পূবালী ব্যাংক ধারাবাহিকভাবেই উন্নতি করছে। তবে তিন-চার বছরে আমাদের অগ্রগতির গ্রাফটা একটু বেশি ঊর্ধ্বমুখী। প্রতিনিয়ত আমাদের প্রায় ২০ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। আমানত বৃদ্ধির সঙ্গে ঋণ ও বিনিয়োগও সমান্তরালভাবে বেড়েছে। এর মূল কারণ আমরা খেলাপি ঋণের (এনপিএল) হার ৩ শতাংশে রাখতে পেরেছি। আবার গ্রাহকের অভিজ্ঞতা, যেটা সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না, সেটিও বড় ভূমিকা রেখেছে। বড় করপোরেট বা সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৩০০-৫০০ কোটি টাকার চেক যখন মুহূর্তের মধ্যেই ক্যাশ হয়ে যাচ্ছে, তখন তাদের আস্থা বহুগুণ বেড়ে যায়। আমরা সববসময় উচ্চ সুদের আমানত পরিহার করেছি। অনেক বড় বড় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আমানতের বিপরীতে চড়া সুদ দাবি করায় তাদের এফডিআর নবায়ন না করে ছেড়ে দিয়েছি।
এছাড়া আমরা সুশাসনের মাধ্যমে কঠোরভাবে কমপ্লায়েন্স অনুসরণ করেছি। এ ভালো কাজেরই স্বীকৃতি হচ্ছে ‘ট্রিপল এ’ ক্রেডিট রেটিং অর্জন। দেশীয় প্রথম ব্যাংক হিসেবে ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি ‘ক্রিসল’ পূবালী ব্যাংককেই এ মর্যাদা দিয়েছে। আমরা ‘ডাবল এ প্লাস’ রেটিং নিয়েই সন্তুষ্ট ছিলাম। কিন্তু ক্রিসল নিজ থেকেই পূবালী ব্যাংককে ‘ট্রিপল এ’ দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। সমসাময়িক দেশের প্রেক্ষাপটে আমাদের এনপিএল কম এবং ভালো প্রবৃদ্ধি ও মুনাফা থাকায় তারা আমাদের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে দুই জায়গায়ই সর্বোচ্চ রেটিং দিয়েছে। এরই মধ্যে আরো দুই বছর পেরিয়ে গেছে। আমরা এখনো ‘ট্রিপল এ’ ধরে রাখতে পেরেছি।
এ শীর্ষ রেটিং ধরে রাখার ক্ষেত্রে মূল চ্যালেঞ্জগুলো কী বলে মনে করেন আপনি?
বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমার মনে হয় এনপিএল নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কভিড, ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অশান্ত পরিস্থিতি, ডলারের মূল্য হুট করে ১২২-১২৩ টাকা হওয়া এবং ঋণের সুদহার ১৩-১৪ শতাংশে চলে যাওয়া—এতগুলো ধাক্কার পর করপোরেট বিশ্ব যদি টিকে থাকে, তবেই ব্যাংক টিকবে। এ পরিস্থিতিতেও কোনো ব্যাংক যদি তাদের খেলাপি ঋণের হার ৪-৫ শতাংশের নিচে রাখতে পারে, তাহলে বুঝতে হবে যে তারা ‘ট্রিপল এ’ রেটিং পাওয়ার যোগ্য। নীতি সহায়তার কারণে প্রায় সব ব্যাংকেরই অনেক হিসাব আবার সচল হয়েছে, যেগুলো ২০২৭ সালের শেষে বা ২০২৮-এর শুরুতে আবার বাস্তবতায় আসবে। আমাদের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো তখন সেগুলোকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা, বিপরীতে পর্যাপ্ত প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) রাখা এবং প্রয়োজনে রাইট অফ (অবলোপন) করা। এ প্রক্রিয়াগুলোর মধ্য দিয়ে খেলাপি ঋণের হার ২-৩ শতাংশের মধ্যে ধরে রাখাই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ অবলোপনের সুযোগ দিয়েছে। আপনারা কী পরিমাণ ঋণ রাইট অফ করেছেন?
