সেই ঐন্দ্রজালিক মুহূর্তটা ভুলে যাওয়া অসম্ভব। চার বলে চার ছক্কায় ম্যাচ শেষ! মাইক্রোফোনে ইয়ান বিশপ কাঁপা কাঁপা গলায় বলছেন, ‘কার্লোস ব্রাফেট, ইউ রিমেম্বার দ্য নেম!’ এটা ছিল সাত মাস আগে টি২০ বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ অংক। কিন্তু ব্রাফেট যেন তার পর থেকেই ঘুমিয়ে পড়েছেন। বিশপের কথা তাই রাখা যায়নি। ব্রাফেট নিজেও কি তার পূর্বসূরির কথা রাখতে পেরেছেন?

বিরাট কোহলি কিংবা জো রুটের কাছে ধারাবাহিকভাবে রান করাটাই ‘ক্রিকেট’। সেটা হোক টেস্ট, ওয়ানডে কিংবা টি২০। ব্রাফেট তাই অতিমানবীয় সেই ইনিংস দিয়ে ক্যারিবীয় ক্রিকেটে অমরত্ব পেলেও ক্রিকেটামোদীদের কাছে কোহলি কিংবা রুটের মর্যাদাই বেশি। উইলো হাতে তারা প্রমাণ করে চলছেন— টাচ, টাইমিংই ক্রিকেটের ‘নিউক্লিয়াস’। মারকাটারি ক্রিকেট শুধুই অবসর যাপনের অনুষঙ্গ।

ক্রিকেটে কেউ আবেগবাদী। কেউ আবার বাস্তববাদী। এ দুই ঘরানার দর্শকরা অপেক্ষায় থাকেন— পরের বলে কী ঘটবে? মজার ব্যাপার, ভক্তদের এ অপেক্ষাতেই লুকিয়ে টেস্ট ও টি২০ ক্রিকেটের ফারাক। সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটে চার-ছক্কার দামটা সবচেয়ে বেশি। টেস্টে স্ট্রোক প্লের সঙ্গে প্রখর ধীশক্তি ও ধৈর্য লাগে। সেখানে প্রতিটি বলই টিকে থাকার কিংবা উইকেট নেয়ার চ্যালেঞ্জ। আর তাই টেস্টের প্রতিটি সেশন যেন একটি গোটা নাটকের এক-একটি অংক। পাঁচদিনের উত্থান-পতন এ নাটকের আবেগ সুগভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। যেমন ৮৩ বছর আগের ‘বডিলাইন সিরিজ’ কিংবা ২০০১ সালে অস্ট্রেলিয়ার ভারত সফর আজও স্মৃতির পটে অমলিন।

আবেগ বিচারে টি২০ ক্রিকেটের অবস্থান টেস্টের বিপরীতে। স্রেফ গতিময় বিনোদনের খোরাক মেটানোয় টি২০ আবেগ ক্ষণস্থায়ী। টেরি জেনার যেমন বলেছেন, ‘পপকর্ন ক্রিকেট’। লোলিত মোদির চোখে ‘ক্রিকেটেইনমেন্ট’। কিন্তু হাল আমলের গতিময় পৃথিবী বিচারে টি২০ ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। ঘর কিংবা অফিস ফেলে এখন কেউ পাঁচদিন গ্যালারিতে বসে ড্র টেস্টের অন্তর্নিহিত রূপ-রস উপভোগের বিলাসিতা দেখান না। সময়ের পাল্লায় জীবনের মানদণ্ড নির্ধারিত হওয়ায় এখন সবাই অফিস কিংবা ব্যক্তিগত কাজ শেষে সাড়ে ৩ ঘণ্টার মারকাটারি ক্রিকেট দেখতে আগ্রহী। এ যেন সময়ের অভাবে বাটিভর্তি দুধটুকু না খেয়ে শুধু সরটুকু শুষে নেয়ার স্বাদ! কারণ চার-ছক্কা তো হচ্ছেই। ওদিকে বাটিতে যে শ্বেতশুভ্র তরল অংশটুকু পড়ে থাকে, আদতে সেটাই এখনকার টেস্ট ক্রিকেট, যার পুষ্টিমান চিরকালীন হলেও রসিকের সংখ্যা ক্রমেই নিম্নগামী।

