৈরি হবে। শুধু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে প্রচুর কৃষিপণ্য মাঠেই নষ্ট হয়ে যায়। মৌসুমি ফল ও সমুদ্র অঞ্চলের মাছ থেকেও সর্বোচ্চ উপযোগিতা আমরা নিতে পারি না। এ খাতে দৃষ্টি দিলে কৃষিপণ্য থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ করা সম্ভব হবে।’

ইলেক্ট্রো মার্ট লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নুরুল আফছার বলেন, ‘‌আমরা দেশে প্রায় ৬০ হাজার বিটিইউ (ব্রিটিশ থারমাল ইউনিট) পর্যন্ত এসি উৎপাদন করি। এর বেশি গেলেই শুল্কহার কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সরকার এখানে শুল্কহার কমালে কমার্শিয়াল এসির বাজার আরো বড় হওয়ার সম্ভাবনা আছে।’

কমার্শিয়াল এসি তৈরিতে নীতিসহায়তা পেলে এ খাত দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হবে বলে মনে করেন মো. নুরুল আফছার। তিনি বলেন, ‘‌নীতিসহায়তা পেলে অবিলম্বে কমার্শিয়াল এসি রফতানির বাজার বড় হতে শুরু করবে।’ আগামী কয়েক বছরের মধ্যে লাইট কমার্শিয়াল এসি রফতানির প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানান তিনি।

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর কমার্শিয়াল এসির প্রবৃদ্ধি নির্ভর করে। দেশে বর্তমানে এ খাত প্রাথমিক অবস্থায় আছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা ও কর্মপরিবেশ, মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়ন সবকিছু বিবেচনায় সামনের দিনগুলোয় এ খাতের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে বলেও মত বাজারসংশ্লিষ্টদের।