আমাদের ব্যাংক অনেক পুরনো হওয়ায় পুরনো অনেক ঋণের বোঝাও আমাদের টানতে হচ্ছে। ফলে অনেক ঋণ রাইট অফ হয়েছে, আবার অনেক হয়নি। তবে সেগুলোর বিপরীতে পর্যাপ্ত প্রভিশন রাখা আছে। রাইট অফ করার বিষয়টি সরাসরি শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। কোনো কোনো গ্রাহকের বিরুদ্ধে কেবল এনআই অ্যাক্টে (চেক ডিজঅনার মামলা) মামলা করা হয়েছে, কিন্তু অর্থঋণ আদালতে মামলা না করলে ঋণ রাইট অফ করা যায় না। আবার এখন দেখা যাচ্ছে অনেক গ্রাহকের জামানত নেই, ব্যবসার কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না; তখন হয়তো ব্যাংক শুধু একটা এনআই অ্যাক্টের মামলা করে রেখেছে, যেখানে বিবাদীর জেল বা জরিমানা হয়ে আছে। এ রকম কিছু আইনি প্রক্রিয়া চলমান আছে, যেগুলো ধাপে ধাপে রাইট অফ করা হবে। তবে পূবালী ব্যাংকে নীতি হলো, কোনো ঋণের বিপরীতে প্রভিশন রাখা হলে আমরা সেটি দ্রুত রাইট অফ করে ফেলি, যেন আমাদের ব্যালান্স শিট সবসময় স্বচ্ছ ও শক্তিশালী থাকে।
এই যে ক্রেডিট রেটিং, এটি বাস্তব ক্ষেত্রে আমানত বৃদ্ধি, বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন কিংবা ব্যবসা সম্প্রসারণে আসলেই কি কোনো কার্যকর ভূমিকা পালন করে?
অবশ্যই করে। ক্রেডিট রেটিংয়ের একটি বড় প্রভাব পড়ে যারা অর্থনীতি কিংবা হিসাববিজ্ঞান-সংক্রান্ত পড়াশোনা করেছেন, তাদের ওপর। করপোরেটেও এর বিশাল প্রভাব রয়েছে। বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সিএফও বা এমডিরা অত্যন্ত প্রফেশনাল এবং তারা এ রেটিংয়ের গুরুত্ব খুব ভালো বোঝেন। এমনকি সিএমএসএমইদের অনেকেও এখন এটা বুঝতে শুরু করেছেন। সাধারণ জনগণের ক্ষেত্রে হয়তো ‘ট্রিপল এ’ রেটিং নিয়ে সচেতনতা আগে কিছুটা কম ছিল। তবে ব্যাংক খাতে সাম্প্রতিক সময়ে যে ধাক্কাগুলো লেগেছে, তার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ধীরে ধীরে এ সচেতনতা তৈরি হচ্ছে। আগে তারা সুদহারের ওপর নির্ভর করে ব্যাংক নির্বাচন করতেন। এখন সে জায়গা থেকে বেরিয়ে ব্যাংকের বাস্তবিক অবস্থা ও সুনাম বিবেচনা করে টাকা রাখছেন। তাদের কাছে এখন সুদহারের চেয়েও টাকা ফেরত পাওয়াটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এর বাইরে যাদের অনেক বেশি টাকা আছে, তারা জেনেশুনে খোঁজখবর নিয়েই বিনিয়োগ করেন।
আপনি বলছিলেন, আপনাদের খেলাপি ঋণ ৩ শতাংশের নিচে চলে এসেছে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি খুবই ভালো অর্জন বলা যায়। পূবালী ব্যাংক এমন কী করেছে, ফলে এনপিএল নিয়ন্ত্রণে রাখা গেছে?
এর মূল কারণ আমাদের সুশাসন বা করপোরেট গভর্ন্যান্স। ঋণ অনুমোদন করার ক্ষেত্রে আমরা সর্বোচ্চ সতর্কতা ও নিয়মনীতি অনুসরণ করি। এক্ষেত্রে বহুস্তরের মূল্যায়ন হয়। প্রথমে শাখা পর্যায়ে, এরপর আরএম (রেজিওনাল ম্যানেজার), পরবর্তী সময়ে করপোরেট ডিভিশন, ক্রেডিট কমিটি এবং সবশেষে পরিচালনা পর্ষদে যায়। এ বহুস্তরীয় মূল্যায়নের প্রতিটি পর্যায়ে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা দেয়া আছে। এ পুরো প্রক্রিয়ায় কারো কোনো ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ করার সুযোগ থাকে না; এমনকি ম্যানেজমেন্ট টু ম্যানেজমেন্ট কিংবা বোর্ড টু ম্যানেজমেন্টে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ হয় না। ফলে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে আমরা অত্যন্ত স্বচ্ছ ও সুন্দর একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে আছি, যা আমাদের সুশাসনের বড় প্রমাণ।
আরেকটি বড় বিষয় হলো আমরা গ্রাহকবান্ধব সেবা দেয়ার চেষ্টা করি। ফলে তাদের ব্যবসায়িক সমস্যা দেখলে আগে থেকেই সচেতন করে বিভিন্ন পরামর্শ দেয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকের অতিরিক্ত দুরবস্থা দেখলে সুদের ক্ষেত্রে তাদের কিছুটা ছাড় দেয়া হয়। ফলে গ্রাহকও অনুভব করেন যে ব্যাংক আমার ভালো চায়। এতে তারা আন্তরিকভাবে ব্যাংকের টাকা শোধ করার চেষ্টা করেন।
ডিজিটাল ব্যাংকিং ও প্রবৃদ্ধির কথা বলছিলেন। ভবিষ্যতে হয়তো ‘সাইবার সিকিউরিটি’ই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আসবে। ব্যাংক খাত এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কী করছে?