এই ব্যস্ত সময়ে ক্রিকেটের রসিকজন যৌক্তিকভাবেই বিনোদনলোভী। ৮টা-১০টা অফিস কিংবা সারা দিনের ব্যবসাপাতি গুটিয়ে কে পাঁচদিন টিভিতে চোখ সেঁটে ম্যাড়ম্যাড়ে ড্র দেখার ঝুঁকি নেবে? লম্বা সময় ধরে একজন ব্যাটসম্যানের ইনিংস গড়া কিংবা বোলারের ফাঁদ পাতা। টেস্টে এসব মুহূর্তের মহিমা উপভোগের ধৈর্যটা হারিয়ে খুঁজছে ক্রিকেটামোদীরা। এখানে দলগুলোও কিছু ক্ষেত্রে দায়ী। অস্ট্রেলিয়া-দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা ভারত-অস্ট্রেলিয়া টেস্ট সিরিজ ব্যতীত বাকি দলগুলোর বেশির ভাগই টেস্টে ধারাবাহিক নয়। তবে রোমাঞ্চকর টেস্ট যে মাঠে একেবারেই গড়াচ্ছে না, তা নয়। বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড সর্বশেষ টেস্ট সিরিজের উদাহরণ টানা যেতে পারে। বাংলাদেশের ক্রিকেটে অমরত্ব পেয়েছে এ সিরিজ, যেমনটা ইংলিশ ক্রিকেট সমালোচকদের চোখেও!

মানদণ্ড বিচারে বিপিএলের চতুর্থ আসর কোনোভাবেই সেই সিরিজের তুল্য নয়। কিন্তু বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে দর্শক সংখ্যা বাড়ানোর নেপথ্যে টি২০ ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক আসরটির অবদান অস্বীকার করলে ভুল হবে। দেশজুড়ে ক্রিকেটের একটি বিশাল ফ্যানবেজ তৈরি হয়েছে বিপিএলের কল্যাণে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তার সাক্ষী। প্রতিটি ফ্র্যাঞ্চাইজি দলের আলাদা ফ্যানবেজ পেজের অগণন সমর্থক সংখ্যাই তার প্রমাণ। এর বাইরে সমর্থকরা স্বপ্রণোদিত হয়ে দলের সমর্থন বাড়াতে নানা রকম ক্যাম্পেইন করছেন। ধুমসে বিক্রি হচ্ছে ফ্র্যাঞ্চাইজি দলগুলোর রেপ্লিকা জার্সি, কিটস। পছন্দের দলের ম্যাচ দেখতে বিভিন্ন জেলা শহর থেকে ঢাকায় ছুটে আসছেন অনেকে। বিপিএল উত্সবের এই মৌতাত তো ভারতের আইপিএল কিংবা অস্ট্রেলিয়ার বিগব্যাশেরই অনুজপ্রতিম। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে মানদণ্ড ও আবেদন বিচারে বিপিএল এ দুটি আসরের ধারেকাছেও নেই। পাশাপাশি এটাও সত্য যে, উন্মাদনা বিচারে বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রীড়াঙ্গনে বিপিএলই সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মৌসুম। ফুটবলে ইংল্যান্ডে যেমন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, স্পেনে লা লিগা।