আপনি বাজারে কোনো ডিজিটাল পণ্য বা সেবা নিয়ে আসতে চাইলে সবার আগে আপনাকে ঝুঁকি মোকাবেলা, নীতিমালা অনুসরণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই হবে। অন্যথায় কোনো ব্যাংকিং প্রডাক্টই বাজারে ছাড়া যাবে না। আমার মতে, এক্ষেত্রে সহজ প্যারামিটার হলো ব্যাংক নির্দিষ্ট যে সফটওয়্যারটি কিনতে চায়, সেটি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মূল্যায়নকারী সংস্থার তালিকায় কোন অবস্থানে আছে তা দেখা। প্রতিষ্ঠানকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব যেহেতু কর্তৃপক্ষের। তাই খরচের দিকে না তাকিয়ে সেরা পণ্যটাই নিতে হবে। সস্তা বা গড়পড়তা পণ্য নিলে দিনশেষে কোনো লাভ হয় না, যেকোনো সময় বড় কোনো সাইবার হামলা হয়ে যেতে পারে।
নিকট ভবিষ্যতে পূবালী ব্যাংকের কৌশলগত প্রাধিকার থাকবে কোন বিষয়গুলোয়?
নিকট ভবিষ্যতে আমাদের সবচেয়ে বড় কৌশলগত প্রাধিকার হচ্ছে টেকনোলজি পেনিট্রেশন বা প্রযুক্তি বিস্তার, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আমি এরই মধ্যে আমাদের প্রতিটা বিভাগের ব্যাংকিং কার্যক্রমকে এআইয়ের সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছি। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এআই-সংক্রান্ত যেসব অনলাইন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আছে, সেগুলোয় আমাদের কর্মকর্তাদের অংশ নিতে বলেছি এবং এর যাবতীয় খরচ পূবালী ব্যাংক নিজে বহন করছে। আমাদের ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস এবং ঋণ পোর্টফোলিও বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও ‘এআই এজেন্ট’ যুক্ত করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
দেশের সামগ্রিক আর্থিক খাতকে আরো উন্নত ও শক্তিশালী করতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া দরকার বলে মনে করেন?
পুরো ব্যাংক খাতকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে একদম ঢেলে সাজাতে হবে। ব্যাংক কোম্পানি আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডগুলো কঠোরভাবে পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন সার্কুলারের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বিশেষ ছাড় দেয়া বন্ধ করতে হবে। সবার জন্য একই রকম নীতি প্রযোজ্য হওয়া দরকার। নির্দিষ্ট কোনো গ্রুপ সর্বোচ্চ কত টাকা ঋণ নিতে পারবে, সিন্ডিকেট ঋণের পদ্ধতি কী হবে—ইত্যাদি বিষয় সুনির্দিষ্ট হওয়া উচিত। ফলে বড় করপোরেট গ্রুপগুলো ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বাধ্য হয়ে পুঁজিবাজারে যাবে। অবশ্য পুঁজিবাজারকেও শক্তিশালী ও চাঙ্গা করতে হবে। শেয়ার মার্কেটের মতো বন্ডের জন্যও একটি গতিশীল সেকেন্ডারি ট্রেডিং প্লাটফর্ম তৈরি করতে হবে, যেন বন্ড কেনার পর যেকোনো দিন তা বাজারে বিক্রি করে নগদায়ন করা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের মধ্যে যদি এমন নীতিগত সমন্বয় করা যায়, তবে আর্থিক খাত অনেক সুরক্ষিত হবে।