হাল আমলের ক্রিকেটে বেশির ভাগ দর্শকই চার-ছক্কার ভক্ত। টি২০ তাদের খোরাক মেটাচ্ছে সবচেয়ে বেশি। কারণ খেলাটাই ‘ব্যাটসম্যানস গেম’। ভেবে দেখুন, ২০ ওভারে ১০ জন ব্যাটসম্যান। টেস্টের তুলনায় ২৫ মিটার ছোট বাউন্ডারি। ফিল্ডার সংখ্যা ৯। তাদের বিপরীতে ব্যাটসম্যানের হাতে যে উইলোখণ্ড, তার পুরুত্ব ব্যারি রিচার্ডস-ইয়ান চ্যাপেল যুগের তুলনায় দ্বিগুণ। সাড়ে ৩ ঘণ্টার ভানুমতির খেলটা তাই নিখাদ মারকাটারি বিনোদন। বাইসেপ-ট্রাইসেপবহুল ব্যাটসম্যানের বাউন্ডারির বাইরে বল আছড়ে ফেলা দেখে একজন মধ্যবিত্ত ভুলে যান তার ব্যক্তিজীবনের যাবতীয় অপ্রাপ্তি! গ্রেস-রঞ্জি, ব্রাডম্যান-লারউড, সোবার্স-হার্ভে, ভিভ-গাভাস্কার, লারা-টেন্ডুলকারদের যুগ পেরিয়ে কোহলি-রুটের এ সময়ে এটাই ক্রিকেট, সম্ভবত জীবনও। সত্তর ও আশির দশকের ঘরের কিংবা মাঠের সেই ‘জেন্টলম্যানস গেম’ টপকে এখন ক্রিকেট তো জীবন— দুটোই ভীষণ রকম জটিল ও হিসাবি।

টেস্টে লড়াই সেশন ধরে ধরে। উইকেট নেয়াই বোলারের অভীষ্ট নিশানা। তার বিপরীতে ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সূচাগ্র মেদিনী’— প্রবাদটি বুকে ধারণ করে স্ট্যান্স নেন ব্যাটসম্যানরা। এখানে বোলার ও ব্যাটসম্যানের যুযুধানের ক্ষেত্রটা একেবারেই মৌলিক— সামর্থ্য প্রমাণের চ্যালেঞ্জ। আর তাই মাঝে মধ্যে ড্র টেস্টেও ফুটে ওঠে রোমাঞ্চের পসরা। টেস্টে এমন অনেক ড্র ম্যাচ আছে, যার মূল্য স্মৃতিমেদুর রসিকজনদের কাছে হার-জিতের চেয়েও বেশি।

পাঁচদিনের এ খেলাটা তাই সত্যিকার অর্থেই ক্রিকেটীয় সামর্থ্য প্রমাণের ফরম্যাট। ব্যাটসম্যানরা তাদের স্ট্রোকের আস্তিন খোলার আগে উইকেটে সেট হয়ে নেন। বাহারি সব স্ট্রোক খেলার আগে তাদের বুঝে নিতে হয় ম্যাচের পরিস্থিতি। টেস্ট ক্রিকেট এ কারণে বেশ ধীরগতির, চঞ্চলমতি দর্শকদের জন্য যা অনেক ক্ষেত্রেই বিরক্তিকর। কিন্তু টি২০ ক্রিকেটে চোখের পলক ফেলার সময় থাকে না। এ ফরম্যাটে একজন বোলারের সুযোগ মাত্র চার ওভার। এর মধ্যেই তাকে ঝুলির সব বিদ্যে জাহির করতে হয়, যা অসম্ভব এবং ম্যাচের আবহ বিচারে অনুচিত। কারণ এ ফরম্যাটে রান কম দেয়া মানেই জয়ের সম্ভাবনা। আর তাই স্বল্পদৈর্ঘ্যের ম্যাচে উইকেট নেয়ার চেয়ে বোলারদের জন্য রান কম দেয়ার চ্যালেঞ্জটাই বেশি।

ব্যাটসম্যানদের ক্ষেত্রে সমীকরণটা উল্টো। তাদের হাতে থাকে ‘লাইসেন্স টু কিল’! এ কারণে ম্যাচের প্রথম বলেই ডাউন দ্য উইকেট এসে ছক্কা মারার চেষ্টা করেন ব্রেন্ডন ম্যাককুলাম। অফস্ট্যাম্পে নিখুঁত লেংথের একটি বলকে মিড উইকেট দিয়ে গ্যালারিতে পাঠিয়ে ইনিংস শুরু করেন ক্রিস গেইল। এ ফরম্যাট উদ্ভাবনী শক্তির আধার। স্কুপ, সুইচ হিট, রিভার্স সুইপ... আসছে একের পর এক। ম্যাচের পরিস্থিতি আর টেকনিক বিচারে শটগুলো মাঝে মধ্যে অপ্রয়োজনীয় আর দৃষ্টিকটু মনে হলেও রান তো আসছে! মূলত এই ‘রান আসা’ ব্যাপারটাই টি২০ ক্রিকেটকে এগিয়ে নিয়েছে এতটা সামনে। দর্শকরা মাঠে যাচ্ছেন কী দেখতে?

বিশ্বব্যাপী সমর্থকদের ‘রান আসা’ দেখার চাহিদা মেটাতে ক্রিকেটকে এ গ্রহে ছড়িয়ে দেয়ার বিকল্প নেই। বিশ্বায়নের এ যুগে গুটিকয়েক টেস্ট খেলুড়ে দেশের মোড়ক থেকে ক্রিকেটকে বের করে আনতে পারে শুধু টি২০ ফরম্যাট। টেস্টে অবকাঠামো নির্মাণে প্রচুর সময় লাগে। নিউজিল্যান্ডের যেমন প্রথম টেস্ট জিততে সময় লেগেছে ২৩ বছর! এদিক বিচারে নতুন দেশগুলোর জন্য টি২০ ফরম্যাট আদর্শ। ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেটারদের যেমন পাদপ্রদীপের আলোয় তুলে এনেছে আইপিএল-বিগব্যাশ। যে পবন নেগিকে দুই বছর আগেও এ দেশের কেউ চিনত না, আইপিএলের গত আসরের কল্যাণে এখন তার বাজার ঊর্ধ্বমুখী। অন্যতম দামি খেলোয়াড় বলে কথা! অসি ক্রিকেটে তারুণ্যের অহঙ্কার গ্লেন ম্যাক্সওয়েলও উঠে এসেছেন আইপিএল থেকে। যেমনটা বিপিএল আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছে আবু হায়দার রনির সঙ্গে।

সেই রনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেকে প্রমাণের পর্যাপ্ত সুযোগ এখনো পাননি। কিন্তু বিপিএল তাকে পাদপ্রদীপের আলোয় তুলে আনায় অনুপ্রাণিত হয়েছেন অনেক ক্রিকেটার। আসলে এটাই বাংলাদেশ ক্রিকেটে বিপিএলের খেলোয়াড় সরবরাহের পাইপলাইন। কিন্তু শঙ্কার ব্যাপার হলো, কচিকাঁচাদের বেশির ভাগই গেইল-ডি ভিলিয়ার্সের অনুগামী। টি২০ ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক লিগ খেলতে গেইল বেশ আগেই টেস্ট ছেড়েছেন। কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, ডি ভিলিয়ার্সও নাকি গেইলের পথে হাঁটতে ছাড়তে পারেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট! এখানে আর্থিক ব্যাপারটাই যে মুখ্য, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই প্রশ্ন উঠতে পারে, ক্রিকেটের সেই ‘জেন্টলম্যানস গেম’ এখন কোথায়? প্রশ্নটা আপেক্ষিক; কারণ ‘যস্মিন দেশে যদাচার’ বলে একটা কথা আছে। এখন সময় টি২০’র, তাই খেলোয়াড়রা তো সেদিকে ঝুঁকবেনই।

আন্তর্জাতিক ময়দানে টি২০’র বয়স ১১ বছর। এ ফরম্যাটে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক লিগের উদ্ভব মাত্র আট বছর আগে। এত অল্প সময় দিয়ে ১৩৯ বছরের অভিজ্ঞতাপুষ্ট টেস্টের সঙ্গে টি২০’র তুলনাটা একেবারেই অবান্তর। হয়তো আরো ১০ বছর পর জবাব মিলবে এ প্রশ্নের, কোনটা ভবিষ্যৎ— টেস্ট না টি২০? অবশ্য জবাব না পেলেও সমস্যা নেই। কারণ লাল বল সাদা হলেও কুড়ি কুড়ির মঞ্চে ক্রিকেটটা ক্রিকেটের মতো করেই খেলতে হয়।